চির তারুণ্যের প্রতীক আহমদ ছফা

মোহাম্মদ আব্দুর রউফ

শিক্ষক, গবেষক-সাহিত্য সমালোচক

আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১) ‘অমৃত সমান‘ শিরোনামে একটি আত্মজীবনী লিখতে চেয়েছিলেন, লেখার অবসর পাননি। লিখলে আরও একটি উৎকৃষ্ট সাহিত্যকর্ম রচনাসম্ভারে সংযুক্ত হত। আমরাও আহমদ ছফা ও সমসাময়িক সমাজ-সংস্কৃতি ও রাজনীতিসহ বহুবিধ প্রসঙ্গে জানতে পারতাম। তবে ছফা রেখে গেছেন অফুরন্ত সৃষ্টিসম্ভার। এতে তাঁর ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক, সামাজিক, সাহিত্যজীবন ও পূর্বপুরুষ সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্যাদি নানা প্রবন্ধনিবন্ধে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এগুলোর মাঝেই আমরা প্রকৃত ছফাকে খুঁজে পাব। এই মনীষী পূর্বাকাশে সূর্যোদয়ের মতোই পূর্বদেশের প্রকৃতির কোল থেকে প্রকৃতির চিরতারুণ্য আর উদ্দাম নিয়ে আলোর দেবতার ন্যায় জেগে উঠেছিলেন।

আহমদ ছফা হেদায়েত আলী ওরফে ধনমিয়া ও আছিয়া খাতুনের দ্বিতীয় সন্তান। পিতাহিসেবে হেদায়েত আলী যথেষ্ঠ দায়িত্বশীল ছিলেন। ছফার শিক্ষার ত্রুটি করেননি। ছেলেবেলায় পারিবারিকভাবেই ধর্মীয় শিক্ষার আয়োজন করেছিলেন। ছফার স্মৃতিশক্তিও ছিল বেশ ভাল। দেখতে দেখতে আঠার পারা কোরান মুখস্থ হয়ে যায়। সঙ্গেসঙ্গে খানিকটা উর্দু এবং ফার্সি ভাষাও আয়ত্ব করেন। তাই বলে আহমদ ছফা মোটেও সংকীর্ণমনের ছিলেন না। এসব ভাষার পাশাপাশি রামায়ণ-মহাভারত-ভাগবতও কিছুটা শিখে নেন। প্রতিবেশী মনমোহন আচার্যের মায়ের কণ্ঠে রামায়ণ-মহাভারত-ভাগবতের পাঠ শুনে অনেক শ্লোক মুখস্থ হয়ে যায়। পিতা নিজেই পুত্রের শিক্ষার দেখভাল করতেন। কেবল কেতাবি নয়, সামাজিক শিক্ষাও। সমাজতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার প্রতি ছফার পিতার বেশ আগ্রহ ছিল। মাঝেমধ্যে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সভাসমিতিতে যেতেন। সঙ্গে ছফাকেও নিতেন। বক্তব্য শোনার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতেন। দূরে সভা হলে অনেক সময় ঘাড়ে করে সভাস্থলে নিয়ে যেতেন। সভাশেষ হলে অনুরূপভাবে ঘাড়ে করে নিয়ে আসতেন। পিতা চাইতেন, ছফার মানসচেতনায় এই মানবিক জীবনাদর্শ জেগে উঠুক। বাস্তবেও তাই ঘটেছিল। ছফা পিতার মানসচেতনা দ্বারা অনেকটাই পরিপুষ্টিলাভ করেছিলেন।

পারিবারিক শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ছফাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য হাইস্কুলে ভর্তি করা হয়। মুসলিম হোস্টেল থাকা সত্ত্বেও ছফাকে হেডমাস্টার শ্রীবিনোদবিহারী দত্তের তত্ত্বাবধানে হিন্দু হোস্টেলে রাখা হয়। লাইব্রেরি, বই, আর শিক্ষক-এই তিনটি বিষয় সমন্বয়ে আহমদ ছফা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠেন। ছফার শিক্ষক ছফাকে স্কুল লাইব্রেরি থেকে বই ইস্যু করে পড়তে দিতেন। লাইব্রেরির চাবিটাও ছফার কাছে রাখতেন। ছফা ইচ্ছেমতো পড়তে পারতো। এঁদের সংস্পর্শে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে ম্যাট্টিকুলেশন পাস করেন আহমদ ছফা। চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়ে ছফা উচ্চশিক্ষার জন্য এলেন ঢাকায়; ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। কিন্তু এ বিভাগ থেকে ছফা সম্মানশ্রেণির পরীক্ষায় অবতীর্ণ হননি। টিউটোরিয়াল ক্লাসে আহমদ শরীফ ছফাকে ধমক দিলে অভিমানে ছফা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেন। ভর্তি হন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি সাধারণ কলেজে এবং এখান থেকেই প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছফা বেশ অর্থকষ্টে ছিলেন। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। বন্ধুর মাকে কোরান পড়িয়ে তিনবেলা খাবার ব্যবস্থা করেন। কমলাপুর রেলস্টেশনে বসে তানিয়া বইটির বাংলা অনুবাদ করে রয়ালিটির টাকা দিয়ে বিএ পরীক্ষার ফরমপূরণ করেছিলেন। এভাবে ছফা ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে বিএ (১৯৬৭) পাস করেন। এখানে এসেই তিনি কবি আসাদ চৌধুরীর সাক্ষাৎ পান। বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে সূর্য তুমি সাথী (১৯৬৭) উপন্যাস রচনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ডিগ্রি না পেলেও ছফার ক্ষতি হয়নি। প্রকারান্তে ছফার সাহিত্যিক ভিত্তিটা আরো মজবুত হয়। পরবর্তীতে ছফা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে অধ্যয়ন করেছিলেন।

স্নাতকোত্তর সম্পন্ন না করেই আহমদ ছফা বাংলা একাডেমির পিএইচডি ফেলোশিপ প্রগ্রামে আবেদন করেছিলেন। যথারীতি ইন্টারভিউ কার্ড পান। ইন্টারভিউ বোর্ডে পরীক্ষক ছিলেন ডক্টর আহমদ শরীফ, প্রফেসর মুনীর চৌধুরী এবং ডক্টর এনামুল হক। এ সময় বাংলা একাডেমির পরিচালক ছিলেন কবীর চৌধুরী। পরীক্ষাবোর্ডে ছফাকে অনেকটা তোপের মুখে পড়তে হয়। ডক্টর এনামুল হক খানিকটা রুষ্ট হয়ে ছফাকে বলেছিলেন-‘তোমার সাহস তো কম নয় যে, এমএ পরীক্ষা না দিয়েই একেবারে পিএইচডি করার দরখাস্ত নিয়ে হাজির।‘ ছফার জবাবটি ছিল নিঃসন্দেহে সাহসোচিত-‘চারুচন্দ্র চন্দ্যোপাধ্যায় এমএ পাস না করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। মোহিতলাল মজুমদারও এমএ পাস ছিলেন না, তথাপি এখানে শিক্ষকতা করেছেন। আমি তো এমএ পাস করবই, দু’চার মাস এদিক ওদিকের ব্যাপার। দরখাস্ত করে অন্যায়টা কী করেছি?‘ পরীক্ষার্থীর এমন উত্তর নিঃসন্দেহে কল্পানাতীত। ছফা ঐ কল্পনাতীত কাজটিই করেছিলেন। শেষতক শর্তপূরণ ছাড়াই ছফাকে পিএইচডি গবেষণা প্রগ্রামে মনোনয়ন দেয়া হয়। কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য আহমদ ছফা পরদিন বাংলা বিভাগে গিয়েছিলেন। বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন মুনীর চৌধুরী। তিনি পিএইচডি থিসিসটা বাংলা বিভাগ থেকে রেজিস্ট্রেশন করতে বলেছিলেন। সম্মত না হলে শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন- ‘তুমি বাংলা বিভাগের অধীনে কাজ করতে রাজি না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে থিসিস রেজিস্ট্রেশন করতেই দেব না।‘ মুনীর চৌধুরীর শর্তটি ছফার কাছে শিক্ষকসুলভ মনে হয়নি। এবারও আহমদ ছফা মুনীর চৌধুরীর প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন। অভিমানে ভর্তি হয়েছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। পরপর দুবার বাংলা বিভাগ ছেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে আহমদ ছফা বলেন-‘মাতৃস্তন্যে শিশুর যেরকম অধিকার, শিক্ষকদের স্নেহের ওপরও ছাত্রদের সেরকম অধিকার থাকা উচিত। সেই স্নেহ আমি শিক্ষকদের কাছ থেকে পাইনি।‘ আহমদ ছফাকে আরো লিখতে দেখি-‘ শিক্ষকের কাছ থেকে সামান্য উৎসাহ‘ অনুপ্রেরণা যখন আমার ভীষণ প্রয়োজন ছিল, সেই সময়ে কেউ আমার দিকে মুখ তুলে তাকাননি। যখন আমি নিজের চেষ্টায় উঠে আসতে শুরু করেছি, সকলে আমাকে অনুগ্রহ বিতরণ করে কৃতজ্ঞতাপাশে বাঁধতে চাইছেন।‘

self-Ad

সুপারভাইজার হিসেবে আহমদ ছফা মনেমনে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাককে (১৯১৪-১৯৯৯) বেছে নেন। এবং যথারীতি বাসায় হাজির হন। প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক সেদিন চৌকিতে নাক পর্যন্ত কাঁথা টেনে ঘুমাচ্ছিলেন। সুপাভাইজার হওয়ার নিবেদন পেশ করায় তিনি দক্ষিণ দিকে পাশ ফিরে কাঁথাটি দ্বারা নাকমুখ ঢেকে দিলেন। দ্বিতীয়বার আর্জি পেশ করায় উত্তরদিকে পাশ ফিরলেন। প্রফেসর রাজ্জাকের এমন আচরণে ছফার আঁতে ঘা লাগে। তিনি বলেন-আমি দু‘হাত দিয়ে তাঁর শরীর থেকে কাঁথাটি টেনে নিয়ে দলা পাকাতে পাকাতে বললাম, ‘আমার মত একজন আগ্রহী যুবককে আপনি একটি কথাও না বলে তাড়িয়ে দিতে পারেন, এত বিদ্যা নিয়ে কী করবেন?‘ প্রফেসর রাজ্জাক শেষ পর্যন্ত সুপারভাইজার হতে সম্মত হয়েছিলেন।

আহমদ ছফা ধাপেধাপে একপ্রকার সংগ্রাম করে গবেষণার বিষয়বস্তু, ফেলোশিপ, বিভাগ, তত্ত্বাবধায়ক সবই ঠিকঠাক করেন। ছফার পিএইচডি অভিসন্দর্ভের শিরোনাম ছিল: ‘আঠার শ’ থেকে আঠার শ’ সাতান্ন সাল পর্যন্ত বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব, বিকাশ এবং বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং রাজনীতিতে তার প্রভাব।‘ মাসিক বৃত্তি ছিল বার’শ টাকা। কিন্তু শেষতক আহমদ ছফা গবেষণাটি শেষ করেননি। একাধিক কারণে ছফার পিএইচডি গবেষণাকর্ম সামনে এগোয়নি। ছফার মানসিক-কষ্ট কম ছিল না। অর্থকষ্টও ছিল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারন্যাশনাল হলে থাকতেন। মাসে বার‘শ টাকা স্কলারশিপ পেতেন। টাকা তুলতে গবেষণা-তত্ত্বাবধায়ক ও বিভাগীয় চেয়ারম্যানের যৌথ স্বাক্ষর লাগতো। রাষ্টবিজ্ঞানের চেয়ারম্যান স্বাক্ষর দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ফলে ছফার মাসিক বৃত্তির টাকা আটকে যায়। জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদে যা হয়, ছফারও সেই দশা। অর্ধক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী উপন্যাসে আহমদ ছফা বলেন- ‘শিক্ষকেরা জাতির বিবেক একথা সত্য বটে। এই বিবেকনামীয় ভদ্রলোকেরা সময়বিশেষে কী রকম নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারেন, আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।‘ এছাড়া একাত্তর পরবর্তীসময় প্রসঙ্গে আহমদ ছফা বলেন-‘তৎকালীন সরকার আমার প্রতি সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতে আরম্ভ করলেন। তার ফল এই দাঁড়াল যে, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচ-ডি থিসিস লেখার যে গবেষণাটি করছিলাম ছেড়ে দিতে হল।‘ এতটুকু মানসিক চাপে ছফা গবেষণাকর্ম ছেড়ে দেবেন-এমন দূর্বল প্রতিভা ও মানসিকতা কোনটাই ছফার মধ্যে ছিল না। আদতে, গবেষণাকর্ম ছফার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়নি। তাঁকে লিখতে দেখি-‘কিছুদিন বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটির পর আমার মনে হল গবেষণা করার চেয়ে বাজে কাজ আর দুনিয়াতে নেই।‘ আসল কথা, আহমদ ছফার কাছে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়।

আহমদ ছফার গবেষণাকর্ম সম্পূর্ণ না-হওয়ার আরও একটি কারণ জানা যায় যদ্যপি আমার গুরু (১৯৯৮) গ্রন্থে। পিএইচডিতে ভর্তির পর ছফা একান্তভাবে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে আসেন। এসময় ছফা প্রায় নিয়মিত আবদুর রাজ্জাকের বাসায় যাতায়াত করতেন। প্রফেসর রাজ্জাকের বুকসেলফে ছফা বালজাকের রচনাবলি, ফ্লবেয়ারের উপন্যাস, ভিক্টোর হুগোর বইসহ ফরাসি সাহিত্যের বিপুল রচনাসম্ভার দেখতে পান। এতোগুলো বিদেশি সাহিত্যকর্ম দেখে ছফার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। ভেতরে ভেতরে তীব্র আগ্রহ জেগে ওঠে। সেই যে আহমদ ছফা বিপুল জ্ঞানজগতে প্রবেশ করেন, সেখান থেকে আর বেরুতে পারেননি। যদ্যপি আমার গুরু গ্রন্থে ছফার পঠিত বইয়ের তালিকায় দেখা যায়-ডিক উইলসনের এশিয়া অ্যাওয়েকস, গুনার মিরডালের এশিয়ান ড্রামা, টয়েনবির ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলেশন, ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের কনডিশন অব দ্যা ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড, অ্যাডাম স্মিথের দ্যা ওয়েলথ অব নেশন, কাল মার্কসের দাস ক্যাপিটাল, ম্যাকসভেবরের প্রোটেস্টান্ট এথিকস অ্যান্ড স্পিরিট অব দ্যা ক্যাপিটালিজম, রিলিজিয়ানস অব ইন্ডিয়া, কমরেড আবদুল হকের পূর্ব বাংলা আধা-সামন্ততান্ত্রিক, আধা ঔপনিবেশিক, মানবেন্দ্রনাথ রায়ের ইন্ডিয়া ইন ট্রানজিশন, নরেন্দ্রনাথের দ্যা হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিক, সমরসেনের বাবুবৃত্তান্ত, রামকৃষ্ণের কথামৃত ইত্যাদি। এছাড়াও চিঠিপত্রে বহু দেশবিদেশি বইয়ের সন্ধান পাওয়া যায়। এসব বই পড়ে ছফার মধ্যে এমন ভাবান্তরের সৃষ্টি হয় যে, তিনি পুনরায় গবেষণায় ফিরতে পারেননি অথবা চাননি। মাত্র কয়েক দিনের পরিশ্রমে বাঙালি মুসলমানের মন (১৯৮১)এর মতো একটি প্রবন্ধগ্রন্থ যিনি রচনা করতে পারেন, তাঁর কি থিসিস লেখার দরকার আছে?

সাহিত্য-সাময়িকপত্রের সঙ্গে লেখকের সম্পর্ক হরিহর আত্মার মতো। আহমদ ছফার সম্পর্কও অনেকটা তেমনি। নানাভাবে সাহিত্য-কাগজের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত থাকতেন তিনি। ছফার বাসনা-‘আমার পত্রিকা তৈরি হোক। আমি চাই এইখানে আমরা যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি তাঁদেরই প্রয়াসে বাঙালি সংস্কৃতির বৃক্ষে নতুন রক্তমুকুল ফুটুক।’ আহমদ ছফার সম্পাদনায় প্রথম স্বদেশ (১৯৬৯) পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির সঙ্গে রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেনসেন, সরদার ফজলুল করিম, আহমদ শরীফ, মুনতাসীর মামুন, অসীম সাহা প্রমুখ সম্পৃক্ত ছিলেন। বিজ্ঞাপন সংগ্রহের জন্য আহমদ ছফা তৎকালীন ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিটেড (বর্তমানে জনতা ব্যাংক) এর আতীকুল্লাহ সাহেবের কাছে গিয়েছিলেন। আতীকুল্লাহ উপদেশের সুরে ছফাকে জানিয়েছিলেন-‘এ সব বনের মোষ তাড়ানো বাদ দিয়ে লেখাপড়াটা ভালভাবে করলেই পারেন।‘ ছফা দমে যাননি। তাঁর ভাষ্য-‘সমস্ত সংকোচ ঝেড়ে ফেলে একটা চেয়ার টেনে তাঁর সামনে গ্যাঁট হয়ে বসলাম এবং ঝগড়া শুরু করলাম। এভাবেই সাইয়িদ আতীকুল্লাহ সাহেবের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তিনি আমাকে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, কিন্তু আমার সঙ্গে তাঁর এই সম্পর্কটা বিজ্ঞাপন সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। জীবনে আমি বনের মোষ কম তাড়াইনি। সব কাজের জন্য টাকার প্রয়োজন অপরিহার্য।‘

self-Ad

স্বাধীন বাংলার প্রথম সাহিত্য-কাগজ প্রতিরোধ (১৯৭১)। ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানে বিতরণের জন্য হঠাৎ করে একদিনের মধ্যেই কাগজটি প্রকাশের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। আহমদ ছফা বলেন-‘৬ মার্চে আমরা ঠিক করলাম রেসকোর্সে যে মিটিং হবে তাতে বিক্রি ও বিতরণের জন্য একটা পত্রিকা বের করব। সকলে মিলে পত্রিকার নাম রাখলাম ‘প্রতিরোধ’। নিচে থার্ড ব্যাকেট দিয়ে লিখে দিয়েছিলাম স্বাধীন বাংলার প্রথম পত্রিকা। ওই ট্যাবলয়েড সাইজের আট পৃষ্ঠার কাগজটিতে কবিতা লিখেছিল হুমায়ুন কবির, মুহম্মদ নূরুল হুদা, রফিক নওশাদ, রফিক কায়সার এবং ফরহাদ মজহার।’ ডক্টর খান সরওয়ার মোর্শেদ চার আনা মূল্যের এই পত্রিকাটি ক্রয় করেছিলেন পাঁচ টাকা দিয়ে। খুশিতে আহমদ শরীফ পাঞ্জাবির পকেটের সব টাকা ছফার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এরপর সাপ্তাহিক দাবানল (১৯৭১), বাঙলাদেশ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম পরিষদ, (১৯৭১), হে স্বদেশ (১৯৭২), দৈনিক গণকণ্ঠ (১৯৭৫) সাপ্তাহিক উত্তরণ (১৯৮৩), উত্থানপর্বসহ (১৯৯৭) নানারকম সাহিত্য-সাময়িক কাগজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন আহমদ ছফা। হাতে পর্যাপ্ত পয়সা না থাকলেও পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিতেন; এমনকি বাকিতেও।

স্বসংস্কৃতি-সাধনায় আহমদ ছফা অতুল্য। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতি দিলেও বেতার-টেলিভিশনে পাক-সরকার রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এসময় আহমদ ছফা সংস্কৃতিকর্মীকে একটি প্লাটফরমে দাঁড়া করানোর চেষ্টা করেন। সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশের পরিকল্পনা করেন। বইটি সম্পাদনার দায়িত্ব নেন ডক্টর আনিসুজ্জামান (১৯৩৭-২০২০)। লেখা আনতে আহমদ ছফাকে আনিসুজ্জামান কবি জসীম উদদীনের কাছে পাঠান। দুপুরের তপ্তরোদে বালুপথে পায়ে হেঁটে আহমদ ছফা নীলক্ষেত থেকে পুরান ঢাকার কমলাপুরে কবি জসীম উদদীনের পলাশবাড়িতে উপস্থিত হয়েছিলেন। ‘রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতির সাধনা’ নামে তিনি নিজেও একটি দারুণ প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন।

পাক-ভারত যুদ্ধকালে (১৯৬৫) আহমদ ছফা পূর্বপাকিস্তানের পয়গম পত্রিকায় কাজ নেন। এসময় রামায়ণ-মহাভারত থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সবাইকে ধোলাই চলছিল। বিষয়টি ছফার ভালো লাগেনি। একটি প্রবন্ধে ছফা লিখে ফেললেন-‘শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করা ভাল, কিন্তু তাঁর উজ্জ্বল সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে ক্রমাগত নিন্দা প্রচার এগুলো খারাপ কাজ।’ পত্রিকাটি সরকারি হওয়ায় হলুস্থল কাণ্ড ঘটে যায়। আহমদ ছফার থাকার সুনির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় বেঁচে যান। বিপদকালে ছফা কবিবন্ধু আবদুর রব সেরনিয়াবাতের চাচাত ভাই কবি রফিক সেরনিয়াবাতের নারিন্দার বাড়ির চিলেকোঠায় আশ্রয় নেন। এখানে বসেই বার্ট্রেল্ড রাসেলের (১৮৭২-১৯৭০) বই অনুবাদে হাত দেন। এখানেই কবি জসীম উদদীনের (১৯০৩-১৯৭৬) সঙ্গে পরিচিত হন।

আহমদ ছফা নিয়মিত চিঠিপত্র লিখতেন। বেশিরভাগই পারিবারিক। ২৩/০৩/১৯৯৩-তে একপত্রে আহমদ ছফা ভ্রাতুষ্পুত্র নূরূল আনোয়ারকে বলেন-‘তোমাকে তিন হাজার টাকা পাঠালাম। এই টাকা থেকে পাঁচ শ’ জামালকে, তিনশ শ’ জাফর, দু’ শ’ ইসলাম বুবু, তিন শ’ কুলসুম বুবু, তিন শ’ ওয়াজু বুবু, দু’ শ’ শহীদ এবং বাকী টাকা তোমার থাকবে।’ ছফা ঘর বাঁধেননি। স্ত্রী-পুত্রকন্যা নেই। দায়দায়িত্ব সংসারিকের মত থাকার কথা নয়। তবু পিতা না হয়েও পিতার, শ্বশুর না হয়েও শ্বশুড়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। পুরো পরিবারকে তুলে আনতে চাইতেন তিনি। দারিদ্র থেকে, অশিক্ষা-কুশিক্ষা থেকে, মধ্যযুগীয় ধ্যানধারনা থেকে আলোয় আনতে চাইতেন। গ্রামের বাড়ির ছোটছোট শিশুবাচ্চাদের লেখাপড়ার খোঁজখবর নিতেন, ইংরেজি শেখার প্রতি গুরুত্ব দিতেন, পুত্রসন্তান ও কন্যাসন্তানের পার্থক্য করতেন না। অধিক সন্তান না নেওয়ার পরামর্শ দিতেন। বাবামা এবং ভাইয়ের কবর জিয়ারতের পরামর্শ দিতেন। স্বজনেরাও ছফার ওপর অনেকটাই নির্ভর করতো। কিন্তু আহমদ ছফা তো কেবল স্বজনের জন্য নয়; তাঁর সামাজিক দায়দায়িত্বও আছে। বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিতেন-‘একটা জিনিষ তোমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমি যতটুকু আমার পরিবারের, তারও চেয়ে বেশি সমাজের। আত্মীয়তার দাবিতে অধিক কিছু কামনা করা আমার কাছে উচিত হবে না।‘

চতুর্থশ্রেণিতেই ১৮ পারা মুখস্থ। কেবল কোরান নয়; ছফা অল্পস্বল্প উর্দু-ফার্সি পড়তেন; রামায়ণ-মহাভারতও। রামকে নিয়ে কবিতা লিখতেন। সংস্কৃত ভাষাও বুঝতে পারতেন। পাহাড়ি স্কুলে চাকরিকালে স্কুল-বাচ্চাদের সংস্কৃত পড়াতেন। বিদ্যাচর্চায় ধর্ম ছফার কাছে বাঁধা হয়নি; হয়েছে সহায়ক শক্তি। আহমদ ছফা একবার ভ্যাটিকান দূতাবাসে গিয়েছিলেন। যাযকের ধর্ম সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে ছফা জানিয়েছিলেন-‘আমরা সাদা, কালো, বাদামী, পীত, হিন্দু, মুসলমান, ইহুদি, বৌদ্ধ, শিখ সকলের জন্য একটাই পৃথিবী। এই পৃথিবীর শান্তি আমাদের রক্ষা করতে হবে।’ গৌতমবুদ্ধ হওয়ার চিন্তায় ছোটবেলায় ছফা একবার বৌদ্ধমন্দিরে হাজির হয়েছিলেন। মসজিদ-মন্দির-গির্জা কোথাও যাতায়াতে ছফার বাঁধা ছিল না। রামকৃষ্ণ মিশনেও যেতেন, খ্রিষ্টান পাদ্রিদের কাছেও। কোথাও যাতায়াতে অথবা কারো সঙ্গে ওঠাবসা বা পঠনপাঠনে ধর্ম কখনোই ছফার সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ‘বাংলা-জার্মান-সম্প্রীতি’ উন্নয়ন-কাজে ০১/০৯/২০১৯ তারিখের চিঠিতে ছফা নূরূল আনোয়ারকে বলেন-‘লক্ষ্য রাখবে হিন্দু-মুসলমান প্রশ্নটি যেন কেউ বড় করে তুলতে না পারে। তোমরা যা করবে তাতে যেন অধিক মানুষের সমর্থন থাকে। সমস্ত মানুষ যেন মনে করে তোমরা যা করেছ উচিত করেছ।’ জাতপাতের ভিত্তিতে ছফা মানুষকে আলাদা করতেন না। মানুষকে তিনি মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করতেন। যাপিত জীবনে সর্বত্র অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা ছফাজীবনে দীপ্তমান ছিল।

১০

আহমদ ছফা নিজের চেয়ে অপরকে নিয়েই বেশি ভাবতেন। বিশেষত শোষিত-বঞ্চিত, নিপীড়িত-নিষ্পেষিত মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়েও। চট্টগ্রামে এক অসহায় বালকের কর্মসস্থানের জন্য ছফা হোটেল-মালিককে অনুরোধ করেন। হোটেল মালিক কেবল ছফার অনুরোধেই ছেলেটিকে চাকরি দেয়। ছেলেটি টাকা চুরি করে পালিয়ে গেলে সব দায়দায়িত্ব এসে পড়ে ছফার কাঁধে। এজন্য হোটেল-মালিক তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিল। এবং প্রায় দিনপনের ছফাকে জেল খাটতে হয়েছিল। ছফার চোখে কৃষকেরাই বেশি বঞ্চিত। ছফা পার্লামেন্টে কৃষক প্রতিনিধি প্রত্যাশা করতেন। সুষম সামাজিক উন্নয়নের জন্য উপজাতিদের ন্যায্য দাবি ছফার কাছে মান্যতা পেতো।

ঢাকা শহরে কেউ দশতলায়, কেউ গাছতলায়। গাছতলার বাসিন্দার ঘরবাড়ি, কর্মসংস্থান অথবা অন্নসংস্থান নেই। চিকিৎসা, শিক্ষাস্বাস্থ্যও নেই। এমনকি প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বাথরুমও নেই। বিত্তবানদের সহায়তায় ছফা এই সব পথশিশুর শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাটাবন সংলগ্ন এলাকায় খুলেছিলেন ‘শিল্পী সুলতান কর্ম ও শিক্ষাকেন্দ্র’ (১৯৮০)। বস্তি উচ্ছেদের সময় স্কুলটি উচ্ছেদ হলে দ্বিতীয়বার ছফা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন আজিজ সুপার মার্কেটের দোতলায়। নাম দিলেন ‘শিল্পী সুলতান পাঠশালা’। ইসলামি ফাউন্ডেশনের বক্তব্যের সম্মানি ছফা স্কুলফান্ডে দিয়ে দিতেন। চিরকুমার আহমদ ছফা স্কুলশিশুদের সন্তানতুল্য মনে করতেন; গভীরভাবে ভালোবাসেন। আহমদ ছফার জীবনের মূলমন্ত্র ছিল-যে উপায়েই হোক, মানব-কল্যাণ নিশ্চিত করা। প্রথম রয়ালিটির টাকা দিয়ে কবি আবুল হাসানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। জন্মদিনের উপহারাদি ছফা কমই ব্যবহার করতেন; নিডি মানুষের মধ্যে বন্টন করে দিতেন। ‘বাংলা চিত্র-ঐতিহ্য : সুলতানের সাধনা’ শির্ষক প্রবন্ধ লিখে সুলতানকে দেশব্যাপি পরিচিত করিয়েছিলেন।
স্বাধীনতা উত্তরকালে কবি ফররুখ আহমদের (১৯১৮-১৯৭৪) চাকরি কেড়ে নিলে ‘কবি ফররুখ আহমদের কি অপরাধ’ শিরোনামে নিবন্ধ লিখে কবি ফররুখ আহমদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ফররুখ পরিবারকে বাঁচাবার জন্য ‘ফররুখ আহমদ সাহায্য তহবিল’ গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। লেখাটি কর্তপক্ষের নজরে এলে শেষপর্যন্ত অর্থছাড় হয়েছিল। নিজের জীবনযৌবন বিলিয়ে দিয়েও অন্যায় প্রতিরোধে প্রস্তুত থাকতেন আহমদ ছফা। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য সরকার হুমায়ুন পরিবারকে একটি বাড়ি দিয়েছিল। রক্ষিবাহিনী বাড়িটি দখলে নিলে হুমায়ুন পরিবার ভীষণ পদে পড়ে যায়। বিপদকালে কেউ এগিয়ে না এলেও আহমদ ছফা এসেছিলেন। সঙ্গে এনেছিলেন এক ডোপ কেরোসিন তেল। বাড়ি ফিরিয়ে না দিলে প্রকাশ্যে আত্মাহুতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। শেষতক হুমায়ুন পরিবার বাড়ি ফিরে পেয়েছিল। হুমায়ুন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, শিহাব সরকার, সাঈদ-উর রহমান, অসীম সাহা, মোরশেদ শফিউল হাসান, মনসুর মুসাসহ অনেককেই আহমদ ছফা স্মারক (২০০৩) গ্রন্থে ছফার মানবিক গুণাবলি স্মরণ করতে দেখা যায়।

১১

মুক্তিযুদ্ধকালে আহমদ ছফা আগরতলা হয়ে কলকাতা যান। বিজয় অর্জন পর্যন্ত ছফা কলকাতাতেই ছিলেন। শরণার্থী-জীবন মোটেই সুখের ছিল না। অনেকদিন খেয়ে-নাখেয়ে দিন পার করতে হয়েছে। লেখক হওয়ার সুবাদে কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন তিনি। সেখানে নরেন বিশ্বাস, মুজাফফর আহমদ, চিত্তরঞ্জন দা, মাজহারুল ইসলাম, শ্রী দিলীপ চক্রবর্তী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিপ্লব দাস, মামুনুর রশিদ প্রমুখ সাহিত্য-সতীর্থের সহযোগিতা পেয়েছিলেন। বিশেষত দিলীপ চক্রবর্তী প্রসঙ্গে আহমদ ছফা বলেন-‘‘দিলীপবাবু আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। সব সময়ে এটা ওটা কিছু করিয়ে কিছু টাকা দিতে চেষ্টা করতেন। আসলে কাজটা ছিল ছুতো, যাতে করে আমাদের আত্মসম্মান আহত না হয় সেজন্য কাজের উসিলা করে টাকাটা দিতেন। অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি, দিলীপবাবুর দেয়া অর্থে আমাদের উদয়ন ছাত্রাবাসে পাঁচমিশালী পরিবারটার গ্রাসাচ্ছাদন বেশকিছুদিন চলেছে।’ অনিমেষ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত সাপ্তাহিক নতুন খবর পত্রিকাতেও ছফা অনুবাদকের কাজ করতেন। পত্রিকাটির ঠিকানা ছিল-৯১ নম্বর মঠ লেন, কলকাতা-৯১। ছফার বন্ধু নরেশদা ও সৌগতবাবু ছফার কাজটি পেতে সহায়তা করেছিলেন। প্রতি হাজার শব্দে পঁচিশ টাকা করে ছফা সম্মানি পেতেন। অর্থকড়ি না থাকলে লঙ্গরখানার ওপর নির্ভর করতে হতো। লঙ্গরখানায় খাবার না পেলে উপোস করতে হতো। তবু পিসি রায় রোড দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় শিবনারায়ণ দাসের মানচিত্র শোভিত বাংলাদেশের পতাকা উড়তে দেখে দুঃখের মধ্যে সুখ পেতেন ছফা। আহমদ ছফার হাতেই রচিত হয় মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ জাগ্রত বাংলাদেশ (১৯৭১)। কলকাতায় উদয়ন ছাত্রাবাসে অবস্থানকালে জ্বর নিয়ে মাত্র কয়েকদিনে ছফা গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছিলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায় (১৮৬৪-১৯২৪)। প্রকাশ হয়েছিল একাত্তরের জুলাই মাসে। দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে বিজয় আসে। বিজয়ে উল্লসিত হলেও ছফার কিছুটা রক্ষক্ষরণ হয়েছিল এই ভেবে, আত্মসমর্পণটা বাঙালি সৈন্যের কাছে হয়নি; হয়েছে ভারতীয় সৈন্যের কাছে। তাঁর দুঃখ- ‘পাকিস্তানি সৈন্য সারেন্ডার করল আমাদের কাছে নয়, ভারতীয় সৈন্য বাহিনীর কাছে।’ প্রত্যক্ষযুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও ছফা কলমযুদ্ধ চালিয়েছেন রীতিমত। এযুদ্ধ নয় মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ব্যাপ্তি ছিল সাতান্ন বছরের জীবনকালব্যাপী। লিখেছেন প্রবন্ধনিবন্ধ, গল্প-কবিতা-উপন্যাসসহ অর্ধশতাধিক গ্রন্থ। কেবল অলাতচক্র, ওঙ্কার অথবা জাগ্রত বাংলাদেশ এর মতো শিল্পকর্ম নয়, নয় খণ্ডের বিপুলাকৃতির এই রচনাসম্ভার তাঁর জীবনাভিজ্ঞতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শিল্পফসল। ৩০ জুন এই মহামানবের জন্মতিথিতে অফুরন্ত প্রণতি।


মোহাম্মদ আব্দুর রউফ

শিক্ষক, গবেষক-সাহিত্য সমালোচক।
আহমদ ছফার সাহিত্যকর্ম বিষয়ক অভিসন্দর্ভ রচনায় রত। প্রকাশিত গ্রন্থ – মজিদ মাহমুদ কবি ও কবিতা, বাংলা প্রবন্ধশৈলী ও সমালোচনা, আহমদ ছফা। জন্ম ১ মার্চ ১৯৮২। পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

Please Post Your Comments & Reviews

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected!!