কবি আহসান হাবীব

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী,

সম্পাদক, ঝিনুক –

দেশ বিভাগের আগেই সমকালীন কবি সাহিত্যিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন আহসান হাবীব। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার অনেক আগেই তাঁর কবিতা প্রসঙ্গে খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক আবু রুশদ এক প্রবন্ধে তাঁকে যথার্থ শক্তিশালী কবি হিসেবে সনাক্ত করেছিলেন। শক্তিমান এই কবি দীর্ঘ চল্লিশ বছর নিরলসভাবে কাব্য সৃষ্টিতে নিমগ্ন থেকেছেন। আধুনিক কবিতার দিগন্ত সূচনাকারী কবি হিসেবে জীবিতকালেই পেয়েছেন প্রতিষ্ঠা।

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ২ জানুয়ারি বাংলাদেশের পিরোজপুর জেলার শংকরপাশা গ্রামে আহসান হাবীবের জন্ম। পিতা হামিজুদ্দীন, মাতা জমিলা খাতুন। আধুনিক কাব্য ধারার কবি আহসান হাবীবের কাব্য চর্চার শুরু বাল্যকাল থেকেই। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালে ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম লেখা একটি প্রবন্ধ ‘ধর্ম’ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে পিরোজপুর গভর্নমেন্ট স্কুলের বার্ষিক সাময়িকীতে তাঁর প্রথম কবিতা ‘মায়ের কবর পাড়ে কিশোর’ ছাপা হয়। এরপর ছাত্রাবস্থায়ই কলকাতার কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। স্কুলে পড়াকালেই তিনি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তুকে কবিতায় উপস্থাপন করেছিলেন। হয়েছিলেন পুরস্কৃত। ততদিনে অবশ্য দেশ, মোহাম্মদী, বিচিত্রার মতো নামি দামী পত্রিকায় তাঁর বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করেছে৷ পিরোজপুর গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ১৯৩৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বরিশালের বিখ্যাত বিএম কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কলেজের পড়াশোনার পাট অসমাপ্ত রাখতে হয় তাঁকে।

১৯৩৬ সালের শেষার্ধে কাজের খোঁজে তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান। কথাসাহিত্যিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ একাদশ শ্রেণির ছাত্র থাকার সময় কলেজের পাট শেষ না করেই জীবনের সন্ধানে কলকাতায় চলে যেতে বাধ্য হন। আর আহসান হাবীবও প্রায় একই কারণে কলকাতায় এসে হাজির হন। এই দুজন কবি ও লেখক মহানগরে এসে সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দেন। এই মহানগরে প্রথমে পড়তে ও পরে কর্মে যোগ দিতে আসেন কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান। এভাবেই কবি আহসান হাবীবের বরিশাল থেকে কলকাতায় পদার্পণ। কলকাতা গিয়ে শুরু হয় আহসান হাবীবের সংগ্রামমুখর জীবনের পথচলা৷ তিনি কলকাতায় ১৯৩৭ সালে দৈনিক তকবির পত্রিকার সহ-সম্পাদক পদে যোগ দেন। বেতন মাত্র ১৭ টাকা৷ পরে তিনি ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কলকাতার বুলবুল পত্রিকা ও ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত মাসিক সওগাত পত্রিকায় কাজ করেন ৷ এছাড়া তিনি আকাশবাণীতে কলকাতা কেন্দ্রের স্টাফ আর্টিস্ট পদে ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কাজ করেন ৷

দেশভাগের পরে ঢাকায় এসে দৈনিক আজাদ, দৈনিক কৃষক, মাসিক মোহাম্মদী, দৈনিক ইত্তেহাদ, ও সাপ্তাহিক প্রবাহে চাকুরি করেন। ফ্রাংকলিন বুক প্রোগ্রামস-এ প্রোডাকশন এ্যাডভাইজার হিসেবে চাকুরি করেন ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত। ১৯৬৪ এর ১০ নভেম্বর দৈনিক পাকিস্তান ( অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক বাংলা’) পত্রিকার সাহিত্য পাতার সম্পাদক নিযুক্ত হন। প্রায় দুই দশক এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। আশির দশকে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। ১৯৮৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের এক অনুষ্ঠানে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন।

আহসান হাবীব ১৯৪৭ সালের ২১ জুন বগুড়া শহরের কাটনারপাড়া নিবাসী মহসীন আলী মিয়ার কন্যা সুফিয়া খাতুনকে বিয়ে করেন। দুই কন্যা -কেয়া চৌধুরী ও জোহরা নাসরীন এবং দুই পুত্র -মঈনুল আহসান সাবের ও মনজুরুল আহসান জাবের। পুত্র মঈনুল আহসান সাবের একজন প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক।

আহসান হাবীবের কবিতা কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে স্থির থাকে নি, পুনরাবৃত্তিতে হারিয়ে যায় নি। তাঁর প্রথম কাব্য থেকে শেষ কাব্য পর্যন্ত সেই ক্রমপরিণতির স্বাক্ষর বহন করে। আধুনিক কবিতার সব বৈশিষ্ট্যই তিনি তাঁর কবিতায় ধারণ করেছেন। তাঁর কবিতায় সামাজিক বোধ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সরল সঙ্গীত, লোকজ বাস্তবতার হৃদয়গ্রাহী ছবি, ঐতিহ্যসচেতনতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, প্রেমভাবনা, ইতিহাস সচেতনতা, সময় কিংবা স্বদেশভাবনা সহজ-সরল ভাষায় পরিচিত শব্দ প্রয়োগে, বিষয় আনুষঙ্গিক উপমা তুলে ধরে তিনি বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন।

আহসান হাবীরের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাত্রি শেষ’ -এর কবিতাগুলো ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যে রচিত। বাংলা কবিতা যখন সমাজসম্পৃক্ত এক নতুন সংজ্ঞায়, নতুন দিগন্তে উত্তীর্ণ হচ্ছে। দুটি মহাযুদ্ধের মন্দা প্রভাব, দুর্ভিক্ষ, পরাধীনতা, বণ্টন-বৈষম্য, সামাজিক অসাম্য, মহামারী, দাঙ্গা, পুঁজিবাদের বিস্তার ও রাজনৈতিক জটিলতা ‘রাত্রিশেষ’-এর উপজীব্য। আহসান হাবীব যুগ চেতনার কবি। কালের যন্ত্রণা আহসান হাবীব তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন এভাবে
‘তোমার আমার দিন ফুরায়াছে যুগটাই নাকি বৈপ্লবিক
গানের পাখিরা নাম সই করে নীচে লিখে দেয় রাজনৈতিক
থাকতে কি চাও নির্বিরোধ?
রক্তেই হবে সে ঋণ শোধ
নীড় প্রলোভনে নিরাপদ নয় বোমারু বিমান আকস্মিক
আরব্ধ গান এখানে শেষ আজকে আহত সুরের পিক।’
(আজকের কবিতা : রাত্রিশেষ)

সমাজ ও যুগ সচেতন কবি আহসান হাবীব অনুভব করেছেন, পৃথিবীর সৌন্দর্য স্বাচ্ছন্দ কোনো এক অজ্ঞাত, অশুভ শক্তি গ্রাস করতে উদ্যত। তবে তিরিশের কবিরা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করলেও তিনি তাদের মতো হতাশাবাদী ছিলেন না। ত্রিশোত্তর বাংলা কবিতার যে ধারা কৃত্রিমতা ও আরোপিত নৈরাশ্যে নিমগ্ন থেকে জীবনের নেতিবাচকতাকে মূল উপজীব্য করে তোলার প্রয়াস পেয়েছিল, তারই আঙ্গিক ও শৈল্পিক কলা কৌশলকে আত্মস্থ করে আহসান হাবীব অন্য এক মেরুতে অবস্থান নিয়েছিলেন। শুনিয়েছিলেন আশাবাদের গান। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিপর্যয়, যুদ্ধোত্তর বিশৃঙ্খলা ও মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবন যাপনের মাঝেও তিনি আশার বাণী উচ্চারণ করেন –
‘আমার দিনের আর রাত্রির শান্তির নামে
আর সেই বাসনার নামে
যে বাসনা একদিন দেখেছিল স্বপ্ন
কোন শান্তির নিলয় রচনার,
শপথ সে স্বপ্ন আর
সে অমর্ত বাসনার নামে
যুদ্ধ হত্যা লুণ্ঠনের উল্লাসের মুখে
যে পৃথিবী শংকায় আকুল;
আমি সেই পৃথিবীর সতর্ক সন্তান।
পিতা মাতা ভাই বোন প্রাণাপো প্রিয়জন নিয়ে
যদি কভু করে থাকি শান্তিময় গৃহের কামনা;
শপথ সে মৃত্যুজয়ী কামনার নামে
গৃহে গৃহে শান্তি যার হয়েছে লুণ্ঠিত,
সেই দুঃস্থ পৃথিবীতে শান্তির ঘোষণা নিয়ে যাবে আমার কবিতা গান।’
(প্রেম নারী মানুষ ঘোষণা : ছায়া হরিণ)

আহসান হাবীবের কবিতা বহুলপঠিত ও নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ষাট দশক থেকে তাঁর কবিতা বিভিন্ন শ্রেণীতে পাঠ্য করা হয়। আহসান হাবীবের কবিতা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও প্রতিভাবান নতুন কবি-লেখকদের তুলে ধরে বাংলা সাহিত্যের পথচলাকে সমৃদ্ধ করে গেছেন।

দেশভাগের পর আহসান হাবীব ঢাকায় ফিরে আসেন এবং সাংবাদিকতা পেশায় যোগদান করেন। সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছেন। তিনি দীর্ঘদিন দৈনিক বাংলা পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক পদের দায়িত্ব পালন করেন। আহসান হাবীব ছিলেন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনের অভিভাবকের ভূমিকায়। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ আটটি : রাত্রিশেষ (১৯৪৭), ছায়া হরিণ (১৯৬৩), সারা দুপুর (১৯৬৪), আশায় বসতি (১৩৮১), মেঘ বলে চৈত্রে যাবো (১৯৭৬), দুই হাতে দুই আদিম পাথর (১৯৮০), প্রেমের কবিতা (১৯৮১), বিদীর্ণ দর্পণে মুখ (১৯৮৫)। এ ছাড়া তিনি উপন্যাস, প্রবন্ধ, শিশু-কিশোর উপযোগী ছড়া, কবিতা ও গল্প রচনা করেছেন। করেছেন অনুবাদ। তাঁর সৃষ্টিকর্মের জন্য বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬১), ইউনেস্কো সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬০-৬১), আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৪) ও একুশে পদকসহ (১৯৭৮) বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৮৫ সালের ১০ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাত্র ৬৮ বছর বয়সে কবি আহসান হাবীব চিরদিনের তরে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে অনন্তলোকে পাড়ি জমান ৷

COMMENT

  • সুখপাঠ্য বর্ণনায় সংক্ষেপে কবি আহসান হাবিব কে জানলাম। বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য এই কবি সম্পর্কে আরো বহু কিছু বলা যায় কিন্তু স্থানাভাবে হয়তো এখানে আলোচনা করা হয়নি। উনার কবিতা ও প্রবন্ধের বিষয়বস্তু এবং সমকালীনতা নিয়ে মধুসূদন মিহির চক্রবর্তীর একটি লেখা ভবিষ্যতে কোন একসময় পড়ার আগ্রহ পোষণ করছি। “ঝিনুক” অনলাইন পত্রিকাটি বাংলা সাহিত্যের চর্চা এবং লেখক-পাঠক তৈরীতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে আশা ব্যক্ত করছি।

  • Please Post Your Comments & Reviews

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    error: Content is protected!!