শামসুর রাহমান: নগর-চৈতন্যের স্বরূপ ও বিনির্মাণ

শিল্পকলা প্রসঙ্গে সমাপনী বক্তব্য অর্থহীন। বিশেষ করে সেই শিল্প যদি হয় কবিতা। কবিতা সব সময় সম্ভাবনা নিয়ে অবিচল থাকে। সময়ের পায়ে-পায়ে কবিতাও পা বাড়ায় আগামীর পথে। ঠিক যুৎসই সময়ে কবিতাও হয়ে উঠে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের, বলা যায় বিশ্বের। যে জন্যে কবিতা সর্বজনীন, সীমানা মানে না। তবুও কখনো কখনো ‘কবিতার প্রবণতা’ নিয়ে কথা ওঠে। কবির কবিতা বিশ্লেষণের আগে জানা আবশ্যক হয়ে পড়ে যে, কবিতা সম্পর্কে কবির স্বীয় বোধ ও বিশ্বাস কি ছিল। একজন কবি কী প্রসঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁর কবিতার শরীর কেমন, তাঁর কবিতার প্রসঙ্গ ও প্রাকরণিক চিহ্ন অতীত না সাম্প্রতিক, তত্ত্ব কিংবা কোনো দর্শন কবিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে কি-না। এরকম অনেক কিছুই কবিতার সমঝদারগণ অন্বেষণ করেন কবিতার ক্যানভাসে। কিন্তু এতো এতো প্রবণতা নিয়ে কথা বলার পরও স্থির সিদ্ধান্তে আদৌ পৌঁছতে পারি? খুব জোর গলায় আদৌ কি বলতে পারি-হ্যাঁ, এটাই কবিতা হয়েছে! কবিতা সম্পর্কে এমন সিদ্ধান্ত একেবারেই যে অর্থহীন নয়। তবে কবিতা সম্পর্কে এমন প্রত্যয়ন ব্যক্তির অভিমত কিংবা বিবেচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে বলে মনে করি। মূলত: এখানেই কবিতার সফলতা বলে কেউ কেউ মনে করেন যে, কোনো পঙ্ক্তি যতক্ষণ ‘অধরা মাধুরী’ নিয়ে মূর্ত থাকে, ততোক্ষণই তা কবিতার সরোবরে ফোটে সীমাহীন আনন্দোৎস হয়ে। তাই বলে কবিতা নিয়ে কথা হবে না? হবে, ‘কারণ মানুষ ও কবিতা অবিচ্ছেদ্য। মানুষ থাকলে বুঝতে হবে কবিতা আছে; কবিতা থাকলে বুঝতে হবে মানুষ আছে।’১

শামসুর রাহমান আধুনিক বাংলা কবিতার ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে আছেন একজন সফল কবির অবয়ব নিয়ে, আমৃত্যু তিনি কবিতার প্রতি সমর্পিত থেকে পরিপূর্ণ কবিচিত্তের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ফলে, কবিতা সম্পর্কে তাঁর রয়েছে নিজস্ব বোধ ও বিশ্বাসের ভূমি, যেখানে তিনি কবিতার পরিচর্যা করেছেন নিজের মতো। কবিতা কী, কবিতা কখন কীভাবে কবি মনে উপ্ত হয়, সর্বোপরি কবিতার রকম ও নানা উপকরণ সম্পর্কে কবি শামসুর রাহমানের রয়েছে বৈদগ্ধ্যপূর্ণ ভাবনা। কখনো কবিতায়, কখনো প্রবন্ধে, কখনো বা বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও কথোপকথনে কবিতা সম্পর্কে তিনি তাঁর ভাবনাকে প্রকাশ করেছেন। তাঁর কবিতার রসাস্বাদনের জন্য কাব্যবিষয়ে তাঁর চিন্তার সারাৎসার জানা জরুরি বৈ-কি। এই লেখায় শামসুর রাহমানের নগরকেন্দ্রিক কাব্য-ভাবনাই মূলত: অন্বিষ্ট বিষয়।

নগরচেতনা আধুনিক কবিতার একটি মৌল প্রবণতা। পাশ্চাত্য সাহিত্যে, বিশেষ করে কবিতায় নাগরিক জীবনের যে চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে, তার তুলনায় বাংলা কবিতায় নগর-চেতনাকে কখনোবা আরোপিত মনে হতে পারে। বাংলা কবিতায় নগরচেতনার উন্মেষ কবি ঈশ্বরগুপ্ত থেকেই প্রচ্ছন্নভাবে প্রকাশ পেলেও আক্ষরিক অর্থে বিশ শতকের তিরিশ-দশকের কবিদের কবিতায় তা প্রবলভাবে প্রযুক্ত হয়। মূলত রবীন্দ্রকাব্য ভুবনকে অস্বীকার না করে এই দশকের কবিবৃন্দ পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণাকে স্বীকরণ করে কবিতার নতুন পথ অন্বেষণে প্রয়াসী হয়েছেন। এক্ষেত্রে নগরচিন্তা তাদের মধ্যে কম-বেশি স্পষ্টত জায়গা করে নেয়। তাঁরা অনুধাবন করেন¾

আমাদের জীবনের কেন্দ্র এখন সরে এসেছে শহরে। শহর এখন আমাদের জীবনকে রূপায়িত করে, ধ্বংস করে, পরিপূর্ণ করে। শহরের মধ্যে, শহরের প্রাণের মধ্যে আমরা বাঁচি।২

self-Ad

সময়ের বিবেচনায় বাংলা কবিতা উনিশশো সাতচল্লিশ পরবর্তীকালে যথার্থরূপে নাগরিকতাকে ধারণ করে। কারণ ইতোপূর্বে নদীজল-বেষ্টিত এই বাংলায় প্রকৃত নগরের অবয়ব গড়ে ওঠেনি। তাই সাতচল্লিশ-উত্তরকালের তরুণ কবিবৃন্দের মেধা ও মননে তিরিশের দশকের কবিদের কাব্যভাবনার পাশাপাশি পাশ্চাত্যের নাগরিক অনুভব তীব্রভাবে জেগে ওঠে। তাঁরা শার্ল বোদলেয়ারের প্যারিস, টি. এস. এলিয়টের লন্ডন, জেমস জয়েসের ডাবলিন আর জীবনানন্দ দাশ কিংবা সমর সেনের কলকাতা শহরকে প্রচণ্ডরকম অনুকরণের জায়গায় নিয়ে আসেন। কারণআধুনিক বাঙলা কবিতা এক আন্তর্জাতিক প্রপঞ্চের বঙ্গীয় রূপ, ওই প্রপঞ্চের নাম আধুনিকতা বা আধুনিকতাবাদ, যার উদ্ভব ঘটে পশ্চিমে, এবং ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। আমাদের ভাগ্য যে,বাঙলা কবিতা ওই প্রপঞ্চের বাইরে থাকেনি। বরং থেকেছে অত্যন্ত ভেতরে, এবং সুফল ফলিয়েছে কবিতার।৩

পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের কবিতাঙ্গনে আবির্ভূত কবিদের মধ্যে শামসুর রাহমানের কবিতায় নগরচেতনার প্রতিফলন ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। সে জন্যে কবিতায় নগরকেন্দ্রিক তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানা অত্যাবশ্যক বৈ-কি? শামসুর রাহমান পঞ্চাশের দশকের কবি হিসেবে সুচিহ্নিত হলেও তাঁর প্রথম কাব্য ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬০ সালে। কিন্তু ততোদিনে তাঁর কবি-পরিচিতি ছড়িয়ে গেছে। কলকাতায় বেশ কয়েকটি পত্রিকায় তার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। বুদ্ধদেব-বসু-সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে একাধিক কবিতা। এভাবেই বাংলা কবিতার মূলস্রোতে শামসুর রাহমানের যাত্রা। ত্রিশ-দশকের পর চল্লিশের দশকের বাংলা কবিতা স্পষ্টত দুটি ভাবধারাপুষ্ট হয়ে বিকশিত হয়। প্রগতিশীল কবিগোষ্ঠী এবং ইসলামি ভাবধারাপুষ্ট কবিগোষ্ঠি-এ দুটি শাখা কবিদের পৃথক দুটি শিবিরে বিভক্ত করে। শামসুর রাহমান প্রগতিশীল ভাবধারাপুষ্ট কবিদের যোগ্য উত্তরসূরী। সমকালে কবি সানাউল হক, সিকান্দার আবু জাফর, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ এবং আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ প্রমুখ কবিদের মধ্যে শামসুর রাহমানের কবি প্রতিভার প্রমাণ আরো বেশি প্রগাঢ়। আশৈশব ঢাকাতেই বেড়ে ওঠা এই কবি শহরকে অবলোকন করেছেন একান্তই ব্যক্তিগত দৃষ্টি দিয়ে। ঢাকা শহরের ভাষা-ঐতিহ্য-সংস্কৃতিকে তিনি তাঁর কাব্যভাষায় বাঙ্ময় করেছেন। আধুনিকবাদী হিসেবে নিজেকে জাহির করার প্রয়াসে যেখানে অপরাপর কবিরা স্বেচ্ছায় ইউরোপীয় কবিদের আদলে কৃত্রিম নগরের চিত্রায়ণে উৎসাহী। সেখানে শামসুর রাহমানের প্রাতিস্বিকতা এই যে, তিনি তাঁর নগরকে দেখেছেন দৈনন্দিন জীবন-যাপনের রীতি-নীতির ভেতর দিয়ে। কীভাবে পুরাতন ঢাকা ক্রমশ নতুন ঢাকায় পরিবর্তিত হচ্ছে। আবার ভাষা ও ঐতিহ্যগত একটি ব্যবধান সহজেই তিনি নির্ণয় করেছেন তাঁর কাব্যভাষায়। শামসুর রাহমান উপলব্ধি করেছেন, ঢাকা পুরাতন শহর হলেও আধুনিকতার মানদণ্ডে যথার্থ শহর ছিল না। ঔপনিবেশিক শাসনামলে শহর বলতে কলকাতার ছবিই কেবল ভেসে ওঠে। ঢাকার নগরায়ণ ঘটেছে ধীরে, বলা যায় সাতচল্লিশে দেশ-বিভাগের পর। তখন এখানে নাগরিক নানা উপকরণের সমাবেশ ঘটলেও ইউরোপীয় নগরসমূহের মতো নাগরিক মানসিকতা তেমন গড়ে ওঠে নি। বিশ শতকের প্রারম্ভে পাশ্চাত্য সাহিত্যে নগরকে কেন্দ্র করে যে আধুনিক কাব্যান্দোলন গড়ে ওঠেছিল, তেমন নগরের প্রতিরূপ সেই সময়ে বাংলাদেশে ছিল অনুপস্থিত। শামসুর রাহমানের কাব্য ভাবনায় নাগরিকতা স্থান পেয়েছে স্বদেশীয় সংস্কৃতির আলোকে। তিনি তাঁর কবিতার ক্যানভাসে সেই শহরের চিত্র এঁকেছেন, যে শহরে নানা- শ্রেণি পেশার মানুষের বসবাস। নিম্ন-মধ্যবিত্ত মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত মানুষের যাপিত জীবন তাঁর কাব্যভাষায় স্থান পেয়েছে। তিনি শৈশব, কৈশোর ও প্রথম যৌবনে পুরনো ঢাকার প্রতিটি পাড়া-মহল্লার সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। ভিস্তিওয়ালা, বাতিওয়ালা, পাড়ার বিভিন্ন পেশার মানুষ, মসজিদ, মন্দির নানা রকম খাবার ও খাবারের দোকান, সিনেমাহল, বুড়িগঙ্গা, শহরের অলি-গলি প্রভৃতি তাঁর নগরচৈতন্যের ভিত্তিভূমি গড়ে দেয়। আর এই ভিত্তিভূমিই শামসুর রাহমানের নগরমানসকে শাণিত করে।

শামসুর রাহমান তাঁর আত্মজীবনীর একটি অংশে স্বীয় নাগরিকবোধ ও মানসনির্মাণের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন। উদ্ধৃতিটি দীর্ঘ হলেও প্রাসঙ্গিক ভেবে উল্লেখ করা যেতে পারে 

আমি মানুষ হয়েছি সাহিত্য ছুট পরিবেশে। আমাদের পরিবারে সঙ্গীত ও চিত্রকলা সম্পর্কে কারো কোনো আগ্রহ ছিল না। তবে ছেলেবেলায় ঢাকাই সংস্কৃতির কিছু ছোঁয়া পেয়েছিলেম। বহুবার কাওয়ালী ও মেরাসিনের গান শুনেছি। মেরাসিনের গান একধরনের মেয়েলী গীত যা একময় পুরনো ঢাকায় খুব শোনা যেত। মহিলারা আঁতুরঘরে চল্লিশ দিন কাটানোর পর সম্পন্ন ঘরে উৎসব হত, সেই উৎসবে মেরাসিনদের ডাকা হত, তারা কিছু টাকার বিনিময়ে ঢোল বাজিয়ে গান গাইতো। বিয়ে-শাদিতেও মেরাসিনদের আসর বসতো। কাওয়ালির জন্য অবশ্য কোনো উপলক্ষের প্রয়োজন হত না। গৃহস্বামীর ইচ্ছা হলেই কাওয়ালদের আগমন ঘটতো বাড়িতে। কখনো কখনো মহল্লার সবাই মিলে কাওয়ালী আয়োজন করতেন। সারারাত ধরে জমজমাট আসরে কাওয়ালী গাওয়া হতো। দুজন কাওয়ালের মধ্যে চলত প্রতিযোগিতা। উৎসাহী শ্রোতারা মত্ত হয়ে টাকা ছুঁড়ে মারতেন কাওয়ালদের দিকে। আর চৈত্র-সংক্রান্তির দিনে মহল্লায় মহল্লায় রঙ বেরঙের ঘুুিড় ওড়ানোর ধুম পড়ে যেতো। যদিও আমি নিজে ঘুড়ি ওড়াতে পারতাম না, তবু আসমানে ঘুড়ির মেলা দেখতে ভালো লাগতো। লাইটায়ের কারিগরিতে ঘুড়ি ধরার জন্য মন চঞ্চল হয়ে উঠতো , কিন্তু আব্বা নারাজ হবেন ভেবে লগি নিয়ে বের হই নি। মহল্লার ছেলেদের ঘুড়ির নেশায় আমি মাতাল হয়ে উঠতাম মনে মনে। কাটা ঘুড়ি ধরার লোভে কোনো দুরন্ত ছেলে এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে লাফাতে গিয়ে বিপত্তি বাঁধিয়ে বসত। কারো কারো হাত ভাঙত, কেউ কেই বেঘোরে প্রাণ হারাতো।’৪

শামসুর রাহমানের নগরচৈতন্যকে আচ্ছন্ন করে আছে স্মৃতির শহর। ঢাকার পরিবেশ ও সংস্কৃতিতে তাঁর নগর-চৈতন্য লীন হয়ে আছে। পক্ষান্তরে, ইউরোপে আধুনিক কবিতায় যে নগর কবিদের মনে তৈরি করেছে হতাশা, ক্রোধ, নাস্তিকতা, প্রবল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ,ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং পারস্পরিক সম্পর্কে ভাঙন সেগুলো কবি শামসুর রাহমানকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে নি। তাঁর কবিতার স্বগোতুক্তিতে এর স্বীকৃতি মেলে

শামসুর রাহমান বলে আছে একজন, নিজের কাছেই বন্দী সর্বক্ষণ।

প্রতিদিন শহরের সবচেয়ে করুণ গলির মুখচ্ছবি

মুখের রেখায় নিয়ে হাঁটে ফুটপাতে…

‘পারিপার্শ্বিকের আড়ালে’ /শূন্যতায় তুমি শোকসভা 

এখানে কবিসত্তার উপস্থিতি শহরের করুণ গলিতে বিম্বিত হয়েছে। অন্তর্গত দ্বন্দ্ব, হতাশা এবং বন্দীদশার নিঃসঙ্গতার তিরে কবি ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন।

self-Ad

তিরিশের অগ্রগণ্য পাঁচ প্রধান কবি (জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে) ইউরোপাগত নগর-চেতনায় যেখানে সমর্পিত, শামসুর  রাহমান সচেতনভাবে সেই অবস্থান  থেকে নিজেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন। একদিকে ইংরেজি ও আমেরিকান সাহিত্যে ডব্লিউ বি ইয়েটস, টি.এস.এলিয়ট এবং এজরা পাউন্ড প্রমুখ কবি কবিতাকে রোমণ্টিক ভাবাবেগ থেকে মুক্ত করে আধুনিকায়নে প্রয়াসী ছিলেন। অন্যদিকে ফরাসি প্রতীকবাদী কবি বোদলেয়ার, ভের্লেন, মালার্মে প্রমুখ কবি আধুনিক কাব্যান্দোলনে নগর ও নগরচেতনাকে আধুনিকতার অন্যতম প্রধান ডিসকোর্স হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। বোদলেয়ারের চোখে প্যারিস একটি ‘ইটপাথরের হৃদয়হীন নগরী’ টি. এস. এলিয়টের চোখে লন্ডন একটি ‘অবাস্তব শহর’। মূলত তাঁদের নগরচেতনার প্রধান ভাবনা নেতিবাচক, ধ্বংসোন্মুখ নগরীর প্রতীক, কৃত্রিম নগর-অনুভব নিয়ে টি. এস. এলিয়ট লিখেছেন

unreal city,

under the brown fog of winter noon

Mr Egenides, the smyrna marchent

unshaven, with a pocket full of currants

c.i.f London : Documents of sight,

Asked me in demotic French

To Luncheon at the Canon Street Hotel

Followed by a Weekend at at Metropole.5

অনুরূপভাবে শার্ল বোদলেয়ার ‘জনাকীর্ণতার’ মধ্যে আবিষ্কার করেন ‘নির্জনতা’। তাঁর কবিতায় নগর হচ্ছে নারকীয় যন্ত্রণা, পাপ ও পতন , নষ্ট ও পচনশীল সভ্যতার বহান। তাঁর লেখা ‘ক্লেদজ কুসুম’ (১৮৫৭) কাব্য জুড়ে কেবল পতিত শহরের বিবরণ। শামসুর রাহমান এই প্রসঙ্গগুলোকে তাঁর কাব্যে একেবারেই স্থান দেন নি এমন নয়। বরং তাঁর নিরন্তর আরাধনা ছিল ঢাকা শহর। বাস্তব ও দৃষ্টিগাহ্য ঢাকাকে তিনি কাব্যিক ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করেছেন।

নগর-চেতনার জন্য যে দার্শনিক মনোভূমি প্রয়োজন, শামসুর রাহমান তা অর্জন করেছেন নির্মোহ কবিসত্তা নিয়ে। তাঁর কবিদৃষ্টি ইউরোপীয় নগর-চেতনাকে অবলোকন করে স্থিত হয়েছে ঢাকার ‘চকবাজারে ঘিঞ্জি গলির কিনারে’ ‘ছেচল্লিশ মাহুতটুলীর ছাদে’ ‘আশেক লেন’ কিংবা সেই ‘বাতি অলা’র কাছে যিনি সর্বাঙ্গে আঁধার মাখা কবি কিশোরকে প্রশ্ন করেন 

সর্বাঙ্গে আঁধার মেখে কী করছ খোকন?

চিবুক ঠেকিয়ে হাতে, দৃষ্টি মেলে দূরে প্রতিক্ষণ

কী ভাবছ বসে?

হিজিবিজি কী আঁকছ? মানসাঙ্ক কষে

হিসেব মিলিয়ে নিচ্ছ? দেখছ কি কতটুকু খাদ

কতটুকু খাঁটি এই প্রাত্যহিকে, ভাবছ নিছাদ

ঘরে থাকা দায়, নাকি বইপত্রে ক্লান্ত মুখ ঢেকে

জীবনের পাঠশালা থেকে

পালানোর চিন্তাগুলো ভ্রমরের মতো

মনের অলিন্দে শুধু ঘোরে অবিরত?

          ‘শৈশবের বালি-অলা আমাকে’/ বিধ্বস্ত নীলিমা

ঢাকা-শহরবাসী শামসুর রাহমান মূলত নগরচেতনায় লালন করেন সাতচল্লিশ-উত্তর নতুন রাজধানীকেন্দ্রিক বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের বিকাশের আদ্যোপান্ত। ঢাকা নগরীর নিত্য দিনের কর্ম-কোলাহল এবং দৃশ্যমান নানা উপকরণ তাঁর নগর-মানসকে বিস্তৃত করেছে। এ প্রসঙ্গে শামসুর রাহমানের স্বীকারোক্তিটি প্রণিধানযোগ্য

দীর্ঘকাল ঢাকা শহরে আছি। এই বাক্যটি লিখতে আমার মাত্র কয়েক সেকেন্ড লেগেছে। কিন্তু এর শরীরে আছে প্রচুর ধুলো হাওয়া, রৌন্দ্র, জ্যোৎস্না, ভেজামাটির গন্ধ, ঘাসের স্পর্শ, ঘোড়ার গাড়ির শব্দ, বিস্কুটের টাটকা ঘ্রাণ রয়েছে ঘুরে বেড়ানোর নেশা, গলির অন্ধকার নেশা, হৈহল্লা। অনেক দিন অনেক কিছু নিয়ে আমার ঢাকায় থাকা। কখনো ছ্যাকড়া গাড়ির চাকায়, কখনো বা রিক্সার ঘন্টির রিনঝিন আওয়াজে ঢাকা ঝংকৃত হয়ে ওঠে আমার চেতনায়। আমার মনের ভেতরেও সময় সময় এই শহর এক অর্কেষ্ট্রা হয়ে যায়।৬

শামসুর রাহমান চেতনায় যে ঢাকাকে লালন করেছেন, তা কবিতায় উন্মোচিত করতে উৎসাহী ছিলেন। তিনি এই উৎসাহকে নিভৃত করতে সক্ষম হয়েছেন নিজস্ব পদ্ধতিতে। তিরিশের আধুনিক কবিদের দ্বারা প্রভাবিত হলেও নগর-চেতনায় তাঁর প্রাতিস্বিকতা প্রশ্নাতীত। সমর সেন তাঁর কবিতায় এলিয়টের লণ্ডনকে দাঁড় করিয়েছেন

          বস্তুত সমকালীন নগর জীবনের বিপর্যস্ত মূল্যবোধ, চরম শৈথিল্য, অসুস্থ্য মনোবিকার, যান্ত্রিক জীবন-সম্ভোগের অপরিসীম ক্লান্তি, জীবনবোধের ক্ষেত্রে আদর্শিক চেতনার স্খলন, অনিশ্চয়তাজনিত অস্থিরতা, সমস্যা-সংকুলতার মুখে ক্রমবর্ধমান জীবন-বিতৃষ্ণ মনোভাব ইত্যাদি যে সব লক্ষণ সমকালীন কলকাতায় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হয়েছিল সেই অবক্ষয়গ্রস্ত সামাজিক পরিবেশের ছবিই অনুপুঙ্খভাবে ফুটে উঠেছিল সমর সেনের কবিতায়।৭

অনুরূপভাবে পঞ্চাশের দশকের অপর কবি শহীদ কাদরীও ইউরোপাগত নগর-চেতনা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি। শামসুর রাহমানের এই স্বতন্ত্র নগর-চেতনাকে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যথার্থ ভাবেই পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি বলেন

শামসুর রাহমানের কবিতায় জায়গাজমির অনেকটা জুড়ে থাকে ঢাকা শহর। তিনি ঢাকার লোক, এখানেই বড়ো হয়েছেন, কিন্তু শহরকে তিনি দ্যাখেন কখনো ‘প্রবাসী কিংবা প্রণয়ীর চোখে।’ এর কোনো কিছুই তাঁর চোখে এক ঘেয়ে হয় না, প্রবাসীর কৌতুহল এবং প্রেমিকের উৎকণ্ঠায় এই শহরকে নতুন নতুন পরতে উন্মোচন করেন তিনি। আমাদের এই বহুকালের শহরটি, তাঁর এঁদো বস্তি, জ্যৈষ্ঠে পোড়া ও শ্রাবণে ভেজা, ঠেলাগাড়ি, জনসভা, মিছিল, পার্ক  ল্যাম্পপোস্ট, ফুটপাত- সব, সবই তাঁর কবিতায় ঘোরতরভাবে উপস্থিত। জীবনের স্তরে স্তরে প্রবেশ করতে, তার পাতালের কালি কুড়িয়ে আনতে, তার সকল রহস্যময়তা খুলে দেখার জন্য বার বার তিনি মাধ্যম করেছেন এই শহরকে। ‘স্মৃতির শহর’ কিন্তু ঢাকাকে তাঁর বক্তব্য প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হয়নি, ঢাকা এখানে উত্তীর্ণ হয়েছে সম্পূর্ণ বিষয়বস্তুতে, ঢাকাই তাঁর বক্তব্য।৮

সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনা-প্রবাহের অভিঘাতে শামসুর রাহমানের নাগরিকবোধেও যুগযন্ত্রণা বিযুক্ত হয়। তিনি উপলব্ধি করেন সময়ের দায়বদ্ধতা। দেশ ও মানুষের কল্যাণে কবিতায় উচ্চারিত হয় বাস্তব-ভুবনের আখ্যান। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘রৌদ্র করোটিতে’ (১৯৬৩) এসে তিনি মনোলোক থেকে বহিঃর্বিশ্বে বেরিয়ে আসেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি

কাব্যক্ষেত্রে পদার্পণের পর কিছুকাল কবিতার ত্রিসীমায় দরিদ্র সাধারণ জনের কোনও সমস্যা, বাস্তবের ছায়াকে ঘেঁষতে দিই নি। কিন্তু কিছুকাল পর সমাজের অস্থিরতা, নানা সমস্যা আমার কবি সত্তার ঘাড় ধরে বাস্তবতার মুখোমুখি নিয়ে এলো। বুঝতে আমার অসুবিধা হল না যে, শুধু কল্পনার মায়াজালে আটকে থাকলে চলবে না, কল্পনার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবের কাছেও হাত পাততে হবে কবিতার সারবত্তা অর্জনের উদ্দেশ্যে।৯

কারণ সাতচল্লিশ-পরবর্তীকালে পূর্ববাংলায় স্বাধীনতার প্রাক-প্রস্তুতি ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। ১৯৫২-এর ভাষা-আন্দোলন, ১৯৫৪ এর সাধারণ নির্বাচন, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখল, ১৯৬২ সালে শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে বাঙালি ছাত্রদের সংক্ষুব্ধ হওয়া, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা দাবি, ১৯৬৯ সালে ছাত্রসমাজের ১১ দফা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গণ-অভূত্থানের আন্দোলন, ’৭০-এর নির্বাচন এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শামসুর রাহমানের নাগরিকবোধকে দ্রোহী করে তোলে। তখন এই নাগরিক কবি প্রতিরোধের ভাষা খোঁজেন শহরের অলিগলিতে। কবিতার বুননে হাঁতড়ে বেড়ান শহুরে উপমা কিংবা চিত্রকল্প। যেমন

self-Ad

তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা

শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এলো

দানবের মতো চিৎকার করতে করতে’

 ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ /বন্দী শিবির থেকে

কিংবা

শহরে আজ ট্রাফিক গর্জায়

চতুর্দিকে চলছে কী হুজুগ;

কত চৈত্র, কত শ্রাবণ যায়,

তোমাকে আমি দেখিনা কত যুগ।         

‘জন্ম ভূমিকেই’/যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে

শামসুর রাহমানের নাগরিকতাবোধ সমকাল সংলগ্ন এক শরার্ত বিবেকবন্দী মানুষের। যিনি পারিপার্শ্বিক দৃশ্য দেখে দুমড়ে-মুচড়ে মুষড়ে পড়েন। নিজেকে আবিষ্কার করেন কোনো ‘বন্দী শিবির থেকে’। ‘নিজ বাসভূমে’ ‘দুঃসময়ের মুখোমুখি’ হয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন-

উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ,

হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায় ।

শামসুর রাহমানই বাংলাদেশর প্রথম কবি, যিনি শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত ঢাকা নামক প্রায় মফস্বল শহরকে কবিতার মাধ্যমে উত্তরকালের কবিকুলের কাছে তুলে ধরেছেন। কবিতাকে শিল্পোত্তীর্ণ করার সমান্তরালে ঢাকা শহরকে নির্মাণ করেছেন বোধ ও অভিজ্ঞতার নিক্তিতে। তাঁর কাব্যের পরিভ্রমণ নগরের নাড়ি-নক্ষত্র জুড়ে। তুচ্ছাতি তুচ্ছ বিষয় কিংবা ঘটনাও তিনি কবিতা থেকে বাদ দিতে চাননি। অতি তুচ্ছকেও কবিতার আসরে সম্মান দিয়ে সমাসীন করেছেন। একটি বিশেষ জনপদ, নগর ও নগর সংস্কৃতি, নাগরিক মানুষের নিঃসঙ্গতা, বিষাদ ও আতঙ্ক, দুঃখবোধ ও দায়বদ্ধতা, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ইত্যাদি তার নগরমানস নির্মাণে প্রবল ভাবে প্রভাব ফেলেছে

শামসুর রাহমান জীবনের শুরু থেকেই নগরের বাসিন্দা। তাঁর নগর কসমোপলিটন শহর নয়, সেখানে হাইওয়ে, স্কাইস্ক্রেপার, মেট্টোরেল, ফ্লাইওভার কিংবা চকচকে গাড়ির শহরও নয়। তাঁর শহর অনেকটাই না-গ্রাম, না-শহরের মতো। তাঁর শহর পুরনো ঢাকাকেন্দ্রিক একটি ভিন্ন ভুবন। যেখানে থাকে অনেকটাই প্রত্ন-ঐতিহ্যের মতন বেতো ঘোড়া, সহিস, আস্তাবল, নর্দমা, পচা ড্রেন, নিলোর্ম কুকুর, ভিস্তিওয়ালা, গ্যাসবাতি, জ্যোৎস্না ধোয়া মসজিদের মিনার, রাতের মাতাল, খিস্তিওয়ালা পথিক, শ্যাওলা ধরা বাড়ি, তার প্রাচীরে রোগা ঈগল, কূয়োতলা, কূয়োর ঠাণ্ডা দূষিত জল, ইদুঁর, ফ্যাকাশে চাঁদ, সেলুনে বসে থাকা গলাবসা বেকার প্রৌঢ়, কানির্শের কাক, অন্ধকার রাতে পরীদের স্বপ্ন, ইলেকট্রিকের তার, কাঠের দোকান, পার্ক, জানালা, গলির অন্ধ বেহালাবাদক, ঘোড়ার নালের মতো চাঁদ প্রভৃতি। ১০ 

অর্থাৎ স্বতন্ত্র এক শহরের প্রতিরূপ তাঁর নগরমানস নির্মিতিতে প্রতিফলিত হয়েছে।

শামসুর রাহমানের নগরচেতনা জুড়ে আছে স্মৃতি। নস্টালজিক অনুভূতি তাঁর কাব্যিক ভাবাবেগকে কখনোবা দ্বিখণ্ডিত করেছে। তাই ক্রমবর্ধমান ঢাকা মহানগরের জনাকীর্ণ কোলাহল তাকে মনে করিয়ে দেয় ফেলে আসা  অতীত-স্মৃতির নির্জন পরিচ্ছন্ন মফস্বল শহরের কথা। তাঁর ভাষায়

শহরের নাম ঢাকা। এ শহরে একটা সরু গলিতে যখন আমি প্রথম চোখ খুলেছিলাম তখন ঢাকা ছিল কেমন ফাঁকা ফাঁকা। এত দরদালান ছিল না, বাস ছিল না, মোটর ছিল না, এমনকি রিকশাও ছিল না, রাস্তায় ছিলন। সারি সারি পিঁপড়ের মতো মানুষের ভিড়। ছিল ছোট ছোট পথ, একটি কি দু’টি বড় রাস্তা ছিল। ছিল অনেক গুলো গলি, সেসব চুলের ফিতের মতো গলির ভেতর ছিল জনমনিষ্যির বসতি। পাড়ায় পাড়ায় ঘাস-বিচালির গন্ধ ছড়ানো আস্তাবল ছিল, আর ছিল ঘোড়ার গাড়ি। গাড়োয়ানের চাবুক ঝিকিয়ে উঠত হাওয়ায়, রোদ্দরে। কাছে-দূরে মজাদার শব্দ করে ঘোড়া ছুটত দ্বিগি¦দিক-খট্ খট্ খট্ গাড়োয়ান লাগাম নেড়ে বলত- হট্ হট্ হট্। ১১

শামসুর রাহমানের এই স্মৃতিকাতরতা কবিতাতেও প্রতিফলিত হয়েছে 

মনে পড়ে দূর ফেলে আসা গলি,

মিনি সুপার মার্কেট অতিসাধারণ,

বাসার কাছেই

খুর্বুটে দোকানদার, যার টকটকে লাল দুটো চোখ

সিগন্যাল বাতি, হাসি আন্তরিক;

প্রেমে পড়া ঘুরঘুর

তরুণ কুকুর মহল্লার; বাতিজলা রাতের কলোনী আর

পথিকের আসা যাওয়া, যুগল কবর, টিএসসি সড়ক দ্বীপ, মুখর কবিতা

‘সে এক পরবাসে’ /সে এক পরবাসে

১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় শামসুর রাহমানের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’। গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি কবিতা সম্পর্কে অন্তর্ভেদী মন্তব্য করেছেন। যেখানে কবিতা সৃষ্টিরহস্য এবং নিস্তরঙ্গ শহরের নিঃসঙ্গ এক কবির অন্তোর্লোক উন্মোচিত হয়

যা কিছু মানুষের প্রিয়-অপ্রিয়, যা কিছু জড়িত মানবনিয়তির সঙ্গে, সেসব কিছুই আকর্ষণ করে আমাকে সবচেয়ে বড় কথা, সুদূর সৌরলোক, এই চরাচর, মানুষের মুখ, বাঁচার আনন্দ কিংবা যন্ত্রণা, সবসময় বন্দনীয় মনে হয় আমার কাছে। এসবের বন্দনাই কি আমার কবিতা? বলা মুশকিল; কবিতা বড় গূঢ়াশ্রয়ী বড় জটিল। আমি তো জীবনের স্তরে স্তরে প্রবেশ করতে চাই, কুড়িয়ে আনতে চাই পাতালের কালি তার সকল রহস্যময়তা। যে মানুষ টানেলের বাসিন্দা, যে মানুষ দুঃখিত, একাকী সে যেমন আমার সহচর। তেমনি হাটি সে সব মানুষের ভিড়ে, যার ভবিষ্যতের দিকে মুখ রেখে তৈরি করে মিছিল। (ভূমিকা/ শ্রেষ্ঠ কবিতা) ১২

রোমাণ্টিক মানস প্রবণতার অধিকারী কবি শামসুর রাহমান কবিতার সৃষ্টি ও নির্মিতিতে সত্তার গভীরে ডুব দেন। তিনি নাগরিক-চৈতন্য-লালিত কবি। নগরপ্রকৃতি ও নাগরিকচেতনা তাঁর কবিতার একটি মৌল-প্রবণতা। ইংরেজি ও আমেরিকান সাহিত্যে ডব্লিউ.বি. ইয়েটস, টি.এস.এলিয়ট ও এজরা পাউন্ড কিংবা ফরাসী সাহিত্যে বোদলেয়ার, ভের্লেন, মালার্মে, প্রমুখ প্রতীকবাদী কবি শামসুর রাহমানের কাব্যচর্চায় প্রেরণা যোগালেও তিনি সংলগ্ন থেকেছেন স্বদেশের শিকড়ের সাথে

          তিনি যে ঢাকার বর্ণনা দিয়েছেন সেই ভাবনায় বোদলেয়ার বা এলিয়টীয় কল্পনার ছোঁয়া থাকলেও এর মূল ভিত্তি হচ্ছে শান্ত নিস্তরঙ্গ এক মফঃস্বল শহর। কসমোপলিটন প্যারি, লন্ডন এমনকি কলকাতা শহরের সঙ্গেও মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না এর।১৩

শহরের সাথে শামসুর রাহমানের নিবিড় একাত্মতার কারণে তাঁর কবিতায় ঢাকা শহরের শৈশব থেকে পরিণতির পর্যায় পর্যন্ত উপস্থাপিত হয়েছে। মূলত তাঁর কবিতায় বাস্তবে দেখা ঢাকা শহরের যথার্থ রূপ ও নাগরিক জীবনের নানা বৈচিত্র্য কাব্যিক সৌন্দর্যে অঙ্কিত হয়েছে।

তথ্যনির্দেশ:  

১.       হুমায়ুন আজাদ, প্রবচনগুচ্ছ, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃ. ২৭

২.       দীপ্তি ত্রিপাঠী কর্তৃক উদ্বৃত, আধুনিক বাংলা কাব্য পরিচয়, নাভানা, কলকাতা ১৯৫৯, পৃ. ১৩৭

৩.       হুমায়ুন আজাদ (সম্পাদিত), আধুনিক বাঙলা কবিতা, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা- ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪,পূ : ০৯

৪.       সিকদার আমিনুল হক, “শামসুর রাহমানের কবিতা,” পাক্ষিক ‘শৈলী’, (সম্পাদক : কায়সুল হক) ঢাকা, ৩য় বর্ষ ১৭ সংখ্যা, ১৬ অক্টোবর, ১৯৯৭

৫.       T.S. Eliot, ÔThe Waste Land’, The Norton Anthology of English Literature, V-2 6th edition, (editor M.H. Abrams, Norton and Company) London, 1993.

৬.       শামসুর রাহমান, ‘কালের খেয়া,’ দৈনিক সমকাল পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীর উদ্বোধনী সংখ্যা, ১০ জুন ২০০৫

৭.       মাহবুবুল হক, তিনজন আধুনিক কবি, নয়া উদ্যোগ প্রকাশন, কলকাতা, ২০০৫, পৃ. ১০১

৮.       আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ‘স্মৃতির শহরে কবির জাগরণ’ নির্জনতা থেকে জনারণ্যে, (সম্পাদনায় ভূঁইয়া ইকবাল) মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৬, পৃ. ২৭৬

৯.       শামসুর রাহমান, কালের ধুলোয় লেখা, অন্যপ্রকাশ, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, ২০০৪, পৃ: ২২৫

১০.     সিকদার আমিনুল হক, পূর্বোক্ত

১১.      শামসুর রাহমান, স্মৃতির শহর, সাহিত্য বিলাস প্রকাশনী, ঢাকা-ফেব্রুয়ারি ২০০৯, পৃ.১১

১২.     শামসুর রাহমান, ‘ভূমিকা’, শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা, সাহিত্য প্রকাশ, সেপ্টেম্বর ১৯৭৬

১৩.     মাসুদুজ্জামান, বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার কবিতা : তুলনামূলক ধারা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি-১৯৯৩, পৃ. ২৩৮

ফারুক সুমন

কবি ও প্রাবন্ধিক

জন্ম: ১ মার্চ ১৯৮৫। শাহরাস্তি, চাঁদপুর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর (প্রথম শ্রেণি) এবং উচ্চতর এম. ফিল. (২০১৪) ডিগ্রি অর্জন। একাডেমিক কৃতিত্বের জন্য পেয়েছেন ‘নিপ্পন ফাউন্ডেশন অব জাপান’ (২০০৬)  শিক্ষাবৃত্তি। ২০১৯ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘সার্ক সাহিত্য সম্মেলন’ এবং ‘নেপাল আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন’-এ যোগদান করেন। সম্পাদনা  করেছেন (যৌথ) লিটল ম্যাগাজিন ‘অক্ষৌহিণী’। ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ‘পোয়েম ভেইন বাংলা’। লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ‘রউফিয়ান রিদম সাহিত্য সম্মাননা-২০১৬’ ‘উচ্ছ্বাস প্রহর সাহিত্য সম্মাননা-২০১৯’ ‘সমতটের কাগজ লেখক সম্মাননা-২০২০’ এবং ‘চর্যাপদ একাডেমি দোনাগাজী সাহিত্যপদক-২০২১’।

বর্তমানে ‘বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ’ (রাইফেলস কলেজ, বিজিবি সদর, পিলখানা, ঢাকা)- এ বাংলা বিষয়ে অধ্যাপনায় নিয়োজিত আছেন।

প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ:

কাব্যগ্রন্থ: অচঞ্চল জলের ভিতর নিরাকার বসে, আঙুলের ডগায় সূর্যোদয়, বিচঞ্চল বৃষ্টিবিহার; প্রবন্ধগ্রন্থ: শামসুর রাহমানের কবিতা: নগর-চেতনা ও নাগরিক অনুষঙ্গ, শিল্পের করতালিi, শামসুর রাহমানের কাব্যস্বর; ভ্রমণগ্রন্থ: ভ্রমণে অবাক অবগাহন

ফেসবুক

Please Post Your Comments & Reviews

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected!!