পার্ক এবং তিনটে গল্প

আমাদের চৈতি

চৈতি কী পাগলী? ইদানিং দেখি পার্কে পড়ে থাকে। আর অশ্লীল কথা বলে পুরুষ-বিদ্বেষ ছড়ায় ।

রানাকে দেখলে বলে, “কিরে, পিছে পিছে যে ঘুরস, তোর তো নান্টুর জোর নাই!“

ভয়ে ছেলেরা কাছে ভেড়ে না।

বিদূষী-সুন্দরী মেয়েটা দিনে দিনে কালিমাখা হয়ে আসছে।

হয়তো স্নায়ুর স্তরে স্তরে সিজোফ্রেনিয়া বাসা বাঁধে। হয়তো সময়ের কোনো ভুল সুধরাতে চায়। কিংবা ভেসে যেতে চায় গড্ডালিকায়।

আমিই বলেছিলাম, “জীবনে জটিলতা থাকে। তুমি মাস্টার্স পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হও। স্টাডিতে ঢুকে গেলে দেখো, সময় পাল্টে যাবে।“

“সত্যি বলতেছেন? পড়বো যে, আমারতো টাকা নাই। একটা চাকরি দিয়ে দেন না।“

জানি, থিতু  হতে পারবে না। তা সত্বেও একটা পত্রিকায় কাজ জুটিয়ে দিই। পরিপাটি হয়ে কাজেও যায়। কিন্তু কদিন মাত্র। আবারো পার্কে এসে হৈচৈ করে ক্লান্ত হয়ে ভাঙ্গা ভ্যানে ছ্যরৎ-ব্যরৎ হয়ে শুয়ে বিশ্রাম নেয়।  আমি মিটমিট করে হাসি, “কী ব্যাপার চৈতি! অফিসে যাচ্ছো না?“

মেয়েটা অগ্নিশর্মা হয়ে বলে, “বালের চাকরি। সবাই দেখি আকাম করতে চায়!“

পুরুষের কামুকতায় কোনো কোনো মেয়ে আত্মবিশ্বাস হারায়।

অনেকক্ষণ চেচামেচি করে কান্না জুড়ে দেয় চৈতি।

নিজের অজান্তে আমরা কতো যে দুঃখ জড়ো করি! জানতে চাই, “কোথায় থাকো এখন?“

“জানি না। টিঊশনিগুলো ছুটে গেছে। ভার্সিটির হল ছেড়ে দিয়ে এর-ওর বাসায় থাকি!“

“কেন! তোমার বন্ধু সোহেল? যার সঙ্গে দিনরাত চলতে?“

“ওরতো বউ-বাচ্চা আছে, না কি!“

“বলো কী! বউ-বাচ্চা আছে, তুমি আগে জানতে?“

“হ্যা। জীবনের ভুলটাতো এখানে। আমার জীবন ভুলে ভরে গেছে। আমি এখন সর্বহারা।“ মেয়েটা উচ্চকন্ঠে হেসে উঠে বলে, “আপনার যদি বাসা-বাড়ি থাকতো, আমি নিশ্চিন্তে গিয়ে পড়ে থাকতাম।“

জীবন এক বিচিত্র লীলাখেলা। আমি বলি, “তুমি আমাদের মতো হয়ে যাও। ন্যাংটার আবার বাটপারের কী ভয়।“

চৈতির দুচোখ আনন্দে ঝিকিমিকি করে ওঠে। আমাকে জড়িয়ে ধরে ঊল্লাস করে বলে, “তুমি সত্যি একটা আল্লার পাঠানো ফেরেস্তা।“

আমি বলি, “সংস্কার থেকে আমাদের মনে গ্লানি জমে। আর সেই তাড়নায় আমরা পাগল হয়ে যাই।“

চৈতি বলে, “থো তোর ঘর-সংসার।“

“যত্তোসব। দৈহিক খুদার ব্যবস্খা ছাড়া আর কী?“

আমি উৎসাহ দিই, “জীবনটাকে কষ্টের ডিপো না বানিয়ে বরং মুক্ত মানুষ হয়ে যাও।“

“ঠিক কইছেন, ভাই। আমার ছেলেকেও নিয়ে আসবো। মা-পুতে মিলে পার্কে কাগজ টোকাবো।“

“তোমার ছেলে আছে নাকি!“

“ইয়েস। আই এম এ সিঙ্গেল মাদার।“

“ছেলে কোথায় থাকে?“

“গ্রামে। মা-র কাছে রেখে এসেছি।“

“বাপ কে, সোহেল?“

“রুপসা শুধু আমার সন্তান। যিশুর মতন। আদমের পিতৃ-পরিচয় লাগে না। পুরোটাই একটা সামাজিক ধাপ্পাবাজী।

কয় কী ছেড়ি! আমার চোখ বড় হয়ে যায়।

মেয়েটা ছেলেটাকে ভালোপায়

পার্কের সবাই ভাবে, পুনমের সঙ্গে আমার পিরিতের সম্পর্ক। আসলে তা না; শ্রেফ বন্ধুত্ব।

ও রিপনকে ভালোবাসে। কিন্তু রিপন ওকে এড়িয়ে চলে।

প্রেম একপাক্ষিক হলে যে জটিলতা তৈরি হয়, পুনম সেই পাঁকে হাবুডুবু খায়।

হাবু যদি ডুবতেই চায় তাইলে কে কী করবে!

পুনম বদরুন্নেসা কলেজের ছাত্রী। ক্লাস শেষে রিক্সায় চড়ে শাহবাগ পর্যন্ত এসে বাসে উঠে বাসায় যায়।

ও জানে, রিপন ভার্সিটির ছাত্র। পাবলিক লাইব্রেরির সামনের ফুটপাতে পার্টটাইম পুরান বই বেচে।

বন্ধু আমার বইয়ের দোকানদার/ সুইট সুইট বই দেখায়া কাইড়া নিছে মন আমার…।

পুনম তখনও জানে না, রিপন পাড় নেশাখোর। ভার্সিটি থেকে ড্রপ-আউট।

এইযে বইপত্র, এগুলো ভার্সিটির হল থেকে চুরি করে ফুটপাতে বেচে নেশার টাকা জোগায়।

পুনম সেদিন জানতে পারে, যেদিন দেখে, ফুটপাতের বইপত্রের মধ্যে রিপন অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।

ভার্সিটির ছেলেরা বইচুরির দায়ে বেদম মেরে ফেলে রেখে গেছে। আশপাশের কেউ ফিরেও তাকায় না।

পুনম ট্যাক্সি ডেকে ওকে বাসায় নিয়ে গিয়ে খুব সেবা যত্ন করে সুস্থ করে তোলে।

পুনমের মা বলে, “রাতটুকু থেকে যাও। তোমার তো বিশ্রাম দরকার!“

নেশারুদের মনস্তত্ত্ব ভিন্ন হয়। সবকিছু থেকে পালাতে পারলে বাঁচে।

রিপন বলে, “না, আমার কাজ আছ।“

এরপর রিপনকে আর তেমনভাবে পায় না পুনম।

 লুকো-চুরি খেলার মতন পুনম শাহবাগে খোঁজে, রিপন থাকে পার্কে। পুনমকে দেখলে রিপন পালায়।

ও আর দোকান করে না। রাতের নির্জন রাস্তায় ছিনতাই করে। কিংবা পার্কের বেঞ্চে দিনরাত শুয়ে থাকে।

পুনম কাছে গেলে ক্ষেপে যায়, “এই, এই, কে তুই? কী চাস!“

পুনম কাঁদে, “চলো। তোমাকে নাস্তা খাওয়াবো। এই নাও টাকা। সেভ-টেভ হয়ে ভালোভাবে থাকো…।“

রিপন আসহ্য হয়ে উর্ধশ্বাসে ছুটে পালিয়ে যায় পুনমের চোখের আড়াল।

চোখের আড়াল তো মনের আড়াল!

কিন্তু পুনমের দুচোখ থেকে টপটপ করে বেদনার অশ্রু গড়ায়। কেঁদে কেঁদে বিলাপ করে, ‘কেন আমি ওকে এতো ভালবাসি! ওতো পাগল; বদ্ধ পাগল…।‘

কুমারী মেয়ের চোখের জল কার ভালো লাগে!

আমি বলি, “মন খারাপ করো না। রিপন ঠিক হয়ে যাবে। চলো চা খাই।“

পার্কের ছায়াবিথি ঢাকা পথ ধরে আমরা চা দোকানে আসি।

হাটতে হাটতে পুনম আমার কোমর জড়িয়ে ধরে কাঁদে।

পুনম আমার পিরিতের কেউ না। তবু মায়া লাগে ¾আহা, ও যদি আমাকে ভালোবাসতো!

কিন্তু মেয়েটা ওই পোলাডারেই ভালবাসে!

পার্কের হাওয়া বড় মিঠা

‘নেশা সর্বনাশা,‘ এই কথাটা আমার চাকুরীজীবি বন্ধুকে কী করে বোঝাই!

এতো বলি, “পার্কে ভূত-পেত্নি থাকে; তোকে পেলে গিলে খাবে।“

ও বলে, “যা বেটা, আমি কী পোলাপান! চাকুরী করি বইলা স্বাধীনতা নাই!“

“স্বাধীনতা আর অনিয়ম এক জিনিস না, বন্ধু। ল্যান্ড-এডিকশন খারাপ ব্যাপার। পাগল হয়া যাবি।“

কে শোনে কার কথা! আগে আমাকে খুঁজে নিয়ে কয়েক টান গাঁজা খেয়ে বাসায় চলে যেতো। ইদানীং পার্কের ধান্দাবাজদের সঙ্গে ধুমিয়ে আড্ডা দেয়। চুপচাপ কাছে গেলে চমকে ওঠে, “আরে তুই! দেখি না কেন!“

আমি হাসি, “ভর দুপুরে পার্কে! অফিস নাই?“

“অফিসের কাজেই বেরুলাম। এইতো চলে যাচ্ছি।“

ইদানিং দেখি, একটা ধূমসী-মার্কা মেয়ের সঙ্গে খুব গাঁজা খায়। নিষেধ মানে না।

মেয়েটাতো একদিন বলেই ফেলে, “ভাইয়া, এতো যে দাদাগিরি দেখান; আপনি কী ওর গার্জেন!“

“তুমি কে?“

“আমি ওর বন্ধু।“

বন্ধুটি বলে, “ওকে চিনিস না? ওর নাম লালন পরী। দারুণ গান করে।“

পার্কে অনেক মেয়ে নায়িকা/গায়িকা পরিচয় দিয়ে মক্কেল জুটিয়ে নেশা করে। নানান ছুতোয় টাকা খসায়। মনে মনে বলি, ‘বাহ, পেত্নিতে পেয়ে গেছে দেখতেছি! এখন নির্ঘাৎ গোল্লায় যাবে!‘

মাঠের কূহক কখন যে কাকে ধূসর করে ফেলে বোঝা কঠিন।

এক সন্ধ্যায় ফোন পাই, “হ্যালো দাদা, আপনার বন্ধুটি কী পার্কে? “

“না। ওকে তো অনেক দিন দেখি না।“

বন্ধুটির এক ছেলে এক মেয়ে। স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ে। বউটা নিউ-এন্টারপ্রেনার। বুটিকের দোকান করেছে মালিবাগে। এমন ভরা সংসার রেখে বন্ধু আমার পার্কে এসে লালন পরীর সঙ্গে গাঁজা খায়! সরিষায় নির্ঘাৎ ভুত আছে।

বউটা বলে, “আপনার বন্ধুর তো চাকরি থেকে সাস্পেন্ডেড।“

“তাই নাকি! আমাকে তো কিছু জানায় নি!“

“হ্যা, ওতো এখন পার্কেই থাকে। কিছু বল্লে গায়ে হাত তোলে। আমার কী অপরাধ! আপনারা ওকে এভাবে নষ্ট করে ফেললেন…!“

আমি বলি, “কেঁদোনা, প্লিজ। আমি ওকে ফলো করবো।“

নূরুকে গোয়েন্দা লাগাই। খোঁজ-খবর করে নূরু জানায়, চাকুরি হারিয়ে বন্ধু আমার লালন পরীর সঙ্গে একটা গানের দল খুলেছে। দিনের বেলায় নীলক্ষেতের একটা ফ্লাটে গানের রেওয়াজ করে। বন্ধুটি ঐ ঘরের ভাড়া দেয়। সন্ধ্যায় এসে লেকপাড়ে বসে কল্কি ফাটায়।

লেকপাড়ে গিয়ে দেখি, ঘটনা সত্যি। বন্ধু আমার শুকিয়ে হাড়গিলে হয়ে গেছে। কলপ-মারা ভারী গোঁফ রেখেছে। অফিসিয়াল পোশাক-আশাক রেখে জিন্স-ট্রাউজার্স পরা। পায়ে লাল জুতা। লাল জুতো পায়/খোকা বাবু যায়…।

আমি বলি, “কীরে, তোর এই দশা কেন!“

বন্ধু হাসে, “আমিতো চাকরি ছেড়ে দিয়ে লালন পরীর সঙ্গে গান গাই। শুনবি আমাদের গান?“ আমার বন্ধু নেচে নেচে গেয়ে ওঠে: ‘ভব রঙ্গ নাট্যমঞ্চে করতে আইছি অভিনয়/ যার যেমন হয় অভিনয়/ তেমনি তাহার পরিচয়…।‘

যেকোনো মানুষ ভিতরে ভিতরে অনেকটাই পাগল। গাঁজা খেলে পাগলামী বাড়ে। কিন্তু এতটা পাল্টে যেতে কাউকে দেখিনি।

বন্ধু বলে, “লালন পরীকে আমি বিয়ে করবো। তারপর দেশ-বিদেশে গান করে বেড়াবো।“

“তোর বউ-বাচ্চা; ওদের কী হবে?“

বন্ধু হাঁক দিয়ে ওঠে, “থো তোর মধ্যবিত্ত প্যানপ্যানানী। লাইফ ইজ এ বিগ গেম…।“

কয়েকদিন পর দেখি, বন্ধুটি একা একা ঘুরে বেড়ায়। পরনে মলিন পোশাক। ভারী গোঁফের কলপ উঠে গিয়ে সাদা গ্যাজা বেরিয়ে গেছে। লাল জুতোয় কাদা মাখা। সন্ধ্যায় সর্বহারাদের সঙ্গে কল্কি ফাটায়।

আমি জানতে চাই, “কিরে, এদের সঙ্গে কেন! তোর লালন পরী কই?“

বন্ধু চুপ, মুখ ঘুরিয়ে রাখে।

“বাসায় যাস না ক্যান?“

“কোন মুখে যাবো। আমি যে সর্বহারা।“

স্থানীয় উপকথায় আছে, মনসার পাল্লায় পড়ে শিব একসময় পার্বতীকে ভুলে শ্মশানের ছাইভষ্মে পড়ে থাকে আর গাঁজা খায়। মধ্যবিত্তের সর্বহারা রূপ দেখছি আরো করুণ।

ফুটপাতের ভাতওয়ালীদের খাবার খাইয়ে রাতে আমার সঙ্গে ঘুম পাড়িয়ে রাখি। ভোরে ওর বউ-বাচ্চারা আসে। নতুন আলোয় বিপুল সবুজের মাঝে শিশুদের মুখ দেখে বন্ধুর দুচোখে জল গড়ায়।

স্ত্রীটি বলে, “হইছে তো তোমার স্বাধীনতা উপভোগ! এইবার চলো।“

যেতে যেতে বন্ধুটি পিছু ফিরে তাকায়।

“সর্বহারারা বলে, ফাঁকে ফাঁকে আইসেন, স্যার। মোহিনী গাঁঞ্জার মিঠা কল্কিতে টান দিয়া যাইয়েন।“

মনির জামান

কথাসাহিত্যিক

জন্ম ১৯৬৬

পৈত্রিক নিবাস পিরোজপুর জেলার জোলাগাতি গ্রামে।

১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ। প্রবন্ধ-নিবন্ধেও সমান বিচরণ। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২০এর অধিক।

Please Post Your Comments & Reviews

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected!!