পারানির কড়ি

ওদের ছোট্ট আঙিনায়, পুরনো শাখা প্রশাখা ছড়ানো জাতনিম গাছটার তলায় সবাই গোল হয়ে বসেছে, বরাবর যেমন বসে। ঠাদ্দা, ঠাম্মা আর বিশু ঘরে বসে আছে। আগে ঠাদ্দাকেও ঐ আসরে নিয়ে যাওয়া হতো। একই ঘটনার পুনঃপুনঃ আয়োজনে আজকাল সকলেই শ্রান্ত। কে আর এই অন্ধ মানুষটাকে নিয়ে টানাটানি করবে! তাছাড়া সেও আর চায় না। বরং যতক্ষণ পরীক্ষা চলে সে ব্যাকুল হয়ে ঠাকুর দেবতার নাম জপ করতে থাকে। বিশুর ঠাম্মা গুনগুনিয়ে কাঁদতে থাকে। বিশু একটু পর পর মায়ের আগের কালের শাড়ি কেটে বানানো জানালার পর্দা তুলে উঁকি দেয়। ওর বুকের ভেতর এক কষ্টপাখির অস্থির ডানা ঝাপটানো ওকে সুস্থির হতে দেয় না। ও আবার ঠাদ্দার কোলের ভেতরে সেঁধিয়ে যায়, যতটা সেঁধানো যায়। ঠাদ্দা নাতিকে অশক্ত হাতে পেঁচিয়ে ধরে কানে কানে ফিসফিস করে বলে- ভাই ঠাকুরক ডাকাও মনে মনে…এই এক কথা বিশু ক্লাস টু থেকে শুনতে শুনতে এখন ক্লাস নাইনে পড়ে। কই, কোন ঠাকুরের দয়ায় ওর দিদির তো কোন গতিই হয় না। দুর্গা মায়ের মতো দেখতে ওর দিদির জন্য কোন দেবতাই কিছু করেন না। কেউ তাকে একটু সম্মান দিয়ে ‘ঘরের বউ’ করে নিয়ে যায় না।
আজ যারা এসেছিল তারা পরে তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে বলে মাথা বুক ফুলিয়ে চলে যায়।
পাকা আমন ধানের গন্ধে ভরা মনোরম বিকেল। আলোছায়ার খেলা ওদের বাড়ির চারপাশ ঘিরে। পেছনের বাদুরি বাঁশঝাড়ের পাতায় পাতায় আদুরী বাতাসের কানাকানি। এত ঘন গহন বাঁশঝাড় সূর্যও যেখানে ঠিকঠাক আলো ফেলতে পারে না। রাত তো দূরের কথা দিনেও কেউ এখানে ঢোকার কথা ভাবে না। সেখানে হাজার রকমের উদ্ভিদ গুল্ম, আগাছা, বুনোফুল, অচেনা লতা সাপের মত পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠে গেছে বাঁশের আগা পর্যন্ত। এখানে বিশাল একটি প্রাচীন বটগাছ আছে। মাঝে মাঝে লাল লাল বটফল সারা গাছ জুড়ে লাল রঙা ফুলের মত থোকা থোকা ফুটে থাকে। তা খাওয়ার জন্য শতশত পাখি জুটে যায়। আর আছে অসংখ্য বাদুর, এজন্যই নাম বাদুরী বাঁশঝাড়।
তারা চলে যাবার পরে, বিশুর নির্লিপ্ত দিদি সন্ধ্যার কাজগুলি গুছিয়ে রেখে বাড়ির পেছনের সিঁদুরে আম গাছটার তলায় একটা বাঁশের বাতার আটাল আছে সেখানে গিয়ে পা ঝুলিয়ে বসে। ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়িয়ে মা উনুন ধরিয়ে, ভাত বসায়। বাবা মাকে কি একটা বলে বাইরে চলে যায়। তুলসীতলার প্রদীপটা নিভুনিভু হলেও নেভে না, একটা অনির্বাণ জীবনী শক্তি নিয়ে জ্বলতে থাকে। ঠাদ্দা, ঠাম্মা সন্ধ্যা সেরে নিজেদের মধ্যে বিড়বিড় করে, আবার কখনও উত্তপ্ত বাক্যালাপও করে। কথার সাথে সাথে তাঁদের মুখের চামড়ার অসংখ্য জ্যামিতিক রেখা কিলবিল করে। গলার নিচের কন্ঠার হাড় দুখানা ভয়াবহ দেখা যায়। তাঁরা মাঝে মাঝে পুরনো দিনের গল্প করে নিজেদের মধ্যে। চড়ক পূজা, দুর্গা পূজা, যাত্রাপালা কত খণ্ড খণ্ড বিগত স্মৃতি তাঁদের। দাঁতহীন ফোকলা উচ্চারণ অন্য কেউ না বুঝলেও তাঁরা নিজেরা ঠিক বোঝে। আর বোঝে বিশু। সে আবার মাঝে মাঝে ফোঁড়ন কাটে। তাতে দুজনের কেউ একজন খুব তেতে উঠলে বিশুই আবার হাসতে হাসতে আদর টাদর করে সামাল দেয়। সংসারের ঘাত প্রতিঘাতে জর্জরিত যেন দুটি ধ্বংসস্তূপ।
এর মধ্যে মালতি আমতলায় এসে দিদিকে মুখ ঝামটা দেয়-
-তোক না বাদা কচ্চু, ঐ শকুন গুলার সামনত হাট বাজারের কদু হয়া আর যাইস না। তাও যাইস ক্যান! তোর হায়া নাই! শরম নাই! এতোই বিয়ার হাউস! তা বিয়া কল্লে নেজে নেজে করির পাইস না! চেংড়ার তো অভাব নাই। একটাক ধরি বিয়া কল্লেই এইগলা যন্তনা থাকি মুক্তি মেলে।
মা উনুনের কাছ থেকে, উনুনের আগুনের চেয়েও তপ্ত কন্ঠে মালতির নাম ধরে হিসহিসিয়ে উঠলে সে দুমদাম পা ফেলে ঘরে যায়। তখন হিন্দি সিরিয়ালের সিংহনাদে হুমহুম করে দশদিক।
বিশু ধীর পায়ে দিদির কাছে যায়। এরকম পরীক্ষার দিনগুলোতে প্রতিবার দিদির কাছে যেতে ওর নিজ পা দুটিকে বাধ্য করতে হয়। নিঃশব্দে আটালের এক কোণে বসে পড়ে। মনোরম বিকেলের নীল রঙের তোলা শাড়িটা খুলে দিদি নিত্য দিনের রংজলা ছাপা শাড়িটা পরেছে। চুল বিনুনি করাই আছে। সাপের মতো মোটা বিনুনি এঁকেবেঁকে পিঠময় পড়ে আছে। বিশুর সকল ভয়, দ্বিধা, সংকোচ উড়িয়ে দিয়ে দিদিই কথা বলে-
-কিরে বিশু, পড়বার বসলি না? কাল না স্কুল আছে!
-হু। হঠাত দিদি জিজ্ঞেশ করে-
-তোর কি ভোক নাগচে?
-নাহ! খাইলাম তো। এমন দিনগুলোতে বিশুর মা সেমাই বা নুডলস রান্না করে, ওর বাবা বাজারের সোলতান কাকার দোকান থেকে পুরি, সিঙ্গাড়া নিয়ে আসে। অতিথিরা খেয়ে দেয়ে কিছু বাকি থাকলে ওরা ভাগ করে খায়। মানে ওরা তিনজন। মা, বাবা মুখে দেয়না, দিদির তো প্রশ্নই ওঠেনা। আর ছোড়দি তো খাবেই না। ঠাদ্দা, ঠাম্মা আর বিশু সবটুকু মুছেপুছে খেয়ে অনেকটা অতৃপ্তি নিয়ে চুপ করে থাকে, নিকষ অন্ধকার ভর্তি কুঁড়েটার মধ্যে। পুরির সাথে দেয়া শসা মরিচের ক্ষুদ্র টুকরাটাও শেষ হবার পর ঠাদ্দার শিরা ওঠা কম্পমান আঙুলগুলো প্লেটের চারপাশে ঘুরতে থাকে আস্ত সিঙ্গাড়া না হোক গুঁড়োগাড়া অবশিষ্ট কিছু যদি থাকে! আঙুলের মাথায় লাগিয়ে সেটাই জিভে ছোঁয়ায়। এমন দিন ছাড়া সন্ধ্যা বা বিকেলে কোন খাবারের চল এদের বাড়িতে নেই। এরা একবারে পেটপুরে রাতের ভাত খেয়ে দেয়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে।
বাড়িতে কারেন্টের লাইন আছে । একটা ৬০ পাওয়ারের ন্যাংটা হলুদ বাল্ব জ্বলে। বাবা সেটা নিপুণভাবে তদারকি করে অহেতুক জ্বলে কিনা। ছেলেমেয়েরা রাত জেগে পড়লে বাবা কিছু বলে না। মাস শেষে পল্লী বিদ্যুতের বিল আসলে বাবার মুখ শুকিয়ে যায়। ঠিক যেমন মাঝে মাঝেই তোলা নীল শাড়িটা পরলে বিশুর দিদির মুখটা শুকিয়ে আমসি হয় তেমন। মুখ শুকনো করলেও ওর দিদিকে নীল শাড়িতে পুজার সময় নগেন কাকার বাড়িতে যে দুর্গামূর্তি বানায় তার মতো দেখতে লাগে। দিদির গায়ের রঙ অত সাদা না কিন্তু নাক চোক মুখ এক্কেরে দেবীর মতো। আর তার কথা! চলন বলন! ব্যবহার! ধরলা নদীর ঠাণ্ডা জলে ডুব দেবার মত শীতল, মনজুড়ানো।
বড়দির পরে ওর মালতি দি। সেও দেবীর মতো দেখতে কিন্তু সে ঝড় বাতাসের মতো উড়াধুরা। আর লাল মরিচের মতো ঝাঁঝালো। ভাত খেতে বসে মায়ের সাথে নিত্য ঝগড়া কাজিয়া বাধায়-
-তোমার এই আড়াবাড়ির ঢেঁকিয়াশাক, কচুরপাত, আর এই গাছের নিমপাতা কি শ্যাষ হয়না! ভগবানের দুনিয়ায় আলু বাইগোনের নাবড়া আর জঙ্গলের পাতাপুতা ছাড়া আর কিচু নাই! পোত্যেকদিন ওই এক জিনিস! আর সাতে আচে নিমপাতা ভাজি নাহয় নিমপাতার গুড়া ভত্তা, এই রাজভোগ ছাড়া কি আর কিচ্চচুই নাই! তুমি বসি বসি এইগুলা গেলো। এই বলে ভাতের থালায় জল ঢেলে পা দাপিয়ে উঠে চলে যায়। কোন কোন দিন মা পিছে পিছে গিয়ে পিঠে ধুমধুম বসিয়ে দেয় মুখ বুজে। মা এমনিতেও কম কথা বলে এসব ব্যাপারে আরো গুম হয়ে থাকে।
বিশুরা সব ভাইবোন পাটগ্রামের সরকারি স্কুলে ফ্রি পড়ত। এটি বর্ডার এলাকা। এখানে প্রায় মানুষই চোরাচালানের সাথে জড়িত। বিশুর বাবার ছোট্ট একটি মনোহারী দোকান আছে। সেটার উপর ভর করে এই সাতজন মানুষের সংসার না চলার মত করে চলে। বড়দি অনেকগুলো টিউশনি করত। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সে খুব যত্ন নিয়ে পড়াত। গ্রামের মানুষ কখনও টাকা দিত কখনও খেতের লাউ কুমড়া বা হাসমুরগির ডিম হাতে ধরিয়ে দিত। এসব করে সে নিজের কিছু খরচ নিজেই চালাত। আবার মাঝে মাঝে ওর মার হাতেও কিছু দিত। বিশু বা ছোড়দিও আবদার করলে কখনও কখনও কিছু জুটে যেত।
বড়দি ছোড়দি পিঠাপিঠি হলেও বিশু অনেক ছোট। ওরা তিন ভাইবোন একসাথে স্কুলে যেত, ওর আগে ছুটি হলেও মাঝেমধ্যে দিদিদের জন্য অপেক্ষা করত। মাঝে মাঝে আবার বন্ধুদের সাথে নদীতে ঝাঁপাতে চলে যেত। নদীতে গেলে মা রাগ করে। কিন্তু বন্ধুরা বললে না করতে পারে না। তাছাড়া সাঁতার কাটতে বিশুর খুব ভালো লাগে। ধরলানদী পাটগ্রাম থেকে ভারতের গিতালদহ গিয়ে আবার মোগলহাট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। এটি ধরলার একটি মরা শাখা। জল খুব মিঠা আর শীতল। ঠিক বড়দির মত।
বড়দি ওকে খুব আদর করে। কিন্তু ছোড়দির সাথে ঝগড়াঝাঁটি, খুনসুটি লেগেই থাকে।
ছোড়দি একদিন স্কুল থেকে ফিরে মাকে নরম সুরে ডাক দেয়। যেটা ওর সাথে ঠিক যায় না।
-মা-আ-আ, অমাআআ-
-কি, কও। একটু গা মোচড়ামুচড়ি করার পর সে হাতের প্যাকেট খুলে দেখায়। জড়ি বুটির কাজকরা খুব সুন্দর একটা থ্রিপিস।
-মা, মুই এইটা নেইম মা। হামার ক্লাসের মজিদা এইগুলা বেচা বিক্রি করে। অর দাদা বডার থাকি আনে।
মা তাকিয়ে থাকে। আসলেই এত সোন্দর!
-দাম কত?
-মা, এটা খুবি সুন্দর কাজ করা মা…
-আরে দাম কত? তা দাম একনা বেশী, তাও তো মজিদা কম দামে দেবে কইচে।
-তা সেই কমটা কত! কইসনা ক্যান! কাম আচে ম্যালা।
-সাড়ে তিন হাজার মা। মায়ের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়। এতবড় ধিঙ্গি চেংড়ি বাবা মায়ের অবস্থা কি কিচুই বোঝে না! বাকি দুইটা যতটাই বুঝদার এটা ঠিক ততটাই অবুঝ। মা, গম্ভীর কন্ঠে বলে-
-জামা গোছে প্যাকেটত ঢুকি থো। কাইল ইশকুল নিয়া যায়া ঘোরত দিবু।
-মা… হইচে চুপ! আর একটা কতাও কইস না।
-না, আর কতা কইম ক্যানে! মালতি ভেংচে ওঠে। মানুষের কি কোনো হাউস, আহ্লাদ থাকেনা? একটাও ভালো জামা পিরান নাই। দিবারে যদি না পাও তা জন্ম দিচিলা ক্যান? তোমার এটা বালের সংসার। খালি নাই! নাই! খালি অভাব! আর অভাব! এ সংসারত মুই না থাকো, ঝাঁটা মারি চলি যাইম…চিৎকার চেঁচামেচি করে একেবারে বাড়ি মাথায় নিয়ে দাপাতে থাকে। বড়দি এসে বলে
-আচ্ছা, অমন একটা জামা বানায় মুই হাতত কাজ করি দেইম। থাউক আর কান্দিস না, শান্ত হ। তখনকার মত ছোড়দি চিৎকার থামায়।

হাহা করা করা আগুনগরম নিদাঘ সময়।
বিশুর দিদির যেদিন এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিল, ওই দিন রেজাল্ট নিয়ে স্কুল থেকে ফেরার পথে মেম্বারের ছেলে আর তার বন্ধুরা বাইক নিয়ে দিনদুপুরে দিদিকে তুলে নিয়ে গেল। হতভম্ভ বিশু কিছু বুঝতে পারেনি, কিন্তু ভয়ে ওর নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। বাতাসের আগে ছুটে বাড়িতে খবর দিলে, বাড়িতে মরাবাড়ির মতো কান্নার রোল উঠেছিল। বাবা খবর পেয়ে ছুটে মেম্বার কাকার কাছে গিয়েছিল, গ্রামের ময় মুরব্বির কাছে গিয়েছিল। কিন্তু সে মূহূর্তে ওর দিদির জন্য কেউ একটা কথা বলেনি। গ্রামের সব মুরব্বি মানুষের পায়ে ধরে ডুকরে কেঁদেও কিছু হয়নি। কারণ মেম্বার কাকার ছেলের দল প্রায়ই কাউকে তুলে নিয়ে যায়, বা যা খুশি তাই করে। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় ওরা নির্ভয়ে এসব কাজ চালিয়ে যায়। ওদের বিপক্ষে যাবার কথা গ্রামের মানুষ ভাবতেও পারে না।

দুদিন বাদে, সন্ধ্যা মেলাবার পরে সোলতান কাকা এসে গলা নামিয়ে বাবাকে বলেছিল–শোন, বেশি হাঙ্গামা কইরো না। তুমি চেয়ারম্যানের কাছে ফের যাও। তাকে অনুরোধ কর, তবে সব গোপনে কর। মেয়েটার নামে এসব রটলে সব্বোনাস হয়া যাইবে, মেয়েটার জেবন শ্যাষ হয়া যাইবে। অরে তো বিয়াশাদি দিতে হইবে…
এমন সময় বাড়ির পেছনে একটা গোঙানি শুনে সকলেই হুড়মুড়িয়ে গেলে দেখা যায় দিদি পড়ে আছে। সবুজ স্কুল ড্রেসের বেশিটাই ছিল রক্তের কালচে লাল দাগ আর ছেড়া, পরনে কোন পাজামা ছিলনা। দুপা রক্তে রঞ্জিত। বাবা মা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠলে, কাকা বলে চুপ! চুপ! আগে বেটিরে ঘরে নিয়া যাও।

(২)
স্রোতের শ্যাওলার মতো দিন মাস বছর গেলেও বিশুর দিদির ঘটনার কোন বিচার হয় না। কেউ কানেই তোলেনা ওদের কথা, আর বিচার! স্কুলে, বাবার দোকানের পাশে সোলতান কাকার চা শিঙাড়ার দোকানের কথাবার্তা থেকে বিশু জানতে পারে ওরা সংখ্যালঘু। কিন্তু ও ঠিক বুঝতে পারেনা। এইটা জানে যে মেম্বার কাকা, সোলতান কাকা, এলাকার বেশীরভাগ মানুষই মোছলমান আর ওরা হিন্দু। অল্প ক’ঘর হিন্দু, কিন্তু সংখ্যালঘু মানে বোঝেনা। আবার ভয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করে না। কোনো অপরাধ হয়ে যায় যদি!
সবকিছু থিতিয়ে যাবার অনেক পরেও বাবা কত শত চেষ্টা করেও দিদির একটা বিয়ে দিতে পারে না। আসলে তলে তলে হয়ত সবাই সব জানে। ছয়/সাত বছরেও কি ওসব কথা তলিয়ে যায় না!
এরই মাঝে ছোড়দি গঞ্জের ডিসলাইনের একটা ছেলের সাথে কোথায় চলে গেল কেউ জানেনা। তবে তার বইয়ের ফাঁকে একটা ছোট্ট চিঠি পাওয়া গেল, কাউকে সম্বোধন না করে লিখেছে-
“তোমরা আমাকে খোঁজাখুঁজি কর না। তোমাদের এই অভাবী আর গরিবী হালচাল আমার একদম ভাল্লাগে না”।
হাতের লেখা ছোড়দির মতই উজ্জ্বল আর মুগ্ধকর। বাবা একটি কথাও না বলে দড়িতে ঝোলানো গামছাখানা টেনে নিয়ে নদীতে গেল ডুব দিতে। মা ঘরে বসে খুব কাঁদল। সে কান্না এত নিঃশব্দে যে বিশুর বুকের ভেতরটা ফেটে যেতে চাইল। ছোড়দিটা চিরকাল অবুঝই থেকে গেল। ঠাদ্দা আর ঠাম্মা কিছু বুঝল কি বুঝল না ঠিক বোঝা গেল না। তবে মাঝে মধ্যেই গলা নিচু করে ডাক দিতো
-মালতি! অ মালতি! ফুল আনছিস! হামার পুজার ফুল!
ছোড়দি স্কুলের বাগান থেকে তাদের পূজার ফুল এনে দিত। সে ফুল আবার স্কুলের ছেলেরা দি’কে তুলে দিত। ছোড়দিকে কিছু দেবার জন্য সব ছেলেদের মধ্যে একটা প্রবল আগ্রহ কাজ করত।
দি’র লেখা ছোট্ট চিরকুট হাতে নিয়ে বিশু পেছনের আটালে গিয়ে বসে। মনে মনে খুব ছোড়দিকে ডাকে। তুই কি করে আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলি দি! তুই এটা পারলি! ঠাদ্দা, ঠাম্মা, বাবা, মা, বড়দি কারো মুখ তোকে আটকাতে পারল না! এই যে এই বাড়ি, আঙিনা, নিমগাছ, তুলসিতলা কেউ না! কিচ্ছু না!
তুই কী পাষাণ দি! বাড়ির বিড়ালটাকে যখন বস্তায় ভরে নদীর পাড়ে ছেড়ে আসা হইছিল, দুদিন বাদে সেও এসে হাজির হইছিল। তোর মনে আছে দি!
বাবার মান সম্মানের দিকটাও দেখলি না! বিশুর অশ্রু নিরবে গড়িয়ে যেতে থাকে।

ছোড়দি চলে যাওয়াতে চারিদিকে একেবারে ঢি ঢি পড়ে গেল। সবার মুখে এক কথা “শালা মালাউনের বেটিগুলা এক একটা নটি বেশ্যা। এই মালগুলার আচ্ছামত রস নিংড়ায়ে, আগুনে পুড়ি মারা দরকার। মাগীগুলার চুলকানী বেশী”
চারপাশে অনেক কথা শোনা যেতে লাগলো।
ওদেরকে নাকি গ্রাম ছাড়া করবে।
বড়দিকে নাকি আবার তুলে নিয়ে যাবে। আবার শোনা যায়,
ওদেরকে দেশছাড়া করবে।
বাবা কেবল চুপচাপ শুনে যায়। দিনদিন তার শরীর ভেঙ্গে আসতে লাগল। বড়দির ঘটনার পর থেকেই বাবা কিছুটা নির্বাক হয়ে গিয়েছিল। এখন কথা প্রায় বলেই না। রাতে ঘুমায়ও না।

আজকাল, ওর বাবা মা ফিসফিস করে কি যেন বলাবলি করে। ওপারে নাকি বাবার সম্পর্কে জ্ঞাতি ভাই আছে। তাদের সাথে বড়দির বিয়ে নিয়ে কথা বলেছে। তারা বাবাকে আশ্বাস দিয়েছে, ওপারে গেলে মেয়ের বিয়ে হবে।
কখনও কখনও কারা যেন আসে, তাদের সাথে কি সব শলা পরামর্শ করে। সোলতান কাকা আসে হিসেব নিকেশ করে। বিশুকে কেউ কিছু বলেনা। কিন্তু ও বুঝতে পারে কী যেন একটা ঘনিয়ে আসছে। বাবা আজকাল ঠাদ্দা আর ঠাম্মার দিকে বেশি খেয়াল দেয়। হাটে যাবার আগে জিজ্ঞেশ করে- কিছু খাইতে চায় কিনা। এর মাঝেই শীতকালে তোলপাড় করা এক ঘটনা ঘটে। বর্ডার এলাকায় প্রায় সময়ই অবশ্য এমন ঘটে থাকে। এ ঘটনা একেবারে সকল ঘটনাকে ছাপিয়ে গেল। পাটগ্রামে নয়, কুড়িগ্রামের অনন্তপুর দিনহাটা সীমান্তে বিএসএফ এর সদস্যরা ফেলানী নামের ছোট একটি মেয়েকে গুলি করে হত্যা করে। ফেলানীর লাশ পাঁচ ঘন্টা ধরে কাঁটাতারে ঝুলে ছিল। আসলে গরীবদের জীবনের মূল্য গরু ছাগলের জীবনের চেয়েও কম, অনেক কম।

(৩)
বর্ষাকালের অন্ধকার রাত। আকাশের রঙ ঘোর কালো। বাতাসের সাথে বৃষ্টির ঝাপটা এবং ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ আসছে। বাবা বিশুকে ডেকে তোলে।
-বিশু উট! উট! পিরানটা গায়ে দে। ও দুহাতে চোখ কচলায় তাকিয়ে দেখে বড় বড় পোটলা, মায়ের সেই পুরনো ট্রাংক, মলিন ব্যাগ সব প্রস্তুত। সোলতান কাকা এসেছে, হাতে তসবি, বাবার সাথে কথা বলছে। ভরসা দিচ্ছে, তুমি কোন চিন্তা কইরো না, যদ্দিন কাকা কাকী বাঁচি থাকপে আমি দেখাশুনা করব। হঠাত বাবা, কাকার হাত ধরে শব্দ না করে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
-আমি পাতক হইনো সোলতান ভাই, পাতক হইনো। কিন্তু তুমি কও আমি কি করমো? এটে তো মাটি কামড়েও থাকির পাইল্লাম না। থাকা সম্ভব হইল না। নিজেদের কোন ঠিকঠিকানা নাই আর এই অন্ধ ল্যাংড়া মানুষদের আমি কই নিয়া যামো? ক্যামনে নিয়া যামো? নরকেও আমার ঠাই হবে না সোলতান ভাই! বাবা হুহু করে কেঁদে ওঠে এমন সময় তালগাছের মাথায় কড় কড় কড়াত করে বাজ পড়ল।

উঁচু লুঙ্গির নিচে কাকার খাটো খাটো পা হাঁটাহাঁটি করছে। কাকা বলছে-
-তুমি অত চিন্তা কইরো নাতো দাদা। আমি তো আছি। তোমার বাপ মা কি আমার পর। তুমি যাও, পৌঁছে একটা খবর দিও। এই তো বডারটা পার হইলেই ওপারে তুমি থাকবা। মাজে মইদ্যে চুপিচাপি আসি দেকি যাইও।

যা বোঝা গেল, ওদের বাড়িভিটা সোলতান কাকা কিনে নিয়েছে। যা দাম নির্ধারিত হয়েছে তার অর্ধেক কাকা বিশুর বাবার হাতে দিয়েছে আর বাকিটা দিয়ে ওর ঠাদ্দা ঠাম্মার অন্ন সংস্থান করা হবে। এছাড়া গাছগাছালি, হাঁস মুরগি সবই তো রইলো।
বিশুর কাছে সব পরিস্কার হয়ে যায়, সব বুঝতে পারে। ওরা সবাই বর্ডার পার হয়ে ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছে। রাতের অন্ধকারে, গোপনে। কিছুটা ভ্যানে গিয়ে এরপর পায়ে হেঁটে। ঠাদ্দা, ঠাম্মাকে সঙ্গে নেয়া যাবেনা। নেয়া সম্ভব না, কারন একজন অন্ধ, একজন খোঁড়া। বিশুর বুকের ভেতর তুফান বইতে লাগল। এ কি করে সম্ভব! একজন ঠিকঠাক হাঁটতে পারে না, একজন চোখে দেখতে পায় না বলে তাদের রেখে সবাই চলে যাবে! তাঁরা ওদেরকে ছাড়া একদণ্ড বাঁচবে! বাবা কেন এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিল সে জানে না, কিংবা জানে। কিন্তু-কিন্তু-

মালামাল তোলা হয়ে গেছে। বাবার সাথে সোলতান কাকাও হাত লাগিয়েছে। ভ্যানে আর তেমন জায়গা নেই। তার মধ্যেই একোণায় ওকোণায় পা ঝুলিয়ে সবাই উঠে বসেছে। বাবা একবার তাগাদা দিল,
-কই! বিশু, তুই তোর মার গোরত বইস।
চারপাশে ঘাপটি মেরে আছে থোক থোক ঘন অন্ধকার। সামান্য কিছু আলো যেন অন্ধকারকে আরো নিকষ করে তুলেছে। রাতের পাখিরা ডানা ঝাঁপটায়ে উড়ে গেল। বাঁশঝাড়ের শেয়াল ডেকে উঠল। ঝিঁঝিঁ ডাকছে। বাড়িতে যে বেড়াল আর কুকুরটা ঘুরত, সবার দূরছাই, লাথিঝাঁটা খেয়েও কোথাও যেত না, তারা এসে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। আকাশের এক মাথা থেকে আরেক মাথা বিদ্যুৎ ফালা ফালা করছে।

কাল ভোরে পুবের অন্ধকার সরিয়ে আবার সূর্য উঠবে। সূর্যের প্রথম আলো নিয়ে বাঁশঝাড় মাথা দোলাবে, ঝরা নিমপাতায় আঙিনা ভরে যাবে, হাঁসমুরগি, পাখপাখালি ডাকবে সেইসাথে অচল দুজন মানুষ ডাকতে থাকবে ভাই! ভাই! অ বিশু! হাতটা ধর ভাই কলতলায় যামো…পেচ্ছাব করমো…

লহমায় বিশুর মন এক বিচিত্র অনুভূতিতে ভরে গেল। দুঃখ নয়, শোক নয়, বিরহ নয়, সেটা যে কি সে জানে না। কেবল জানে নিজের ভিটামাটি ছেড়ে, ঠাদ্দা ঠাম্মাকে রেখে বিশু যাবে না। এক পা কোত্থাও যাবে না। বাবা কি যেন বলতে লাগল, সোলতান কাকাও মুখ খুলল, আকাশ ভেঙে জলের তোড় বাড়তে লাগল… সে অন্ধকার বাঁশঝাড়ের দিকে লম্বা পা ফেলে সাঁই সাঁই করে দৌড়াতে লাগল।

কাজী লাবণ্য

উত্তরবঙ্গের জেলা শহর রংপুরে জন্ম। ঢাকায় বসবাস। লিখছেন কবিতা ও গল্প।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ:
নাকছাবি, জোনাক বনে জ্যোৎস্না,
যযাতি কন্যা, একজন মায়াবৃক্ষ।

কাব্যগ্রন্থ: রাংগা গোধূলি, রুপালি জ্যোৎস্না।

Please Post Your Comments & Reviews

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected!!