স্বজন

খালি ভ্যানটা বটগাছের তলায় রেখে, দ্রুত লুঙি ছেড়ে গামছা পরে নিল কানু। চানটা আগে সেরেই ফেলা যাক। তারপর ভ্যান জমা দিতে যাওয়া যাবে। ও বাড়িতেই চান করে। কিন্তু আজ পরিস্থিতি অন্যরকম। খুব গরম লাগছে। বটতলার এই পুকুরের টলটলে জল দেখে গরমটা আরো বেশীই লাগতে শুরু করেছে।

সেই সকাল থেকে আজ কাজে লেগেছে কানু। তার আগে বুড়োর দোকান থেকে এক পিস পাউরুটি মালাই মেরে খেয়ে নিয়েছিল। সাথে এক ভাঁড় চা। সে খাবার কোথায় চলে গেছে এতক্ষণে। এখন পেট চুইচুই করছে ক্ষিদেয়। কিন্তু সবার আগে শরীর ঠাণ্ডা হওয়া দরকার।
প্রচুর খাটুনি হয়েছে। কলাবাগানে গিয়ে গোটা পঞ্চাশেক মোচা তুলেছে। আর তুলেছে কাঁচালঙ্কা এবং পুইডাঁটা। বাড়িতে সব রেখে এসেছে। দুপুরবেলা খেয়ে একটু ঘুমিয়ে নেবে। তারপর ট্রেন ধরে সোজা দমদম। নাগেরবাজারে মাল বেচে রাত ন’টা কুড়ির ফিরতি ট্রেন৷ মদনপুর স্টেশনে ছোনে ভ্যান নিয়ে অপেক্ষা করে। তারপর ওর ভ্যানে বাড়ি ফেরা। বাড়ি ঢোকার আগে একটু চা বিড়ি খেয়ে নেয় ছোনের সাথে। একটু গল্পগাছা হয়। বাড়ি ফিরে চান সেরে,ভাত খেয়ে সোজা ঘুম। এক ঘুমে সকাল।

আজ গরম বেশি লাগার কারণও আছে। ওর সাথে সকালের এই কাজে লালু আর ছোনে থাকে। এরা কানুর শাকরেদ। কানুর ফাইফরমাশ খাটে। আবার অন্য জায়গায় মজুরের কাজ টাজও করে। যখন যে রকম জোটে। ছোনে কানুর কাছ থেকে একটু বেশি পয়সা পায়। কারণ ভ্যানটা তার। কানু ত্রিশ টাকা জমা দেয় ছোনেকে। প্রতিদিন। ভ্যানের জন্য৷ এ ছাড়া সত্তর-আশি টাকা করে দুজনে কামায় কানুর কাছে৷ সবদিন অবশ্য কাজ থাকে না৷ যেদিন খুব কাজ থাকে, সেদিন দুইজনকে ডেকে নেয় কানু। না হলে ও একাই একশো। সাথে থাকে ছোনের ভ্যান। সকালটা কানুই ভাড়া নিয়ে নেয়।
আজ কিন্তু ওরা তিনজনই কাজের ফাঁকে গাঁজা টেনেছে। কানুর খুব একটা অভ্যাস নেই। ওই কখনো সখনো…পাল্লায় পড়ে। পাল্লা মানে ছোনে। ও ব্যাটা খায়। আর লালু পাকা সেয়ানা। যাই নেশা করুক, অন্যের পয়সায়৷
আজ যেমন হয়েছে।

আসলে কাল ফেরার সময় পলানদা এক পুরিয়া গাঁজা দিয়েছিল কানুকে। বলেছিল দারুন নাকি। নেপাল থেকে আনানো। পলানদার বড় ব্যবসা। ফলের কারবারি। শিলিগুড়ি থেকে নিয়ে এসে মাল ফেলে দমদম বাজারে। কানুদের মত ছুটছাট পাবলিক নয়। বড় ব্যবসায়ী।
তো কানুকে ভালবেসেই গাঁজা খেতে দিয়েছিল পলান সরকার৷ জানতেও চায়নি কানু আদৌ গাঁজা খায় কিনা৷ কানুও না করে নি। লালু আর ছোনের মুখটা ওর চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল।
সেই গাঁজাই খাওয়া হয়েছিল। অল্পই খেয়েছে সে, কিন্তু নেশা জব্বর হয়েছে। তাই গরম লাগছেও বেশি। গাঁজার নেশায় শরীর বেশ গরম হয়। আর খিদেটাও পায়। সকালের খাওয়া কখন হজম হয়ে গেছে।

পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে দিল কানু।
জলটা গরম। সে সাঁতরে বেশ কিছুটা এগিয়ে গেল। তারপর ডুব। নিজেকে ছেড়ে দিল একদম। তার শরীর ডুবতে ডুবতে ক্রমশ নিচের দিকে নামতে লাগল। একসময় পায়ের তলায় মাটি।
মাটি ঠিক নয়, পাঁক। আর জল ঠাণ্ডা এখানে। অনেকটা নীচে তো। জল ততটা গরম হতে পারে না।
কুঁজো হয়ে আঁজলা ভরে জল তুলে সে মুখে ঘসতে লাগল। কিছুক্ষন ওভাবে থাকার পর দম নেবার জন্য কানু আবার জলের উপর উঠে এলো। তারপর কিছুটা সময় কাটিয়ে আবার নামল নিচে। শরীর ঠাণ্ডা হতে থাকল ক্রমশ। খুব ভাল লাগছিল তার। যদিও ভাল লাগাটা বেশীক্ষন থাকল না। হঠাৎ করে গৌরীর মুখটা ভেসে উঠল আবছা করে। হঠাৎ করে এই মুখটা কেন ভেসে উঠতে গেল, কানু বুঝে পেল না। কারন এখন আর আলাদা করে গৌরীর কথা মনে করার সত্যিই কোন মানে নেই। এখন তো সে ভালই আছে।

মেয়েটা তাদের গ্রাম থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিল বছর সাতেক আগে। গ্রামে থাকলে এতদিন কানুর গোটা দুয়েক বাচ্চার মা হয়ে যেত সে। কানুর বাড়ি থেকে গৌরীকে পছন্দ করা হয়েছিল। সেটা জানত শুধু গৌরীর বাবা। কানুর বাবা ছিল তাঁর প্রাণের বন্ধু। প্রতি সন্ধ্যায় দুই বন্ধু আরো কয়েকজনের সাথে হরিসভার মাঠে আড্ডা জমাতেন। সেখানেই কথা হয়েছিল হয়তো। কিন্তু মেয়ে জানত না। কানু জানতে পেরে গেছিল। বাবার আর এক বন্ধুর ছেলে, কানুর বন্ধু ছিল। সেই সুবাদেই জানা। জেনে খুব একটা সুবিধার কিছু হয় নি।
গৌরী কাউকে কিছু না বলে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিল। হঠাৎ করেই যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছিল।প্রথম দিকে খুব খোঁজা হয়েছিল। থানা পুলিশও হয়েছিল বোধহয়। এতদিন পরে অতটা মনে নেই।তারপর সব ঝিমিয়ে যায়। যেমন হয় আর কি। তবে হরিসভার মাঠে আসা বন্ধ হয়ে গেছিল গৌরীর বাবার। কানুর বাবা অবশ্য যেত ওঁদের বাড়ি। এখন অবশ্য দুজনের কেউই নেই।

[hfe_template id=’81’]

কানু আবার জলের মধ্যে ভেসে উঠল। ভেসে থাকল আরো কিছুক্ষন। তারপর আরো গভীরে সাঁতরাতে শুরু করল।

সন্ধ্যার একটু আগ দিয়ে বাজারটা চাঙা হয়ে যায়।
প্রতিদিনই।
মেট্রো করে অফিস থেকে ফেরার পথে বাজার সারে অনেক চাকুরীজীবী। স্বামী-স্ত্রী একসাথেও আসে অনেক। তাদের হাতে সময় থাকে না। ঝটাপট বাজার সেরে বাড়ি ফিরতে পারলেই বাঁচে তারা। কানুরা এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করে। পাঁচ ছয় টাকার জিনিস ষাট সত্তরেও বিকিয়ে যায়।
অবশ্য কানুর আলাদা একটা ব্যাপার আছে। ও বাজারে পা দিয়েই বুঝতে পারে মার্কেট কেমন। সন্দেহ হলেই সে পাল্লা ধরে মাল বেচে দেয়। লোক ফিট করাই আছে। পলানদার পেয়ারের মানুষ। শম্ভুদা।
পলানদা পরিচয় করে দিয়েছিল। শম্ভুদাও কানুকে খুব ভালবাসে। সবজি পাতির বড় ব্যাপারী। শম্ভুদার যোগাড় করে দেওয়া জায়গাতেই কানু মাল বেচে। না হলে মদনপুর থেকে এসে, এখানে বসে ব্যবসা করা সহজ ব্যাপার না৷ পার্টির লোকজনও তার সাথে কোন নাকুর নুকুর করে না। সে সবই শম্ভুদার জন্য।
বোঝে কানু।
আজ ব্যবসা ভালই হচ্ছিল। সব মালই উঠে যাচ্ছিল। কিন্তু একটা টুকরো ফ্যাসাদে হঠাৎ ফাঁসল কানু। ফ্যাসাদ তেমন কিছু না অবশ্য। তাদের বয়সী একটা ছেলে মোটরসাইকেল নিয়ে বাজার করতে এসেছিল। মাল নিল। পয়সা মেটালো। তারপর বাজারের ব্যাগ ভুলে রেখে দিয়ে, গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে গেল। ছেলেটার খুব একটা অল্প বয়স নয়। বছর ত্রিশেক হবে হয়ত। ছেলে না বলে লোক বলাই ভাল। জিন্স আর পাঞ্জাবি পড়ে এসেছিল। বাজারের ব্যাগ ফাঁক করে কানু দেখল, তার দোকানের মাল ছাড়াও আরো অনেক কিছুই আছে সেখানে। ঝামেলা হল ব্যাগটাকে ফেরত দেওয়া নিয়ে। আর কিছুক্ষন পরে তার ট্রেনের সময় হয়ে আসবে৷ তার মধ্যে যদি লোকটা না ফেরে..।
মুশকিল।
লোকটা কিন্তু ফিরে এলো।
ততক্ষনে কানু তার ফুটের দোকান গুটিয়ে নিয়েছে। অপেক্ষা করছে… যদি শেষ মুহুর্তে লোকটা ফিরে আসে।
মোটরসাইকেল নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে লোকটা এলো। পরণে বারমুডা আর একটা গোল গলা সাদা গেঞ্জি।
কানু রেডিই ছিল। ব্যাগটা হাতে তুলে দিল লোকটার।
মুখে হাসি ছড়িয়ে লোকটা গাড়ি ঘুরিয়ে নিল। এবং তখনই রিনরিনে একটা গলার আওয়াজ..
কানুদা না? তুমি এখানে?
কানু অবাক হয়ে ভাল করে তাকিয়ে দেখল, মোটরসাইকেলের পিছন সীটে একটা বৌ বসে আছে।
ভাল দেখতে। বেশ ফর্সাপানা।
আরে এ তো গৌরী। গৌরী এখানে?
গৌরী, তুমি এখানে কোথায়?
গৌরীর এক মুখ হাসি। পরিচয় করিয়ে দেবার পর কানু জানল, ওটাই গৌরীর বর।
লেবার কন্ট্রাক্টর।
দু পয়সা করেছে, এটা বোঝাই যায় গৌরীকে দেখে।
তুমি ছিলে কোথায়? তোমাকে তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
পাওয়া যাচ্ছিল না ছাই। মা সব জানত। তোমার সাথে বিয়ের ঠিক করছিল বাবা। এটা মা আমাকে জানিয়ে দিয়েছিল। তখন বুঝলাম পালাতে হবে।কারন তার এক বছর আগে থেকেই তো হারুর সাথে আমার লাইন। তখন হারু রাজমিস্ত্রীর কাজ করতো। হারুদের দেশের বাড়ি জয়নগরে। ওখানেই কিছুদিন বিয়ে করে লুকিয়ে ছিলাম৷ তারপর দমদম চলে আসি।
কিন্তু তুমি এখানে কেন?
আরে আমি তো এই বাজারেই মাল নিয়ে বসি।
এতদূরে কেন?
যার যেখানে জায়গা হয়। নাহলে মদনপুর থেকে এখানে আসতে যাব কেন বলো?
তুমি বিয়ে করেছ কানুদা।
নাঃ, আর বিয়ে করা হয় নি।
করছ না কেন? বল তো মেয়ে খুঁজি।
কানু হাসল।
সব কথার তো উত্তর হয় না। মনে মনে সে তো গৌরীকেই বৌ হিসাবে ভেবে রেখেছিল।

[hfe_template id=’81’]

আমি চলি গো। গাড়ি পাবো না নাহলে।আচ্ছা। আমাদের বাড়ি কাছেই। একদিন এসো না গো। কতদিন পরে দেশের মানুষের সাথে দেখা হল।
দেখি। সময় করে যাব না হয় একদিন।
ঠিক বলছ তো? কথা দিলে কিন্তু।
কানু হেসে হাত নাড়াল। গৌরীর বরও অনুরোধ করল হেসে।
কানু হাসতে হাসতে এগোতে লাগল।তারপর একটা পথ চলতি টোটো দাঁড় করিয়ে উঠে পড়ল। হাত নাড়ল ওদের দিকে তাকিয়ে।
আর দেরি করলে ট্রেন পাওয়া যাবে না। ওরাও হাত নাড়াতে লাগলো।

যাক গৌরী ভাল আছে। বেঁচে আছে। সুখে আছে। বিয়ের কথা ঠিক হবার পর থেকেই একটা অন্য অনুভব তৈরি হয়েছিল কানুর মধ্যে৷ নিরুদ্দেশ হবার পর গৌরীর প্রতি টানটা আরো বেড়ে গেছিল কানুর।
না…কারুর সাথে কখনো এটা নিয়ে আলোচনা করে নি এটা ঠিক। দিন যত এগিয়েছে ততই টান বেড়েছে তার। একা থাকলে অথবা রাতে ঘুমাতে যাবার সময় কানু, গৌরীকে নিয়ে ভাবতে ভালবাসত। মনে হত না, যে গৌরী নিরুদ্দেশ। আজ এত কটা দিন পরে আবার গৌরীকে দেখল সে।
খুব ভাল লাগছে।
ভাল থাকুক গৌরী। সুখে থাকুক।
বিড়বিড় করে বলে ফেলল অস্ফুটে।

অনেকটা ভিতরে চলে গেছিল কানু। এবার ফিরতে লাগল। রোদ্দুর পড়তে আরম্ভ করেছে। উপরের জল আর ততোটা গরম নয়। এতক্ষন সাঁতার কেটে নেশারও আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বাড়িতে গিয়ে গান্ডেপিন্ডে খাবে সে। খুব খিদে এখন। জলের ছোঁয়ায় কি সব নেশা কেটে গেল?
কে জানে।
কানু ফিরতে লাগল।
ডাঙা আর বেশি দূরে নেই।

মনমোহন

লেখেন মনমোহন নামেই, যদিও
স্কুল,কলেজ,অফিস,দলিল,দস্তাবেজ, এই সব জায়গাতেই তাঁর পিতৃদত্ত নাম সুমন মোহন চৌধুরী।
বাড়ি উত্তর চব্বিশ পরগনার কাঁকিনাড়ায়। নৈহাটির ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক।
কলেজের পড়া চলতে চলতেই চাকরির দুনিয়ায় ঢুকে যাওয়া এবং বিভিন্নরকম চাকরিতে বিভিন্নভাবে জগৎসংসারের সাথে পরিচিতি। অনেকরকম পেশার মানুষজনের সাথে পরিচিত হওয়ার সুবাদে সম্মুখীন হতে হয়েছে প্রচুর অভিজ্ঞতারও।
২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে বারোটা বিভিন্ন স্বাদের গল্প নিয়ে প্রথম প্রকাশিত গল্পসংকলনটির নাম, ‘ফেরিওয়ালার পাথর ফেরি’।
এবং ২০২১শে তাঁর প্রথম থ্রিলারধর্মী উপন্যাস “চাঁদিয়াল’ দুর্গাপূজার পর প্রকাশিত হতে চলেছে। এখন তৈরি হচ্ছেন, পরের উপন্যাস লেখার জন্য।

স্বজন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top
error: Content is protected!!
Share via
Copy link
Powered by Social Snap