কবি মজিদ মাহমুদ : জন্মদিনের শুভেচ্ছাঞ্জলি

কবি মজিদ মাহমুদ

আবদুল্লাহ আল মোহন

সহকারী অধ্যাপক, ভাষানটেক সরকারী কলেজ, ঢাকা।

আমাদের অনেকেরই প্রিয় কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্বের নাম মজিদ মাহমুদ। মননশীল পাঠকের কাছে মজিদ মাহমুদ একটি সুপরিচিত নাম, শিল্প-অনুরাগী স্বজনের নাম। কবিতা তাঁর প্রথম প্রেম এবং একান্ত আপন ভুবন হলেও মননশীল গবেষণায় তাঁর মনস্বীতা স্বীকৃত। তাঁর স্বতন্ত্র গদ্য এবং পদ্য, রচনা কিংবা কবিতা উভয় বাংলার সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে সমানভাবে সমাদৃত। তিনি এই সময়ের একজন প্রভাববিস্তারি কবি। সমাজ পরিবর্তনে একজন নিরলস যোদ্ধা মজিদ মাহমুদ। তার কবিতা সমাজকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। কবি ছাড়াও তিনি একাধারে একনিষ্ঠ গবেষক, অনুসন্ধিৎসু সাংবাদিক এবং সমাজসেবক হিসেবও সমান সুপরিচিত। শিক্ষার প্রতি তাঁর সবিশেষ আগ্রহের কারণে শিক্ষকতারও অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ তিনি। সাহিত্য সমালোচকদের মতে, তাঁর ভাষা ও আঙ্গিকের গতিময়তা সমকালীন বাংলা কবিতার জড়ত্বের মধ্যে আলাদা করে চেনা যায়। কবি মজিদ মাহমুদ ১৯৬৬ সালের ১৬ এপ্রিল পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার চরগড়গড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, চর গড়গড়ি গ্রামটি ঈশ্বরদী উপজেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার এবং পাবনা জেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে অবস্থিত। সমকালের বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য নক্ষত্র, মুগ্ধকর কবির প্রতিচ্ছবি মজিদ মাহমুদের জন্মদিনে তাঁকে জানাই ফুলেল শুভেচ্ছা, বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

শুরুতেই উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, প্রতিবছরের ন্যায় এ বছর আর বিশেষ আয়োজন করা সম্ভব হয়নি মহামারী করোনার কারণে।

যদিও এর আগে প্রতি বছর নিয়ম করে পহেলা বৈশাখে (১৪ এপ্রিল) পাবনার ঈশ্বরদীতে কবির জন্মস্থানে শুরু হতো তিনদিনব্যপী ‘চরনিকেতন বৈশাখী উৎসব’। ওসাকা ও পাবনা সাংস্কৃতিক পরিষদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজন “চর নিকেতন বৈশাখী উৎসব ও বাংলা সাহিত্য সম্মেলন’। চরনিকেতন কাব্যমঞ্চে কবি মজিদ মাহমুদের জন্মদিনের অনুষ্ঠানটি বৈশাখী উৎসবের উন্মাদনা নিয়ে পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহর থেকেই বাঁধ ভাঙ্গা উল্লাসে খই-মুড়ি-মুড়কি, মিঠাই-সন্দেশ সহযোগে নাচে-গানে, ঢোলের বাদ্যে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়। এই ব্যতিক্রমী আয়োজনে থাকে মঙ্গল শোভাযাত্রার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা এবং জমজমাট দেশজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দেশীয় ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার অদম্য বাসনা থেকেই প্রতি বছর এপ্রিল মাসের ১৪, ১৫ এবং ১৬ তারিখ এই ৩ দিন ব্যাপী উৎসবের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়ে থাকে। দেশের স্বনামধন্য, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, দেশী-বিদেশী কবি, সাহিত্যিক ও বরেণ্য ব্যক্তিবর্গসহ স্থানীয় সকল শ্রেণির মানুষের উপস্থিতিতে বৈশাখী উৎসবের উন্মাদনা নিয়ে পয়লা বৈশাখের প্রথম প্রহরেই খই মুড়কি মুড়ি, মিঠাই সন্দেশ সহযোগে নাচে-গানে, ঢোলের বাদ্যে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়। প্রতি বছরই এই উৎসবে মঙ্গল শোভাযাত্রা, জারিসারি গান, কবিতাপাঠ, গীতিনাট্য, ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলাসহ বিভিন্ন ধরনের দেশীয় ধাঁচের অনুষ্ঠানসমূহ পরিচালিত হয়ে থাকে। প্রথম বছরই প্রথমবারের মতো দেশের দুজন প্রবীন ও বরেণ্য ব্যক্তিত্বকে “চর গড়গড়ি পুরস্কার-২০১৭’ প্রদানের ঘোষনা করা হয় । সাংবাদিকতায় আজীবন অবদানের জন্য প্রবীন সাংবাদিক, রাজনীতিক এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক রনেশ মৈত্র এবং সাহিত্য-সাধনায় আজীবন অবদানের জন্য বহুমাত্রিক সাহিত্য সাধক জাতিসত্ত্বার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদাকে এই পুরস্কার প্রদানের মধ্য দিয়ে “চর গড়গড়ি পুরস্কার” -এর শুভ সূচনা হয় ।

কবিতা মজিদ মাহমুদের নিজস্ব ভুবন হলেও মননশীল প্রবন্ধ ও গবেষণাকর্মে খ্যাতি রয়েছে। কবি হিসেবে তিনি অনেকের নজর কাড়লেও তাঁর প্রবন্ধের প্রতিই আমার বিশেষ দূর্বলতার কথা স্বীকার করতেই হয়। যদিও জানি, মজিদ মাহমুদের কাব্যের ভাষা ও আঙ্গিকের গতিময়তা সমকালীন বাংলা কবিতার জড়ত্বের মধ্যে আলাদা করে চেনা যায়। মানুষের গহন কান্না, অস্তিত্বের সংকট তার কবিতায় নতুন মিথ ও মেটাফরে প্রতিফলিত। যেখানে মানবচৈতন্যের সচল উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। অবিনাশী সময়ের প্রেক্ষাপট বর্ণনায় তিনি কথকের ভূমিকায় হাজির থাকেন। তবুও তাঁর গবেষণা, গদ্যই আমাকে বেশি টানে। গদ্য যে কতটা সরল ও সরস হতে পারে, তাঁর গদ্য পাঠ না করলে আমার জানাই হতো না। পাঠকদের কাছে সহজ উপস্থাপনায় গদ্যকে নিয়ে গেছেন তিনি গল্পের বয়ানের মতো।আবার তিনি কবি বলেই বোধকরি তাঁর গদ্য কাব্যময়তার স্নিগ্ধ ছায়ার দেখা মেলে। আর এ কারণেই গবেষক হিসেবেও মজিদ মাহমুদের প্রাতিস্বিকতা প্রতিষ্ঠিত বলেই ধারণা করি। ১৯৯৬ খিস্টাব্দে মজিদ মাহমুদ নজরুল ইনসটিটিউটের নজরুল গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন। সেই গবেষণা কর্মের ফসল ‘নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র’ (১৯৯৭); একই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর এই গবেষণা গ্রন্থটি আমার সবচেয়ে প্রিয় গ্রন্থগুলোর অন্যতম একটি। মনে পড়ে সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের আমার প্রিয় বন্ধু ও সহকর্মি মেহেদির (গবেষক কুদরত-ই-হুদা, সহকারি অধ্যাপক, বাংলা) সাথে সমকালিন লেখক-সাহিত্যিকদের সাথে নানা আলাপনে বারবার ঘুরেফিরে আসতো মজিদ মাহমুদের নাম, তাঁর রচনা, বচন ও ভাবনার বৈচিত্র্য।

[hfe_template id=’81’]

মজিদ মাহমুদের পিতা মোহাম্মদ কেরামত আলী বিশ্বাস, মা সানোয়ারা বেগম। তিনি তাদের দশম সন্তান। তিনি জন্মেছিলেন পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার চরগড়গড়ি নামক গ্রামে; পাবনা জেলাসদর থেকে ১৩ কি.মি. পশ্চিমে। তাঁর শিক্ষা-জীবন শুরু হয় স্থানীয় স্কুল-কলেজে। পরবর্তীকালে তিনি গোপালচন্দ্র ইনসটিটিউট (জিসিআই) পাবনা, রাধানগর মজুমদার একাডেমী (আর.এম.এ) পাবনা, শহীদ বুলবুল কলেজ পাবনা, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ পাবনা, শহীদ নূরুল ইসলাম কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পাঠ অসমাপ্ত রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গ্রহণের জন্য রাজধানীতে আসেন। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা সাহিত্যে প্রথম শ্রেণীতে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। মজিদ মাহমুদ ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনেও এম.এ করেছেন।

মজিদ মাহমুদের লেখালেখির হাতেখড়ি শিশুবেলা থেকেই। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘বৌটুবানী ফুলের দেশে’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে কলেজে পড়াকালে তাঁর প্রথম বই ‘বউটুবানী ফুলের দেশে’ প্রকাশিত হয়। পরের বছর প্রকাশিত হয় গল্পগ্রন্থ ‘মাকড়সা ও রজনীগন্ধা’ (১৯৮৬)। ১৯৮৯ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মাহফুজামঙ্গল’ প্রকাশের পর তিনি পাঠকের দৃষ্টি কাড়েন। তাঁর ভাষা ও আঙ্গিকের গতিময়তা সমকালীন বাংলা কবিতার জড়ত্বের মধ্যে আলাদা করে চেনা যায়। এরপর মজিদ মাহমুদের যাত্রা থেমে থাকেননি; তবু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁর কৃপণতা লক্ষ্য করা যায়। ‘মাহফুজা মঙ্গল’ প্রকাশের সাত বছর পরে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয় ‘গোষ্ঠের দিকে’ (১৯৯৬); তারও পাচঁ বছর পরে প্রকাশিত হয় ‘বল উপাখ্যান’ (২০০১)। ‘বল উপাখ্যান’ বাংলা কবিতার কিঞ্চিত স্বাতন্ত্র্য সংকলন বলে উল্লেখ করলে অত্যুক্তি হয় না। ২০০২ সালে ‘আপেল কাহিনী’ নামে অপর একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। মাহফুজামঙ্গল, বলউপাখ্যান ও আপেল-কাহিনী এই তিনটি কাব্যগ্রন্থ মিলে মজিদ মাহমুদের একটি চেতনা-বলয় তৈরি হয়। বাংলা কবিতার বিষয়-চৈতন্যের ক্ষেত্রে তার এ কাব্যত্রয় বাংলা-সাহিত্যের নতুন সম্প্রসারণ। ২০০১ সালে মাহফুজামঙ্গল দ্বিতীয় সংস্করণ এবং ২০০৪ সালে মাহফুজামঙ্গল উত্তরখন্ডসহ তৃতীয় ও অখন্ড সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ২০০৬ সালে তাঁর ‘নির্বাচিত কাব্য-সংকলন’ প্রকাশিত হয়। গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় তাঁর বিশেষ কুশলতা পরিলক্ষিত হয়।তিনি ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনে’র ফেলো হিসেবে দু‘বছরের বৃত্তি নিয়ে ২০০০-২০০১ সালে তিনি কাজ করছেন রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ সাহিত্য বিষয়ে। ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে ‘নজরুলের মানুষধর্ম’ (২০০৪), ‘কেন কবি কেন কবি নয়’ (২০০৩) এবং ‘ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ-প্রবন্ধ’ নামে চেতনা-উদ্যেগকারী তিনটি প্রবন্ধগ্রন্থ।

সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তাঁর রয়েছে বিশেষ দক্ষতা। ‘বৃক্ষ ভালোবাসার কবিতা’ (২০০০) শিরোনামে বাংলা সাহিত্যের বৃক্ষ বিষয়ক কবিতা নিয়ে তিনি একটি কবিতা সংকলন করেন। মাইকেল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত এই সংকলনের ব্যাপ্তি। সংকলনটি পাঠক সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। Bangla Literature নামক একটি অর্ধ-বার্ষিক জার্নালের সম্পাদক তিনি। এছাড়া ২০০৫ সাল থেকে তিনি ‘পর্ব’ নামে একটি সাহিত্য-চিন্তার কাগজ সম্পাদনা করে আসছেন। মজিদ মাহমুদ তাঁর অকাল-প্রয়াতবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কবি ও গবেষক জামরুল হাসান বেগ স্মরণে একটি স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনা করেন।এ ছাড়া সংবাদ সাময়িকী ও জার্নালে ছড়িয়ে রয়েছে তার অসংখ্য উল্লেখযোগ্য রচনা।

চাকুরি জীবনের শুরুতে তিনি মুড়াপাড়া ডিগ্রী কলেজে কিছুদিন অধ্যাপনা করেন। তবুও বলা চলে সাংবাদিক হিসাবে মজিদ মাহমুদের পেশা জীবন শুরু ও ব্যাপ্তি। তিনি সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রচার মাধ্যম ‘দৈনিক বাংলা’র সহকারী সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৭ সালের পরে তৎকালীন সরকার কাগজটি তাদের নির্বাচনী মেনোফেস্টোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বন্ধ ঘোষণা করলে তিনি বেকার হয়ে পড়েন। সেই সময়ে তিনি কিছুদিন কলেজে শিক্ষকতা ও একটি বেসরকারী সংস্থায় কাজ করেন। তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-র উর্ধ্বতন সহ-সম্পাদক হিসাবেও কর্মরত ছিলেন। মজিদ মাহমুদ জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, রাইটার্স ক্লাব ও বাংলা একাডেমীর সদস্য।

সংগঠক হিসেবেও মজিদ মাহমুদের সফলতা রয়েছে। তিনি ১৯৮৬ সালে পাবনায় ‘বন্দে আলী মিয়া স্মরণ পরিষদ’ নামে একটি সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। তিনি তার জন্মস্থান চরগড়গড়িতে শিশুদের জন্য একটি মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে অবস্থিত তার জন্মস্থান এই গ্রাম থেকে শহরের সাথে দ্রুত যোগাযোগের তেমন কোনও আধুনিক মাধ্যম ছিল না। পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, শিক্ষা-দীক্ষার সুযোগ সুবিধা ছিল না বললেই চলে । বর্ষাকালে যোগাযোগের জন্য মানুষের কষ্টের কোনো সীমা ছিল না । গ্রামের মানুষের প্রধান পেশা কৃষি ।পদ্মার চরে জেগে ওঠা জমিই এদের চাষাবাদের মূল ভিত্তি । একসময় কাইজা-ফ্যাসাদ, খুনোখুনি, মামলা-মোকদ্দমা, ঝগড়া-কলহ এখানকার নিত্যদিনের চিত্র ছিল । আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, উন্নত সভ্যতা, শিক্ষা-দীক্ষার ছোঁয়া না থাকায় গ্রামবাসী অর্থনৈতিক কষ্ট এবং দুর্দশার মধ্যে বসবাস করত । গ্রামবাসীদের এহেন অবস্থার উন্নতিকল্পে এই গ্রামেরই সন্তান হিসেবে কবি মজিদ মাহমুদ ১৯৯৪ সালের ১৬ এপ্রিল ‘ওসাকা’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন । উল্লেখ্য, কবি মজিদ মাহমুদ এবং ওসাকা’র জন্মদিন একই দিনে । প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে পাবনা জেলার শীর্ষস্থানীয় সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে । এছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা অধিকারের কথা মাথায় রেখে ২০০৪ সালে চর গড়গড়ি গ্রামে “ওসাকা চিলড্রেন গার্ডেন” নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন যার বর্তমান নাম “বৌটুবানী পাঠশালা” । এ ছাড়াও ওই প্রত্যন্ত গ্রামে তিনি আধুনিক মানের একটি গ্রন্থাগারও গড়ে তুলছেন।

[hfe_template id=’81’]

এ যাবৎকালে কবি মজিদ মাহমুদের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় চল্লিশটির অধিক বলেই জানা যায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটির নাম এক নজরে দেখে নেওয়া যাক। কাব্যগ্রন্থ: মাহফুজামঙ্গল (১৯৮৯), গোষ্ঠের দিকে (১৯৯৭), বল উপাখ্যান (২০০১), আপেল কাহিনী (২০০২) ধাত্রী-ক্লিনিকের জন্ম (২০০৮), দেওয়ান-ই-মজিদ (২০১১), সিংহ ও গর্দভের কবিতা (২০১৩), কাঁটাচামচ নির্বাচিত কবিতা (২০০৯), গ্রামকুট (২০১৫), ভালোবাসা পরভাষা (২০১৫), কবিতামালা (২০১৫), কবীরের শতদোঁহা ও রবীন্দ্রনাথ (২০১৬)। গবেষণা ও প্রবন্ধগ্রন্থ: নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র (১৯৯৭), কেন কবি কেন কবি নয় (২০০৩), নজরুলের মানুষধর্ম (২০০৩), ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ প্রবন্ধ (২০০৩), উত্তর-উপনিবেশ সাহিত্য ও অন্যান্য (২০০৮), রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণসাহিত্য (২০০৯), সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্পভাবনা (২০১১), রবীন্দ্রনাথ ও ভারতবর্ষ (২০১২), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৪), ক্ষণচিন্তা (২০১৬)। সম্পাদনা: বৃক্ষ ভালোবাসার কবিতা (২০০০), জামরুল হাসান বেগ স্মারকগ্রন্থ (২০০৩), বাংলা লিটারেচার ও সাহিত্য চিন্তার কাগজ ‘পর্ব’। কবি মজিদ মাহমুদ তার সাহিত্য কর্মে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য এ পর্যন্ত বেশকিছু পুরষ্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। কবি মজিবুর রহমান বিশ্বাস স্মৃতি-পুরস্কার, কবি মকবুল হোসেন স্মৃতি-পুরস্কার, কবি মঞ্জুষদাশ স্মৃতি-পুরস্কার, সৌহার্দ্য’৭০ কোলকাতা, অনিরুদ্ধ ৮০ কোলকাতা, হলদিয়া কবিতা উৎসব পশ্চিমবঙ্গ, ঈশ্বরদী জনকল্যাণ সমিতি সম্মাননা।

অতি সম্প্রতি কবি মজিদ মাহমুদ ‘একান্ত কথা’য় আত্মউপলব্ধির কিছু অনুভূতি স্বীকার করে লিখেছেন, ‘জীবনের শুরুতে পত্রিকার চাকরি করে জীবন ধারণ করলেও আমার লেখকজীবন কখনো দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতা নির্ভর ছিল না। আমার বহুল পঠিত ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যগন্থের ৮৮টি কবিতার একটিও গ্রন্থাকারে প্রকাশের আগে কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। বিগত ৩৫ বছরে আমি ছত্রিশখানা গ্রন্থ রচনা করেছি- তার প্রায় সবগুলোর ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। পত্রিকায় একেবারে লিখিনি তা কিন্তু নয়, কালেভদ্রে তো লিখেছি, এখনো লিখি; লেখা ছাপানোর ব্যাপারে আমার কোনো প্রেজুডিসও নাই। তবে আমি গভীরভাবে ভেবে দেখেছি, দৈনিক পত্রিকা লেখার বিজ্ঞাপনের জন্য ভালো হলেও ভালো লেখার জন্য ভালো নয়। আগে দু’একটা অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করি- আমার বয়স পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেলে বহুল প্রত্যাশিত দৈনিক প্রথম আলোর সাহিত্যপাতা থেকে ফোনে আমার কাছে কবিতার অনুরোধ জানানো হয়, সঙ্গে সবিনয়ে এও বলা হয়- কবিতাটি যেন ১৬ থেকে ২০ লাইনের মধ্যে হয়। যদিও এক লাইনেও কবিতা লেখা সম্ভব, তবু এ ধরনের পূর্বশর্ত কবিতার জন্য সুখকর হয় না। তবু প্রথম আলোর আহ্বান, নামটি বিজ্ঞাপিত করার খায়েশ কার না থাকে। লেখক-জীবনে অনেক উপেক্ষা অপমানের বঞ্চনা সত্ত্বেও সাড়া না দেয়ার সাহস করিনি; এক বছরে গোটা তিনেক কবিতা তারা সম্মানের সাথে ছেপেছিলেন। ভেবেছিলাম, নাম প্রচারের বাধা কিছুটা ঘুচল; কিন্তু বিগত এক বছরে আর কোনো টেলিফোন পাইনি, পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার আহ্বান ছাড়া। প্রসঙ্গ হলো, ১৬ লাইনের মধ্যে কবিতা সীমাবদ্ধ রাখা। একটা দৈনিক পত্রিকার পক্ষে সনেট ছাপা সম্ভব হলেও মহাকাব্য তো ছাপা সম্ভব নয়। কিন্তু সবাই তো আর সনেট লিখতে পারবে না, কেউ কেউ মহাকাব্যও লেখেন, তাদের জন্য পত্রিকার সাহিত্যপাতা কি ধরনের কাজে দেবে? দৈনিক যুগান্তরে যে তরুণটি সাহিত্যপাতা দেখে, সে দেখা হলেই প্রবন্ধ চায়; আমি কোনো একবার তার মেইলে একটা প্রবন্ধ পাঠিয়েছিলাম। সে ফোনে জানাল, মজিদ ভাই, প্রবন্ধটি অসম্ভব ভালো, তবে যদি একটু ছোট করে ১৮শ শব্দের মধ্যে দেন। তাকে দোষ দিই না, তার পক্ষে আঠারশ শব্দের বেশি ছাপা কি সম্ভব? আমি পারি না বলে কি পায়ের মাপে জুতা হবে না? আমি একটি পত্রিকায় কিছুদিন ফিচার এডিটর ছিলাম, তখন দেখেছি, বিশেষ করে ঔপন্যাসিকগণ তাদের একটি উপন্যাসেরই বিভিন্ন অধ্যায় বিভিন্ন পত্রিকার ঈদসংখ্যার জন্য সম্পূর্ণ উপন্যাস হিসাবে ছাপতে দেন। এমনকি আমরাও কখনো কখনো দুশ পাতার উপন্যাস কেটে বিশ পৃষ্ঠার মধ্যে নিয়ে আসতাম। এতে ঔপন্যাসিকগণের কোনো আপত্তি থাকত না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তরুণ ঔপন্যাসিকগণ জাক করে তাদের বন্ধুদের কাছে, কিংবা ফেইসবুকে শেয়ার দিয়ে বলতেন- এবার তাদের কয়টা উপন্যাস ছাপা হয়েছে। আবার লেখা ছাপানোর আগে অনেক লেখক কাকুতি-মিনতি করলেও প্রকাশের সপ্তাহ না ঘুরতেই সম্মানির জন্য সাহিত্য সম্পাদককে অসম্মান করতে থাকত। এ ক্ষেত্রে লেখক ও পত্রিকার কারোই মহৎ উদ্দেশ্য আমি বুঝতে পারিনি। আসলে একজন লেখক কি কেবল তার নামের প্রতি মোহাবিষ্ট, নাকি তিনি যা প্রকাশ করতে চান তার প্রতি অনুরক্ত। আমি খুব কম লেখককেই দেখেছি, তার লেখা মার্জনা করতে চাইলে পাণ্ডুলিপি ফেরত নিয়েছেন। তাছাড়া আমার নিজের লেখার একটি বড় অংশ গবেষণা-জাতীয়; যা পত্রিকার পাতায় সঙ্গত কারণেই ছাপা হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এক শ্রেণির লেখক আছেন, যাদের পত্রিকা ছাড়া গত্যান্তর নেই। পত্রিকায় নাম ছাপা, পত্রিকা প্রবর্তিত পুরষ্কার হাতিয়ে নেয়া, পত্রিকার মালিকদের নিন্দা করা, সাহিত্য-সম্পাদকের সঙ্গে গোস্সা করা, বন্ধুত্ব করা- আর এ সবের মাধ্যমে তারা পল্লবগ্রাহী পাঠক-লেখকের উপর আধিপত্য বিস্তারের কাজটি নিরন্তর করে চলেন। যদিও পাঠক ও লেখকের অন্বিষ্ট পত্রিকা নয়; বই। তবু পত্রিকার সাহিত্য-সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে লেখকদের একটু বেশি সমীহ থাকে। লেখক-জীবনে এমন সব অনুভূতি ও সত্যোপলব্ধি থাকে, যা প্রকাশ না করে পারা যায় না- যা প্রায়ই পত্রিকার মালিক পক্ষের স্বার্থবুদ্ধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক; আর তাই লেখকদের সেইসব সত্য-উদ্বোধন কখনো পত্রিকার পাতায় ছাপা সম্ভব নয়। কিছু তথ্য-উপাত্ত আর সুকুমার রায়ের বাপুরাম-সাপুড়ে জাতীয় লেখা ছাপার জন্য দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতা উপযুক্ত স্থান।’

মজিদ মাহমুদের কবিতা মানে নতুন নতুন অভিজ্ঞাতার সঙ্গে পরিচিত হওয়া। তার প্রতিটি কাব্যগ্রন্থ বিষয় ও আঙ্গিকগত দিক থেকে ভিন্ন ভিন্ন। আর নিজের কবিতা লেখার দর্শন সম্পর্কে মজিদ মাহমুদ বলেছেন, ‘নিজের ও বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে এই বইটি লিখেছি। আমি সমস্ত কিছুকে দেখেছি সমাজের প্রেক্ষাপটে এটা আলাদাভাবে আমার দর্শন নয়। একটা সময়কালের মধ্য দিয়ে নিজেকে দেখেছি। এখানে সময়ের চেতনাও কাজ করেছে। আমি মনে করি পৃথিবীতে কোথাও এটা ইউনিভার্সাল নয়। সবকিছুই একই মাত্রায় ঘটে না। এবং প্রতিটি বিষয়ই আমি ক্রিটিক্যালি দেখার চেষ্টা করেছি।’ কবি মজিদ মাহমুদ তাঁর ‘সিংহ ও গর্দভের কবিতা’ বই ও সমসাময়িক সাহিত্য সম্পর্কে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে গিয়ে বলছেন, ‘একজন কবি সারাজীবন ধরে তার প্রতিভাকে উন্মেষ করতে ব্যস্ত থাকে। যখন যে ধারণা বা আপাত সত্যের সঙ্গে মুখোমুখি হন তখন কবি সেটাকে ধরতে চেষ্টা করেন। এমন নয় যে এটা একটা নির্দিষ্ট পর্বের মধ্যে রচনা করার চেষ্টা করেছি। এটি মূলত বিগত এক দশক কাল ধরে বিভিন্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে আছে জীবনের গভীর অথচ হঠাৎ উদ্ভাসিত কোন অভিক্ষেপ। আপাত অর্থে এর গভীরতা ব্যাপক। আমি প্রথমে এ কাব্যগ্রন্থের নাম দিতে চেয়েছিলাম পরমার্থ। এটি প্রমাণিত যে মানবজীবনের সামগ্রীক অভিজ্ঞতার প্রকাশসমূহ কেবলমাত্র আন্দনিকতার বাইরে থেকেও অধিক সময় ধরে টিকে থাকে। যেমন ঈশপ বা খনা এখনও আমাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।’
এক সাক্ষাৎকারে মজিদ মাহমুদকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। এই ‘কেউ কেউ’ বা ‘কারও কারও’ কবি হয়ে ওঠায় ঐশীপ্রাপ্তির কোনও ঘটনা থাকে কি? নাকি পুরো ব্যাপারটাই রেওয়াজ নির্ভর? আপনার কী মনে হয়? এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি’। এই বাক্যবন্ধটি কিভাবে বাংলাকাব্যাঙ্গনে প্রবেশ করেছে তা কেবল কবি নয় প্রকৃত কবিদের হেয় করার জন্যও অকবিরা ব্যবহার করে থাকেন। আমার মনে হয় জীবনানন্দ দাশ নানা মানসিক যন্ত্রণায় সংক্ষুব্ধ হয়ে এই মন্তব্যটি তার একটি প্রবন্ধ জাতীয় রচনায় ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। যদিও এটি সত্য জীবনানন্দ দাশ প্রবন্ধ লিখতে জানতেন না। তবু একজন অবসেশনাল কবি হিসাবে তার সকল কথাই পরবর্তীকালের কবিদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে। এই গুরুত্ব কেবল তিনি ভালো লিখেছেন সে জন্য নয়; তিনি আসলে যিশুর মতো কষ্ট সহ্য করেছেন, একাকীত্বের যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, কথিত সমকালীন বয়স্য ও পরিজন দ্বারাও কমবেশি নিগৃহীত হয়েছেন; আবার ট্রামাহত হয়ে যন্ত্রণাময় মৃত্যুর পরে কবি খ্যাতিও পেয়েছেন। আর এসবই পরবর্তীকালের বিবিক্ত অসহায় কবিদের আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে যাই হোক, এবার আমি এই বাক্যটি নিয়ে দুএকটি কথা বলতে চাই; আগেই বলেছি এটি কোনো যুক্তিপূর্ণ কথা নয়। ইংরেজিতে একে বলে জেনারালাইজ করা, বাংলাতে কেউ বলে সামান্যিকরণ বা সাধারণীকরণ। যেমন সব পেশার ক্ষেত্রেই কি এই মন্তব্যটি সমানভাবে ব্যবহার করা যায় না? উদাহরণ দেয়া যাক: ‘সকলেই দার্শনিক নয়, কেউ কেউ দার্শনিক, ‘সকলেই বিজ্ঞানী নয়, কেউ কেউ বিজ্ঞানী।’এভাবে সকল পেশা সম্বন্ধেই আপনি বলতে পারবেন। তাহলে কবির জন্য তো এটি স্পেশাল কিছু থাকলো না যেÍ একজন কবিকে এই বাক্যের তোয়াক্কার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কবি হওয়ার জন্য ঐশিপ্রাপ্তির বিষয়টি একটি দৈবাৎ। যদিও কবি হওয়ার এই তত্ত্ব আমি একেবারেই বিশ্বাস করি না। তারপরেও একটি সামান্যিকরণ ধারণার মাধ্যমে এই তত্ত্বের পক্ষেও দাঁড়ানো যায়। পৃথিবীতে মানুষের আসাটাই কি একটি দৈবাৎ নয়। ধরুণ একজন নামডাকওয়ালা কবি তার নিজের জন্মের ব্যাপারে কি তার হাত ছিলো? যে জন্মালো না সে কিভাবে কবিতা লিখবে? জন্মালো অথচ লেখাপড়া শিখলো না তাহলে সে কিভাবে লিখবে? যদি বিষয়টি ঐশি হতো তাহলে লেখাপড়া শেখার কোনো দরকার হতো না, উম্মি হলেই চলতো, জগতের কোনো পয়গম্বর-অবতারকে লেখাপড়া শিখতে হয়নি; তাদের জন্য ঐশিতত্ত্ব চালু আছে। সুতরাং কবির জন্য এই তত্ত্বটি অসার। তাহলে প্রশ্ন মানুষ কবিতা লিখতে আসে কেন? আসলে এটি একটি ঝোঁক বা প্রবণতা। মানুষের মস্তিষ্কে এমন সব রসায়ন থাকে, নানা মিথস্ত্রিয়ায় তা প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞানীরা হয়তো তা বলতে পারবেন। কোনো একটি প্রবণতাই তাকে এ পথে নিয়ে আসে। এমনকি যারা লিখতে পড়তে জানেন না তাদের মধ্যেও এই ঝোঁক থাকে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিশেষ করে মরমী কবিদের অনেকেরই অক্ষরজ্ঞান ছিলো না। তাতে তাদের ওই মাত্রায় কবি হওয়ার পথে অন্তরায় ছিলো না। যিনি কালক্রমে কবি হন তিনি আসলে প্রথমত তার মানসিক ঝোঁকের সঙ্গে কবিতার পথে এগুতে থাকেন। প্রথম পর্যায়ে নিজের অব্যক্ত অনুভূতি প্রকাশের আনন্দে সে বিভোর থাকে। পরবর্তীকালে তার বয়স্যদের এপ্রিসিয়েশন তাকে এই কাজে নিযুক্ত থাকতে সহায়তা করে। কারণ, একজন মানুষ কেবল নিজেই লেখেন না, তার পাঠকবর্গও তার সঙ্গে এগিয়ে চলে। কোনো কবির পক্ষে যদি তার পাঠকের সমীহ না জোটে তাহলে তার কবিজীবন ব্যর্থ হতে বাধ্য। এ নিয়ে সাহিত্যের তাত্ত্বিকদের মধ্যে অনেক বিতর্ক রয়েছে। আসলে কে বেশি গুরুত্বপূর্ণÍ লেখক না পাঠক? তবে এই যে রেওয়াজের কথা বললেন অর্থাৎ সাধনা। হ্যাঁ, অবশ্যই কঠোর সাধনা ও সংগ্রামশীলতাই কেবল একজন কবির পথে আগত ব্যক্তিকে শক্তিশালী কবি ব্যক্তিত্বে পরিণত করতে পারে।’
কবি নাসির আহমেদের মতে, ‘মজিদের কবিতা খুব ভারি কবিতা। সস্তা হাততালি পাওয়ার কবিতা নয়। তার কবিতা উপলব্ধি করতে হয়, নিমগ্নতা নিয়ে পড়তে হয়। তিনি শুধু সমকালীন নন, বাংলা কবিতার উত্তারাধিকারের মধ্যেও আলাদা কবিতা লেখেন। আমরা যেসব বড় কবি দেখেছি; বাংলা ভাষা কেন, পৃথিবীর সব শ্রেষ্ঠ কবি- তারা কমিউনিকেটিভ পোয়েট_ তাদের ভাষা যোগাযোগের ক্ষমতাসম্পন্ন। মজিদের ভাষা কমিউনিকেট করে, পরিণামে ঘোর লাগিয়ে দেয়। তার কবিতায় আছে একটি ধাঁধাঁ, যেটি তিনি দক্ষতার সঙ্গে তৈরি করেন। এ কাজটা তিনি করতে পারেন সতর্কভাবে।… আমার বিশ্বাস, প্রত্যেক কবি তার নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও কিছু শব্দ ব্যবহার করেন, যা দেখলে তাকে চেনা যাবে। মজিদের ‘বল উপাখ্যান’, ‘আপেল কাহিনী’, ‘ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম’ এবং অন্য যেসব কবিতার বই প্রতিটিতে মজিদীয় দর্শন, জীবন-বিশ্বাস ও সমকালীন চেতনার স্বাক্ষর রয়েছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, তার কবিতায় রাজনীতি নেই বলে অনেকেই ভুল করতে পারেন। অথচ তিনি প্রবলভাবে রাজনীতি-সচেতন কবি; তার কবিতায় প্রবলভাবে সমকাল আছে। কিন্তু তিনি সমকালীনতা স্লোগানের পর্যায় না থেকে সাংকেতিকতা নিয়ে হাজির হয়েছেন; রূপক প্রতীকের ব্যবহারও তার কবিতায় প্রবল।’
এ লেখার পরিসর বড় হয়ে যাবে বলে তাঁর গদ্যগ্রন্থের চেয়ে বেশ আলোড়িত কয়েকটি প্রবন্ধের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। প্রথেমেই বলি ‘মুক্তির জন্য কবিতা’ প্রবন্ধটির কথা। সেখানে তিনি অকপটে স্বীকার করছেন, ‘আসলে মুক্তি মানে ভালোবাসা। আমরা ভালোবাসার মানুষের কাছে যেতে চাই। আমরা তাকে খুঁজে বেড়াই। কিন্তু কায়াময় জীবনে তাকে পাওয়া যায় না। এসব কথাই এ দেশের বাউল কবিরা বলেছেন। ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছেন। দেহের চৌহদ্দির মধ্যে দেহাতীতের সন্ধান করেছেন। কিন্তু সেই মুক্ত পাখিকে মুক্ত করে রাখার মধ্যে সুখ নেই; তাই লালন বলেছেন, ‘ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতাম পাখির পায়।’ এখন দেখা যাচ্ছে প্রিয়জনকে সবাই মুক্তি দিতে নারাজ; প্রিয়জনকে সবাই নিজের কাছে ধরে রাখতে চায়। এই চাওয়া যতক্ষণ উভয় পক্ষের ভালোবাসায় সংগঠিত হয়, ততক্ষণ এই বন্দিত্বকে মুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুতরাং বন্দিত্ব ও মুক্তি আপাত বিরোধাত্বক মনে হলেও দুটিতে রয়েছে দারুণ মিল; সূর্য পৃথিবীকে ছেড়ে দিলে, পৃথিবী চন্দ্রকে ছেড়ে দিলে যেমন সর্বত্র গোল বেঁধে যাবে, তেমনি ভালোবাসার মানুষ মুক্তি দিয়ে গেলে প্রেমিক হয়ে যাবে গোলমেলে মজনু অর্থাৎ বন্ধন ছেড়ে দিলেও মুক্তি হয়ে যায় সুদূর পরাহত। মুক্তি আসলে একটি সঠিক কেন্দ্রের ধারণা । কেন্দ্রচ্যুতি হলে মুক্তি ব্যাহত হয়, এমনকি অস্তিত্বের সংকটও তৈরি হতে পারে। কবি কখনও সে মাত্রাকে অতিক্রম করে না। এমনকি সে তার কবিতা গঠনের ক্ষেত্রেও একটি ছন্দময় নিয়ম মেনে চলে। ছন্দ থেকে কবিতাকে মুক্তি দিলেও অন্য একটি নিয়মের মধ্যে সে প্রবিষ্ট হয়। পৃথিবীতে মানুষের কাক্সিক্ষত ও যাচিত মুক্তি সম্ভব নয়; মুক্তি এখানে সাপেক্ষে রচিত। তাই মুক্তির জন্য একক কোনো সংজ্ঞা রাখা হয়নি। হরিচরণের বঙ্গীয় শব্দকোষে তাই এর বিবিধ অর্থ রাখা হয়েছে। অর্থগুলো হলো: ১. স্বাধীনতা ২. পরিত্রাণ ৩. মোক্ষ ৪. অবসান ৫. হিন্দুমতে জীবজন্ম পরিগ্রহ থেকে অব্যাহতি ৬. নিষ্কৃতি ৭. অবরোধ বা বন্ধন হতে মুক্তি। কবিরা এর সকল অর্থকে কবিতায় গুরুত্ব দিয়েছেন। তবু মোদ্দা কথা, কবিতা ও মুক্তি একই সঙ্গে চলতে পারে না। আর চলতে হলে জীবনকে কারাগারে বা খাড়ার তলে বন্দি রেখেই কবিতা রচনা করতে হবে। কারণ রুটির বিনিময়ে ঈশ্বর আমাদের স্বাধীনতা কিনে নিয়েছেন; আর ঈশ্বরের রুটির পারমিট দখল করে রেখেছে সরকার ও তাদের এজেন্টরা। তবু মানুষের মন কবিতা, সংগীত ও নৃত্যের আধার; শুষ্ক কাষ্ঠখণ্ডের মধ্যে, একটি ধাতব একতারার মধ্যে যে কান্না বন্দি হয়ে থাকে ভালোবাসার স্পর্শে মানুষ তার ভেতর থেকে সুরের মুক্তি দিয়ে থাকে। যতদিন কবিতা থাকবে ততদিন সুর থাকবে, যতদিন মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষা থাকবে, ততদিন মানুষ কবিতা লিখবে।’
‘নজরুল জীবনের অভিশাপ ও আশীর্বাদ’ রচনায় মজিদ মাহমুদ বলতে দ্বিধা করছেন না, ‘কবি হিসেবে অভিশাপ ও আশীর্বাদ নজরুল-জীবনে অবিমিশ্র ছিল না। হিন্দু ব্রাহ্মণ ও মুসলমান মৌলবী, বিদেশী রাজা আর দেশী রাজ-কর্মাচারী এ ব্যাপারে প্রত্যেকে ছিলেন একাট্টা। নজরুল ভিন্ন বাংলা ভাষাভাষীদের আর কোনো অভিজ্ঞতা নেই যে- শুধু কবিতা লিখবার দায়ে একজন মানুষ কি পরিমাণ নিন্দিত ও নন্দিত হতে পারেন। গ্রিক মিথোলজির অমরতার পুত্র প্রমিথিউসের মতো সারাদিন শকুনিরা তাঁর মাংস খুবলে খেতো আর রাতে তিনি নিজেকে শিল্প-মাংসে সংগঠিত করে তুলতেন প্রাতে পুনরায় শকুনির ভোজের নিমিত্তে। কিন্ত স্বর্গের আইন ভঙ্গ করে অসহায় মানুষের জন্য দেবতাদের সংরক্ষিত যে আগুন তিনি চুরি করে এনেছিলেন তা ছড়িয়ে পড়েছিল দিগ্বিদিক রুটির দোকানের শিশু-শ্রমিক থেকে লেটোগানের আসর ছাড়িয়ে তা পৌঁছে গিয়েছিল ‘সভ্যের বর্বরলোভ’ থেকে মুক্তিকামী প্রতিটি অসহায় মানুষের হৃদয়ে সে আগুন ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা ছিল না সাগর পারের ঔপনিবেশিক প্রভু ও তাদের টাইটানদের। তাই এই ‘বিদ্রোহী ভিগু’র জন্য ছিল তাদের অভিশাপ আর অবিরত শাস্তি। নজরুলের সক্রিয় জীবনকাল শেষ হয়েছে প্রায় পৌনে একশত বছর আগে। কিন্তু প্রয়াত নজরুল ও নজরুল-সাহিত্যের জন্য পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে সামান্য। বরং তাকে বর্জন ও গ্রহণের নানা রকম রাজনৈতিক মিথস্ক্রিয়ায় এখন কোনটি যে আসল নজরুল তা ঠাহর করা দুরূহ। যে সব রাজনৈতিক বিবেচনায় নজরুল তাঁর সমকালে নিন্দিত ও নন্দিত ছিলেন নির্বাক ও প্রয়াত নজরুলযুগে তার ধরন-ধারণ সম্পূর্ণ পাল্টেছে। নজরুল যে সব বিষয় নিয়ে যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন আজ তারা হয়ে উঠেছেন নজরুলের অন্যতম প্রধান দাবিদার। আর যে শ্রেণী নজরুলকে সেদিন অভিনন্দন জানিয়েছিলেন নজরুলের ভাষাকে যারা শৃঙ্খলিত মানবতার বাণী বলে চিনতে পেরেছিলেন তাদের অনেকেই আজ নজরুল-বিচারে বিভ্রান্ত।’
তাঁর শ্রেষ্ট সৃষ্টি হিসেবে সাহিত্যবোদ্ধাদের নজর কাড়া ‘মাহফুজামঙ্গল’ আলোচনায় একটু নজর দেওয়া জরুরি বলেই বিবেচনা করি। সমালোচকদের মতে, ‘কবিতাময় যে বিশ্বকে ভাবেন কবি, কবিতার সংসার থেকে তিনি কোনোদিন দূরে যেতে পারেন না। কবিতাকে বুকের ভেতর আঁকড়ে ধরে সুখ খুঁজে বেড়ান তিনি। আমরা যদি তাঁর সব ক’টি গ্রন্থ নিবিড়ভাবে চষে বেড়াই, সেই ‘মাহফুজামঙ্গল’ থেকে দেওয়ান-ই- মজিদ হয়ে সিংহ ও গর্দভের কবিতায়। আমরা দেখতে পাব কবিতার স্রষ্টা হিসেবে তাঁর কবিতা কতটা রূপ ও বৈচিত্র্যে ভরা। মনে হবে একজন সফল কৃষকের মতো সাদা কাগজের জমিনে অবিরত লিখে চলেছেন কবিতা।’ তাঁর ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলোচনায় সমালোচকদের কেউ কেউ বলছেন, ‘কবিতার চিত্রকল্প কবিতার বিষয়-বৈচিত্র্য আমাদের কীভাবে অনাবিল সুর ও ছন্দের স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে, কবিতায় মিথের ব্যবহার কবিতাকে আরো কত সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তুলতে পারে, তার প্রমাণ মজিদ মাহমুদের ‘মাহফুজামঙ্গল’। কবিতার পাঠক যেন একটা আত্মবিশ্বাসের জায়গা ফিরে পেলো। একটা চিত্র হয়ে সামনে এসে দাঁড়াল মজিদ মাহমুদের কবিতা-‘তোমার সান্নিধ্যে এলে জেগে ওঠে প্রবল ঈশ্বর/ তুমি তখন ঢাল হয়ে তাঁর তির্যক রোশানি ঠেকাও/ তোমার ছোঁয়া পেলে আমার আজাব কমে আসে সত্তরগুণ/ আমি রোজ মকশো করি তোমার নামের বিশুদ্ধ বানান/ কোথায় পড়েছে জানি তাসæি জজম/ আমার বিগলিত তেলওয়াত শোনে ইনসান/ তোমার নামে কোরবানি আমার সন্তান/ যূপকাঠে মাথা রেখে কাঁপবে না নব্য-ইসমাইল/ মাহফুজা তোমার শরীর আমার তছবির দানা/ আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়।’ কবিতার কারুকাজ, ধ্যানজ্ঞান, নারী ও ঈশ্বরভাবনা আমাকে প্রবলভাবে আচ্ছন্ন করতে থাকল। মঙ্গলকাব্য থেকে উত্তর-আধুনিক কবিতায় ফিরে যেতে যেতে কবিতার নান্দনিকতায় মুগ্ধ হলো পাঠক। ‘ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ায়/ আমি প্রার্থনার জন্য যতবার হাত তুলি সন্ধ্যা বা সকালে/ সেই নারী এসে আমার হূদয় মন তোলপাড় করে যায়/ তখন আমার রুকু/ আমার সেজদা/ জায়নামাজ চেনে না/ সাষ্টাঙ্গে আভূমিলুণ্ঠিত হই/ এ মাটিতে উদ্গম আমার শরীর/ এভাবে প্রতিটি শরীর বিরহজনিত প্রার্থনায়/ তার স্রষ্টার কাছে অবনত হয়/ তার নারীর কাছে অবনত হয়’। ঈশ্বরের কাছে নতজানু বিশ্বসমাজ। দেবীর আসন কতটা আমাদের কাছে গ্রহণীয়! দিন যেতেই কবি হিসেবে একটা স্বতন্ত্র জায়গা করে নিতে থাকলেন তিনি। তাঁর পরবর্তী কাব্যে তাঁকে পাঠক অন্যভাবে পেলো। বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্প থেকে প্রকাশিত, ‘গোষ্ঠের দিকে’ তিনি জানান দিয়ে গেলেন কবিতার শরীর অধরা হলেও তার ভাবব্যঞ্জনা মনের গভীরে কতটা দীর্ঘ আসন লাভ করতে পারে-‘আমি একটি ধেনুর পুচ্ছের গুচ্ছ ধরে/ বিশাল জাহ্নবী/ পেরিয়ে যাচ্ছি/ সন্তরণ জানি না বলে এতকাল যারা অপবাদ দিয়েছে’।
‘মজিদ মাহমুদের মাহফুজামঙ্গল : পঁচিশ বছরের পাঠ’ প্রবন্ধে সাহিত্য সমালোচক, শিক্ষক মোহাম্মদ আজম যথার্থই বলেছেন, ‘মাহফুজামঙ্গলের কবিতাগুলো পড়তে পড়তে মুখোমুখি হই একরাশ ভাবের। ভাবগুলো পরিচিতি আর অপরিচয়ের জড়ানো-মিশানো মাঝ বরাবর চলতে থাকে। পরিচিত ভাবসকল আহবান করে কবিতার ভিতরবাগে। সেখানে অভাবিত আরো অনেক কিছু উন্মোচিত হতে থাকে। পরিচিত ছকের ইশারায় এগুতে গিয়ে হোঁচট খেতে হয়। সহসা অপরিচয়ের অন্ধকার পরিচিত আলোকে গ্রাস করে নিয়ে নেয় আপন কবজায়। তৈরি হয় নতুন ছক। বহুমাত্রিক বা বহুব্যঞ্জনাময় বলে কাব্যসাহিত্যকে পড়বার-বুঝবার যে পরিচিত ভঙ্গিতে আমরা অভ্যস্ত, মাজফুজাকে তার মধ্যে অনায়াসে ফেলে দেয়া যায় না। কারণ, মাহফুজা খোলস ছেড়ে ছেড়ে কেবল সামনের দিকে আগায় না; পেছনেও যায়। আর হঠাৎ আগে খোলাসা করা নিভৃত পরিচয় এক লহমায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ধারণ করে নতুন বেশ। শরীরেও, মনেও। কাব্যসাহিত্যে ‘রহস্যময়তা’ বলে যে এক কুহকী শব্দ হরহামেশাই ব্যবহৃত হয়ে থাকে, মাহফুজার জন্য তা-ই বেশ জুতসই মনে হয়। এতে করে অবশ্য মামলা খারিজ হয় না। জমে ওঠে মাত্র। কারণ, রহস্যময় যেসব এলাকা মানুষের সৃষ্টিলোকে বহুদিন ধরে সঞ্চিত হয়ে আসছে, তার স্থিরনির্দিষ্ট এক বা একাধিক এলাকায় ফেলে কবিতাগুলো পড়ে ওঠা কঠিন। ঠিক খাপে খাপে মিলে না। মিলতে চায় না। আধ্যাত্মিকতা এখানে যথেষ্ট আছে। কিন্তু দৈনন্দিনতার নিরেট বাস্তব এত বেশি আছে যে, অধ্যাত্মবাদ স্বরাট মাথাটি তুলে ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য ঘোষণা করতে পারে না। শরৎচন্দ্র সেই কবে শ্রীকান্তের এক দুর্দান্ত চিলতে কাব্যাংশে ঘোষণা করেছিলেন- অন্ধকার আর রহস্য সমার্থক। মজিদ মাহমুদের এই কাব্যে অন্ধকার কিছু আছে। দূরবর্তিতার অন্ধকার, অচেনা ভাব-স্বভাবের অন্ধকার, আপাত মিলহীন ভাবসকলের কোমল মিশ্রণের অন্ধকার। আবার আলোও দেখতে পাই বেশ। পরিচয়ের আলো। ইন্দ্রিয়ানুভূতির কাতর স্বীকৃতি, প্রেম-কামের পরিচিত এলাকায় উচ্চারিত হাহাকার আর বস্তুজগতের পরিচিত জগৎ এখানে এতটাই পষ্ট যে, রহস্যের আঁধার আর বাস্তবের আলোর দ্বৈরথে এখানে শেষ পর্যন্ত এক পক্ষকে জয়ী ঘোষণা করা যায় না। মাহফুজা এ কাব্যে কোনো নিপাট সরলরেখা তৈরি করে না, এক বা একাধিক আদর্শ বৃত্ত তৈয়ার করে না, কোনো শনাক্তযোগ্য সম্মুখগতি-পার্শ্বগতি তৈরি করে না। আকারহীনতা মাহফুজামঙ্গলের প্রধান শক্তি। হয়ত দুর্বলতাও।’
মাহফুজা প্রথমত ও প্রধানত নারীই; শেষ পর্যন্তও নারী। আর তার বন্দনাকারী দুষ্ট কবিটি পুরুষই বটে। না, নারী বা পুরুষের শরীরী অবয়বের প্রত্যক্ষ বর্ণনা থেকে এ পরিচয় পাওয়া যায় না। মঙ্গলকাব্যের সেই জমানা অনেকদিন হল গত হয়েছে। শেষ হয়ে অবশ্য পরোক্ষ বর্ণনার যুগ কায়েম হয়নি। বরং প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষের পষ্ট ভেদরেখা মুছে দিয়ে অপ্রত্যক্ষ বয়ানে প্রত্যক্ষের তাপ-ভাঁপ ছেনে তোলার যুগ শুরু হয়েছে। মজিদ মাহমুদ পরোক্ষ বর্ণনাতেই গেছেন। শরীরের বর্ণনার বদলে এনেছেন শরীরী প্রতিক্রিয়া। মনের নারীবাদ থেকেও নারী-পুরুষ চেনানোর কোনো কসরত করেননি কবি। আছে আকুতি। আকুতিটি পুরুষবাচক। অনেকক্ষেত্রেই শরীরী। সেখানে নারী আর পুরুষের দুই আলাদা পরিচয় আর ভূমিকা পষ্ট পড়া যায়। কিভাবে? ভাষার ময়দানে নারী আর পুরুষের আলাদা চিহ্নগুলো তো আর ব্যক্তি-কবি তৈয়ার করেন না। সামাজিক অভিজ্ঞতা আর ব্যবহারের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়। কবি এই ভাষায় পারঙ্গম। আর পাঠক সে ভাষার সঙ্গে সঙ্গত পরিমাণে পরিচিত। ফলে খেলা জমে যায়। মাহফুজা তার শরীরের সমস্ত ভাঁজে উন্মোচিত হতে থাকে। মাথার চুল থেকে পায়ের তালু পর্যন্ত। কামকলার আর্য-অনার্য সমস্ত কলায়। এমনকি যুগল রূপেও। সেই মূর্তিতে কামকাতর যুগলের আবেগে থরোথরো কম্পন শোনা যায়। শীৎকার শোনা যায়। তান আর সম আলাদা করে উপলব্ধি করা যায়। মাহফুজা এখানে বড্ড নারী দেহধারী পুরুষের পূজার আধার।
এ পর্যন্ত হলে মন্দ হত না। কিন্তু কবি মাহফুজার জন্য আরো বিশদ ভূমিকা বরাদ্দ করেন। নারী-পুরুষের যুগল সম্মিলনের অংশ হিসাবে মাহফুজাকে দেখে পাঠক যখন তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে থাকে, তখনই আবহটা সম্প্রসারিত হতে থাকে। পুরুষটি ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’য় রূপান্তরিত হয়। যেনবা হয়ে উঠতে চায় ‘পুরুষজাতি’। মঞ্চস্থ হতে থাকে একটি বহু-উচ্চারিত ছক অবাধ্য-উপাদেয় প্রবৃত্তির অনিয়ন্ত্রিত মূঢ়তায় প্রতিটি পুরুষ হয়ে উঠতে থাকে এক-একজন ‘কুবের’, ‘কপিলা’র ইশারার দাস হবে বলে। এখানে এই মাহফুজা আর এই কবি যথেষ্ট পুরুষতান্ত্রিক। যেনবা সংঘর্ষ আর শান্তির যুগল বৈপরীত্যে যাবতীয় শান্তির দায়দায়িত্ব মাহফুজাদের জন্য নিয়তিনির্দিষ্ট সত্য- সে শরীরী উত্তাপ হোক আর সম্পত্তি ও ভূমির ভাগবাটোয়ারার কোন্দল হোক। কিন্তু সত্য হল এই যে, পুরুষতন্ত্রের ছকে মাহফুজাকে সামান্যই পড়া যায়। তার অন্যতম কারণ, পুরুষতন্ত্রের ঔদ্ধত্য এই পুরুষ কবিটির মধ্যে একেবারেই নেই। এই ভক্ত-প্রেমিক-কামুক কবি যথেষ্ট বিবেচক। পুরুষতন্ত্রের ঔদ্ধত্য যে দুনিয়ার তাবত অস্তিত্বের জন্য হুমকি, এই সত্য যেন অপূর্ব সজ্ঞাবলে সে আগেই বুঝে নিয়েছে। এই যুদ্ধক্লান্ত দুনিয়া, পুঁজির ইশারায় গতি আর রূপপ্রাপ্ত এই দুনিয়া, এবং প্রকৃতির বুক বিদীর্ণ করে নষ্ট সভ্যতার রথ চালানো এই দুনিয়া যে পুরুষতন্ত্রের ভার বইতে বইতে ক্রমাগত নিঃশেষ হচ্ছে, এই উপলব্ধি কবিতাগুলোতে এত প্রত্যক্ষ যে, বিনয়ভাবের খাঁটিত্ব চিনে নিতে মোটেই বেগ পেতে হয় না।
এখানে উল্লেখ করা দরকার, মাহফুজামঙ্গলে, এবং অন্যত্রও, মজিদ মাহমুদের কবিতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রজ্ঞাজাত উপলব্ধি ও বাণীর সংস্থান। এই উচ্চারণভঙ্গির একটা সমস্যা হল, কার্যকারণসম্পর্ক বিশদ না করেই সিদ্ধান্ত বা মন্তব্যবাক্যটি উচ্চারিত হওয়ায় পাঠকের দিক থেকে বিচার-বিশ্লেষণের তুলনায় সহমত বা ভিন্নমত প্রকাশের অবকাশ বেশি তৈরি হয়। একই সঙ্গে এ কথাও সত্য, এই বৈশিষ্ট্য মজিদ মাহমুদকে কবি হিসাবে এক ভিন্ন জাতে উন্নীত করে। যাঁরা দেখান বা অনুভূতির বয়ান করেন তাঁদের তুলনায় এই কবির সাযুজ্য রচিত হয় ওইসব কবির সঙ্গে, যাঁরা জনগোষ্ঠীর ভাষার জোগান দেন। উপলব্ধি আর প্রজ্ঞার জোরেই মজিদ মাহমুদ পুরুষতন্ত্রের সরল কিন্তু শক্তিশালী ফাঁদ থেকে যথাসম্ভব মুক্ত থাকেন। এই মুক্তির আরেক কারণ, মাহফুজামঙ্গলে ‘আমি’ প্রায়শই ‘আমরা’য় রূপান্তরিত হলেও ব্যক্তি হিসাবে কবি নিজের আলাদা অস্তিত্ব একেবারেই ভুলে যান না। বিশেষভাবে মনে রাখেন নিজের কবিসত্তার কথা।’
একাধারে কবি, লেখক, গবেষক, সংগঠক, সাংবাদিক এবং শিক্ষাবিদ হিসেবে বহুমুখী কাজে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠ করে তুলেছেন স্বীয় সাধন প্রজ্ঞায় যিনি, বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য শিলালিপিতে সেই সফল সাধকের নাম মজিদ মাহমুদ। সকল শাস্ত্রের আকর হিসেবে স্বীকৃত সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে, মাধ্যমে নিরন্তর ও নিরলসভাবে নিয়োজিত মজিদ মাহমুদের জন্মদিনে আবারো জানাই নিরন্তর শুভেচ্ছা, সেই সাথে তাঁর জীবনানন্দময় সুস্থ ও সুন্দর আগামি দিনেরও প্রত্যাশা করি।

কবি মজিদ মাহমুদ : জন্মদিনের শুভেচ্ছাঞ্জলি

One thought on “কবি মজিদ মাহমুদ : জন্মদিনের শুভেচ্ছাঞ্জলি

  1. কবি মজিদ মাহমুদ এর ৫৬ তম জন্ম বার্ষিকী তে প্রান ভরে স্বরণ করছি স্যার কে..
    তিনি শুধু কবি,প্রাবন্ধিক ও গবেষক-ই নয়, তিনি তার নিজ জেলা পাবনা সহ পার্শ্ববর্তী আরও অনেক জেলার হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান এর সুযোগ করে দেয়া একজন মহৎ মানুষ!
    আজকের দিনটা ভরে উঠুক ভালবাসা আর উৎসাহে , আশা করছি সব প্রিয়জনেরা পাশেই আছে। জীবনে আরো উন্নতি ,সৌভাগ্য ,ঐশ্বর্য আসুক এই কামনাই করি।

    শুভ জন্মদিন 🎂❤️🎂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top
error: Content is protected!!
Share via
Copy link
Powered by Social Snap