জীবনবোধের অপূর্ব রূপায়ন : দীলতাজ রহমানের গল্পগ্রন্থ ‘ত্রসরেণু’

গ্রন্থ ধরণ- ছোটগল্প সংকলন
গ্রন্থের লেখক- দীলতাজ রহমান
গ্রন্থের মূল্য- ৩৫০ টাকা
প্রকাশক- দৃষ্টি
প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারি ২০২১

সামিনা বিপাশা

সামিনা বিপাশা গণিতের ছাত্রী, গণিতশাস্ত্রেই স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর করেছেন। বাংলা সাহিত্যের জন্য ভালোবাসা অগাধ।নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন লেখালেখির সাথে। কাব্যগ্রন্থ ‘খেয়ালের খেলাঘর’ এবং ‘শোনো! কথা কয় মনপাখি’ দিয়ে সাহিত্য জগতে বিচরণ শুরু। বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পে ছিলেন। এরপর প্রকাশিত হয়েছে গল্পগ্রন্থ ‘কারাভোগীর জবানবন্দি ও অন্যান্য গল্প’। জন্মগ্রহণ করেছেন প্রাচ্যের ড্যান্ডি নামে খ্যাত শীতলক্ষ্যা নদী পাড়ের নারায়ণগঞ্জ জেলায়, ১৯৮৮ সালে। শীতলক্ষ্যা নদীর হাওয়া জলেই তার লেখকসত্তা বিকশিত হয়েছে। লেখালেখি মিশে আছে তার প্রাণে।ব্যক্তিগত জীবনে গৃহিণী হলেও সাহিত্য বিষয়ক ফ্রিল্যান্সিং কাজ করেন।

পেঁপের ডালনা। নাহ, আমি রাঁধিনি। রেঁধেছেন শ্রদ্ধেয় কথাসাহিত্যিক দীলতাজ রহমান। এসময়ের নন্দিত শব্দশিল্পী দীলতাজ রহমান। শব্দের সাথে শব্দ মিশিয়ে নিপুণ হস্তে সৌন্দর্যের মশলায় লেখনীর মাধুর্য ছড়িয়ে তৈরি করেছেন এই গল্পটি- পেঁপের ডালনা। তাঁর লেখা অনেকটাই যেন পেঁপের ডালনার মতো। বিদঘুটে শোনালো? এরকম বলার কারণ অস্বাভাবিক কিংবা অকারণ নয়, বরং যুক্তিসঙ্গত! দীলতাজ রহমান খুব সহজ-সরল উপকরণ নিয়ে লেখা শুরু করেন, কিন্তু রকমারি মশলার চমৎকারিত্বে তাঁর গল্পগুলো শেষপর্যন্ত দারুণ স্বাদে-সৌন্দর্যে হাজির হয়। নিতান্তই সাধারণ পেঁপের ডালনা হয়ে যায় অতুলনীয় অমৃত।

‘ত্রসরেণু’ দীলতাজ রহমানের ২০২১ সালে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ‘দৃষ্টি’ প্রকাশনী। আটটি ছোটগল্পের এই সংকলনের প্রথম প্রকাশ ২০২১। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। বইটির মূল্য- ৩৫০টাকা।

ভূমিকাতে যা বললাম তা- ‘ত্রসরেণু’ গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প অর্থাৎ ‘পেঁপের ডালনা’ গল্পটি সম্পর্কে বলা । পেঁপের ডালনা পড়ে রীতিমতো থমকে যেতে হয়, এই গল্পের ডালপালায় পা রেখে ভাবনার সুতো বুনে বুনে চলে যেতে হয় বাস্তবতার এক দুর্বোহ চক্রে, কঠিন সময়ের প্রশ্নে মনে হয় বের হতে চাই- কিন্তু লেখনীর তেজে লেখিকা আরো জোরালো অনুভবে জাপটে ধরেন পাঠককে। এতো দারুণ করে একটি সাধারণ পরিবারের গল্প তুলে এনে জীবন বাস্তবতার কঠিন দুয়ারে দাঁড় করিয়েছেন পাঠককে, আবার তিনিই চামেলির হাতে সে দুয়ার খুলে পাঠককে ভারমুক্ত করেছেন।

‘পেঁপের ডালনা’ গল্পের খালার মতোই গল্পটি পড়ে বলতে ইচ্ছে করে, ‘খারাপ তো নাগে না রে মা! পিত্তিদিনই নতোন সোয়াদ নাগে।’ লেখিকা ‘ত্রসরেণু’ গল্পগ্রন্থের প্রত্যেকটি গল্পেও নতুন স্বাদ নিয়ে হাজির হয়েছেন। ‘দ্বিতীয় প্রেম’ গল্পটি পড়ে তাই ভাবনার সরল খাতা নতুন করে খুলতে হয়, প্রেমের গল্প বলতে এসে লেখিকা মানব জীবন পরিণতির এ কী বেদনাবিধুর গান শোনালেন, না-প্রেম ভারে না, তত্ত্বকথায়, নিয়তির পরিহাসে আকতারের মা, কখনো আকতারের দাদীর জন্য হু হু করে ওঠে মন।

দীলতাজ রহমান পেঁপের ডালনা রাঁধতে রাঁধতেই চলে যান ‘নদী থেকে সমুদ্র’ তে। গল্পগ্রন্থটিতে এটি তাঁর দ্বিতীয় গল্প। তার বয়ান, বাচনভঙ্গি এমনই। কোথা থেকে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে যায় যেন বোঝাটাই মুশকিল। তবে এই ভাসিয়ে নেওয়া স্রোত হৃদয়কে স্নাত করে, আর্দ্র করে সুখানুভূতির আতিশয্যে। তাঁর গল্প পাঠকের কাঁধে বোঝা হয়ে যায় না কখনোই, শুধুই সাবলীল বাক্যের মাধুর্যপূর্ণ ও ছন্দময় গতির কারণেই। ‘নদী থেকে সমুদ্র’ গল্পে মাতৃহৃদয়ের দারুণ ছবি এঁকেছেন তিনি- যা শুধুই অনাবিষ্কৃত কিন্তু চরম সত্য। উত্তম পুরুষে লেখিকার এই বয়ান পাঠককে পরিতৃপ্তই করবে।

[hfe_template id=’81’]

‘ত্রসরেণু’ গল্পগ্রন্থে রয়েছে আরও পাঁচটি গল্প। হোসনেয়ারা, অগ্নিবলয়, ত্রসরেণু, অমানিশার আলো, সুপ্ত মনের জাগর ধ্যান। ‘অগ্নিবলয়’ গল্প থেকে লেখিকার ভাষায়… ‘ কিন্তু নারী-পুরুষ, দুই জাতের কেউই বোধ হয় সে প্রতিশোধটা এই পড়ন্ত বেলায় এসে নিতে পারে না! কোথাও ক্ষমা নামক গুণটি শ্যাওলার মতো মানুষের কোথাও মনের ভেতরে না হলেও অসহায়ত্ববোধে এসে ঠেকে থাকে। শরীর-মন দুর্বল হলে তা-ই জোয়ারের মতো ফুলেফেঁপে ওঠে! আর তার নাম হয় ক্ষমা! জীবনটা তখন গোঁজামিলে বোঝাই ঠেকে বলেই হয়তো বোঝার ভারের নিচে সুকোমল সব বোধ চাপা পড়ে যায়!’ জীবনকে তিনি এভাবেই চেনেন, উপস্থাপন করেন গল্পের ভাঁজে বোধের-চেতনার নিদারুণ সুন্দরকে, যা অস্বীকার করে জীবনকে আলিঙ্গন করা অসম্ভব।

গল্পগ্রন্থটির নামগল্প ‘ত্রসরেণু’। এই গল্পে লেখিকা দীলতাজ রহমান নদী-সাহারার পথে বহমান করে শিহাবকে দিয়ে দেখিয়েছেন মানব জীবনের বাঁকে বাঁকে কতো গল্পের উৎসরণ! ত্রসরেণুর মতোই আলোর পথে উড়ে উড়ে জীবন নির্মোহ ত্রসরেণু হয়ে ওঠে কখনো, জীবনকে চিনতে হয় আলাদা করে, ভাবতে হয় নতুন করে। নারী-পুরুষের চিরন্তন সম্পর্কও অচেনা সুরে চেনা গানে নতুন করে বেজেছে এই গল্পে। সুনিপুণ হস্তে লেখিকা তাঁর মোটামুটি সব গল্পেই তুলে এনেছেন জীবনবোধের নিদারুণ সত্যকে, খুলেছেন মানবহৃদয়ে মনস্তাত্ত্বিক সব অলিগলি, আলোর চোখে দেখিয়েছেন দর্শনের নানা বাঁক।

‘অমানিশার আলো’ কাটিয়ে জীবনকে তাই নতুন করে ভাবতে হয়। তাঁর ‘অমানিশার আলো’ গল্পের মতোই ‘সুপ্ত মনের জাগর ধ্যান’ টানটান উত্তেজনায় রেখে পাঠককে নিয়ে যাবে বাস্তবতার নিগড়ে, থমকে যেতে হবে আবারও! ভাবতে হবে, এমনও হয়! হয় নাকি! অর্থাৎ তাঁর সবগুলো গল্পই পাঠককে তাড়িয়ে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে গল্পের গহীন অরণ্যে, কাঁটাতার-মায়াজালে বিদ্ধ হয়ে জীবনকে সত্য-বাস্তবতার চরম বোধে উপলব্ধি করে ফিরতে হবে পাঠককে। তবে দীলতাজ রহমানের বয়ান কোথাও কোথাও বাহুল্য দোষে দুষ্ট মনে হয় কিংবা কোন কোন ক্ষেত্রে লেখিকা একটু বেশিই প্রকাশিত হয়ে পড়েন যা লেখনীর একটু দুর্বলতা হিসেবেই ঠেকে। কিন্তু তিনি সরল-সহজ বাচনভঙ্গির গুণে পাঠককে আবারও ডেকে এনে গল্পের আসরে বসান, আচ্ছন্ন করেন সুন্দরের মূর্ছনায়।

ত্রসরেণু থেকেই আলো হয়ে ওঠা দীলতাজ রহমান এসময়ের পাঠকের অত্যন্ত প্রিয় লেখিকা। সমসাময়িক জীবনযাপন ঘিরে আধুনিকতার আবহে তৈরি করা লেখিকার গল্পে ঘোরগ্রস্ত হয়ে পুরো গল্পগ্রন্থটি একটানে সমাপ্ত করে তারপর উঠেছি।

দীলতাজ রহমানে লেখনী এমনই- দুর্বোধ্য আকর্ষণে পাঠককে টানে, মায়ার জালে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধে, যেন একান্ত মনের কথাটিই দীলতাজ রহমান বলতে জানে, সময়কে ছাড়িয়ে মানের মাপকাঠিতেও দাঁড়াতে পারে। তাঁর এবারের গল্পগ্রন্থ ‘ত্রসরেণু’ সংগ্রহ করলে ঠকে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই, বরং নিজেকে সমৃদ্ধ করা যাবে অনায়াসে। ‘ত্রসরেণু’ গল্পগ্রন্থের মতো পুস্তকের সম্ভার বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করবে। দীলতাজ রহমানের এবং তাঁর লেখনীর দীর্ঘায়ু কামনা করি।

সামিনা বিপাশা

জীবনবোধের অপূর্ব রূপায়ন : দীলতাজ রহমানের গল্পগ্রন্থ ‘ত্রসরেণু’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top
error: Content is protected!!
Share via
Copy link
Powered by Social Snap