গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী

সম্পাদক, ঝিনুক

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। স্পেনীয় ভাষায় তাঁর পূর্ণ নাম গ্যাব্রিয়েল খোঁসে দে লা কোঙ্কোর্দিয়া গার্সিয়া মার্কেস। কলম্বীয় সাহিত্যিক, সাংবাদিক, প্রকাশক ও রাজনীতিবিদ এবং ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জনকারী মার্কেস ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ বইয়ের লেখক হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। স্প্যানিশ ভাষায় লেখা মূল বইটির নাম ‘সিয়েন আনোস দে সোলেদাদ’- যা মূলত বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায় গ্রেগরি রাবাসার নিপুন ইংরেজি অনুবাদের জন্য। নামকরণ হয় One Hundred Years of Solitude. পরবর্তীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষায় এই বইটির অনূদিত হয়।

নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসটিতে মার্কেস এঁকেছেন বুয়েন্দিয়া নামের একটি পরিবারের কাহিনী। এই পরিবারের একজনের নেতৃত্বে একদল দুঃসাহসী অভিযাত্রী দক্ষিণ আমেরিকার গহীন এক জঙ্গলে বসতি স্থাপন করে। এভাবেই শুরু হয় আক্ষরিক অর্থে এক মহাকাব্যিক জগতের। একই সঙ্গে ভাগ্যের মদদপুষ্ট, অভিশাপলাঞ্ছিত এবং খামখেয়ালীর শিকার একটি অসাধারণ বংশের। সৃষ্টি হয় অভূতপূর্ব ঘটনা-দূর্ঘটনা পরম্পরার। উপন্যাসে রয়েছে অসংখ্য পাত্র-পাত্রী। এদের মধ্যে রয়েছে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার মতন অসাধারণ উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন ও দুঃসাহসী এক চরিত্র, যে নিজের জ্ঞানেই আবিষ্কার করে যে পৃথিবী গোল। বুয়েন্দিয়ার স্ত্রী উরমুলা ইগুয়ারান শতায়ু ও নিঃসঙ্গ এক নারী, যিনি সারা জীবন দুঃশ্চিন্তায় থাকেন তার বংশে শুয়োরের লেজবিশিষ্ট কারো জন্মের আশংকা রয়েছে বলে। সারা দুনিয়া ঘুড়ে বেড়ানো, বিদগ্ধ, রহস্যময় বেদে মেলকিয়াদেস একটি চরিত্র। আরেকটি চরিত্রে রেমেদিওস নামের অদ্ভুত সৌন্দর্যের অধিকারিণী এক অপার্থিব সুন্দরি রমণী। রেমেদিওস-এর প্রণয়াকাঙ্খীরা তার রূপের অনলে একের

‘পর এক বৃথা আত্মাহুতি দিয়ে চলে। রয়েছে বিশেষ এক চরিত্র কর্ণেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া যিনি প্রকাশ্য দিবালোকে ধীরে ধীরে উর্ধাকাশে উঠে মিলিয়ে যান অসীম শূন্যে। বত্রিশটি সশস্ত্র বিদ্রোহ সংগঠিত করে সব কয়টাতেই হেরে গিয়েছিলেন কর্ণেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া। যুদ্ধের পর তিনি অবসর ভাতা প্রত্যাখ্যান করেন। উপন্যাসের ঘটনা-দুর্ঘটনা, লৌকিক- অলৌকিকের কেন্দ্রবিন্দু মাকোন্দা নামের এক গ্রাম। এ গ্রামকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে উপন্যাসের প্রায় সব পাত্র-পাত্রীর ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিক ও বৈধ-অবৈধ যৌন-জীবন। এসব এক অদ্ভুত উপায়ে মিলেমিশে গিয়ে যে-জগতের সৃষ্টি করেছে তা একদিকে যেমন পাঠকের কাছে রীতিমতন আশ্চর্য আর অদ্ভুত বলে মনে হয়, তেমনি আবার তা নিতান্ত পরিচিতই অনুভব হয়। মনে হয়, এ-কাহিনী যেন মানব ইতিহাসেরই এক সুনিপুণ পুনোরুল্লেখ। যাদু-বাস্তবতার মিশেলে মার্কেসের সৃষ্ট চরিত্রগুলো আমাদের জানায় মানুষেরই উত্থান-পতনের গল্প। জানায় লক্ষ মানবের ভীড়ে মানুষের একাকীত্বের কাহিনী, প্রজন্মান্তরে নিঃসঙ্গতার গল্প আর মানুষের মৃত্যু, ক্ষুধা আর যৌনতার ইতিহাস। এভাবেই মার্কেস সৃষ্টি করেন এক অনন্য উপন্যাসের। সেই উপন্যাস প্রকাশের পর থেকেই পাঠকের মনোযোগ এবং ভালোবাসা অর্জন করে নেয় এবং বিশ্বব্যাপী ক্লাসিকের মর্যাদা লাভ করে। মূলত এই ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসটির জন্যেই ১৯৮২ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন মার্কেস।

কলম্বিয়ার সন্তান গার্সিয়া মার্কেস জীবনের বেশিরভাগ সময় বসবাস করেছেন মেক্সিকো এবং ইউরোপের বিভিন্ন শহরে। ম্যাজিক রিয়েলিজম বা জাদু বাস্তবতা, সাহিত্যের এমন এক মোহনীয় ধারার সাথে সারা পৃথিবীর মানুষকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেন মার্কেস। তাকে সময়ের গন্ডিতে বেঁধে ফেলা অসম্ভব, কারণ মোটে চল্লিশ বছর বয়েসে তিনি শতবছরের নিঃসঙ্গতাকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ঐন্দ্রজালিক বা পৌরাণিক, প্রেম বা অপ্রেম, দেখা বা অদেখা যাই হোক না কেন তার লেখাতে এমন এক মোহিনী শক্তি আছে যা পাঠককে ভাবনার এক অন্য জগতে প্রবেশ করায়। স্প্যানিশ ভাষায় তাঁর সাহিত্য, তাঁর জীবদ্দশাতেই বিশ্বসাহিত্যের সম্পদে পরিণত হয়েছে। চতুর্থ লাতিন আমেরিকান হিসেবে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেন মার্কেস।

মার্কেস পেশাগত জীবন শুরু করেন সাংবাদিকতা দিয়ে। সাংবাদিক হিসেবে রাজনীতি বিষয়ে বিশ্লেষণাত্মক কলাম ও গল্প লিখেছেন। লেখা শুরু করে প্রথমপর্বে পেশা হিসেবে লেখালেখি গ্রহণ করেননি। তাঁর উল্লেখযোগ্য ও সাড়া জাগানো কয়েকটি গ্রন্থের মধ্যে ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ (১৯৬৭), কলেরার দিনগুলোতে প্রেম (১৯৮৫), ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’ (১৯৮৫)। আরো রয়েছে চমৎকার কয়েকটি উপন্যাস ও গল্প। বলাবাহুল্য যে, কোনোটাকে ছাড়িয়ে কোনো সৃষ্টিকে শ্রেষ্ঠ বলা মুশকিল।

মার্কেসের জন্মস্থান কলম্বিয়ার আরাকাটকা গ্রামে। শৈশবেই তাঁর পিতা ব্যারেনকুয়াতে স্থানান্তরিত হন, সেখানে ওষুধ ব্যবসা শুরু করেন। পিতামাতা বিচ্ছিন্ন মার্কেসের জীবনের শৈশব ও কৈশোরে তাঁর পিতামহ গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। বলা যায়, পিতামহের দীক্ষা ও আদর্শে তিনি বিকশিত হন। তিনি নিজেও অনেকবার বক্তব্যে, সাক্ষাৎকারে তা উল্লেখ করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন একজন চৌকস গল্পকথক। তিনি আগ্রহ নিয়ে পিতামহের কাছ থেকে গল্প শুনতেন। উল্লেখ্য, পিতামহের কাছে শোনা গল্পই তিনি তাঁর উপন্যাসে, গল্পে কাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত করে নিয়েছিলেন।

[hfe_template id=’81’]

ঠাকুরদা’র গল্প বলার বিষয়বস্তু, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, চিন্তা ও আদর্শ তাঁকে ভীষণভাবে লেখার ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত করে। তা-ই তিনি গল্পে, উপন্যাসে রূপ দিতে চেষ্টা করেছেন। শৈশবেই মার্কেস ঠাকুরমার কাছে শুনেছেন রূপকথা ও লোককথার গল্প। তিনি এখান থেকেই জাদু, রহস্যমূলক গল্প বুননের শক্তি অর্জন করেছেন। তিনি যেন এক গল্পের পরিসরেই বিকশিত হয়েছিলেন। এই পরিসর তাঁর জীবন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই পারিবারিক গল্পের আসরে মার্কেস যা শুনেছেন, তা থেকেই ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের কাহিনীসূত্র বা উৎসবীজ পেয়েছেন।

Love in the Time of Cholera

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সেরা কাজের প্রসঙ্গ উঠলেই সাহিত্যবোদ্ধাগণ One Hundred Years of Solitude এর পর Love in the Time of Cholera বা ‘কলেরার দিনগুলোতে প্রেম’ উপন্যাসটির কথা উল্লেখ করে থাকেন। বইটি ১৯৮৫ সালে স্প্যানিশে প্রথম প্রকাশিত হয়। ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ পায় তারও তিন বছর পর। ২০০৭ সালে এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয় একই নামে। মার্কেস স্বীকার করেছেন, তাঁর ব্যক্তি জীবন থেকেই এ গল্পের সূচনা। ‘লাভ ইন দি টাইম অব কলেরা’ প্রকাশের পর ১৯৮৮ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে মার্কেসের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। মেক্সিকো শহরে নিজ বাসভবনে বসে উপন্যাস লেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে অন্তরঙ্গ সেই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন : “এই উপন্যাস রচনা ছিল আসলেই একটি আনন্দের ব্যাপার। এটি দীর্ঘতর হতে পারত কিন্তু আমাকে এক পর্যায়ে রাশ টেনে ধরতে হয়েছে। পরস্পরকে ভালোবাসে এমন দুজনের জীবন নিয়ে বলার থাকে বহু কিছু- যা কখনও শেষ হবে না। উপন্যাসের পরিণতির বিষয়টি আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। কারণ এই উপন্যাসের সমাপ্তিটি একটি সমস্যাই ছিল বটে। বইয়ের প্রধান দুই চরিত্রের একজন বা উভয়কে মেরে ফেলার পক্ষে আমি ছিলাম না। বরং তারা যদি এভাবেই ভালোবেসে জীবনটা পার করে দিচ্ছে এই অবস্থায় শেষ টানা যায় ব্যাপারটা হবে ভীষণ চমৎকার। শুধু বাকি জীবন নয় বরং প্রেমের তরী চলতে থাকে অনাদিকাল”

এ উপন্যাসটি ছাড়াও মার্কেসের অন্যান্য উপন্যাস এবং ছোটগল্প থেকে থিয়েটার এবং চলচ্চিত্রে কাজ হয়েছে বহুবার। উল্লেখ করা প্রয়োজন, The Blue Lobster চলচ্চিত্রের পরিচালক ছিলেন স্বয়ং মার্কেস। তবে মার্কেস মনে করতেন, The Autumn of the Patriarch তাঁর সেরা কাজ। ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত এ উপন্যাসে তিনি এক ক্যারিবিয় একনায়ক শাসকের কাহিনি বর্ণনা করেছেন। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘এল ওতোনো দেল প্যাত্রিয়ার্কা’ উপন্যাসটি স্প্যানিশ ভাষায় প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। মূল স্প্যানিশ থেকে ইংরেজি ভাষায় ১৯৭৬ সালে অনুবাদ করেন গ্রেগোরি রাবাসা ‘দ্য অটাম অফ দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ নামে। কাহিনীর মূল নায়ক এক গোত্রপিতা এবং একটি রাষ্ট্রের একনায়ক যিনি দেশটি শাসন করে চলেছেন ২০০ বছর ধরে। এই গোত্রপিতার পরিচয় কি? ক্যারিবীয় উপকূলে একটি দরিদ্র দেশের পাহাড়ি এলাকার এক যাযাবর পাখিওয়ালী বেনদিসিয়ো আলভারাদোর গর্ভে জন্ম নেয়া বিবাহ বহির্ভূত সন্তান সে। এই গোত্রপিতা কখনো স্কুলে যেতে পারেন নি দারিদ্র্যের কারণে, অথচ তিনিই কালক্রমে হয়ে ওঠলেন দেশটির একনায়ক স্বৈরশাসক। রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহনকালে জনৈক রেড ইন্ডিয়ান ভবিষ্যদ্বগণনাকারিণী তাঁকে বলেছিলেন ১০৭ হতে ২৩২ বছর পর্যন্ত তিনি অআয়ু পাবেন। সে অনুযায়ী জেনারেল অনন্তকাল বেঁচে থেকে তার শাসনকাজ অব্যাহত রাখেন। তিনি অসুখের নিরাময়কারী, ভূমিকম্প, বন্যা ও মহামারীর সংশোধনকর্তা আর তাঁর হাত থেকেই রাষ্ট্রের যত অন্ধ, খোঁড়া ও কুষ্ঠরোগীরা সুস্থ হবার জন্য লবণ নেয়। তাঁর হারেমে এক হাজার উপপত্নী জেনারেলর ঔরসে তাদের সাড়ে সাতমাস বয়সী দেখতে বামুন সন্তানদের নিয়ে বাস করে যেহেতু জেনারেলের কোন সন্তানই স্বাভাবিক মানব সন্তানের চেহারা ও বৃদ্ধি নিয়ে জন্মায় না। অসংখ্য হত্যাপ্রচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করেছেন জেনারেল, দু’হাজার শিশুকে ডিনামাইটের তোপে সমুদ্রে উড়িয়ে দিতে তাঁর মুহূর্তের দ্বিধা হয়নি, দেশের যে-কোনো বয়সের যে-কোনো নারী বা কিশোরীকে যখনি চেয়েছেন সম্ভোগ করেছেন বলপ্রয়োগে, ক্ষমতার সম্ভাব্য সমস্ত প্রতিদ্বন্দ্বীকে তিনি হত্যা করেছেন।

[hfe_template id=’81’]

যাদুকরী বাস্তববাদের অধীশ্বর বলে খ্যাত গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সৃষ্ট গল্পসমূহ পাঠকের কল্পনার জগতকে শক্তিশালী করে তোলে। অবিস্মরণীয় চরিত্র চিত্রণে এবং দুর্দান্ত গদ্যে রচিত তাঁর গল্পগুলি পাঠককে এমন এক জগতে নিয়ে যায় যা একই সাথে কাল্পনিক এবং বাস্তব উভয়ই। ‘দ্য অটাম অফ দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ মার্কেসের অন্যতম জটিল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি উপন্যাস যা ক্যারিবীয় জনৈক অত্যাচারী এবং ক্ষমতাশালী স্বৈরশাসকের দুর্নীতির এক অভিনব গল্প। উদ্ভাবনী ও স্বপ্নময় রীতির বর্ণনায় লেখা উপন্যাসটিতে প্রতীকী বর্ণনা যেন উপচে পড়েছে কারণ এক মরণশীল অত্যাচারী স্বৈরশাসকের নিজের সৃষ্ট শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ার বয়ান প্রাণবন্তভাবে চিত্রিত করেছেন মার্কেস। দাতব্যতা থেকে শুরু করে প্রতারণা, সহিংসতা, ঈশ্বরের ভয় থেকে চরম নিষ্ঠুরতায় সেই একনায়ক একসাথে সর্বোত্তম এবং মানব প্রকৃতির সবচেয়ে খারাপ এক সৃষ্টি। গাবো তার দুর্দান্ত এই উপন্যাসে একজন স্বৈরশাসকের অন্ধকারাচ্ছন্ন মানসিকতার বিভিন্ন দিককে ফুটিয়ে তোলার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছেন। নিশ্চিত হয়ে বলা যায় যে উপন্যাসের ছয় পর্বে বিন্যস্ত কাহিনি বীভৎস মানসিকতার একজন স্বৈরশাসকের মনের ভিতরে বিরাজ করা সবচেয়ে অন্ধকার দিকগুলোর বিষয় বয়ান করেছে।সাহিত্যবোদ্ধাগণ মনে করেন, এ স্বৈরশাসককে কলম্বিয়ার কুখ্যাত স্বৈরশাসক জেনারেল গুস্তাভো রোহাস পিনিয়ার আদলে রূপায়িত করতে চেয়েছিলেন মার্কেস। ফলশ্রুতিতে, মার্কেসকে স্বেচ্ছায় নিজের দেশ ত্যাগ করতে হয়েছিল।

কিউবার সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রনায়ক ফিদের ক্যাস্ট্রোর ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন মার্কেস। কলম্বিয়ার বামঘেষা রাজনীতির সাথে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। এই অভিযোগে বহুবছর যাবৎ তাঁকে ভিসা দেয়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন মার্কেসের লেখার একজন গুণগ্রাহী পাঠক ছিলেন। অবশেষে ক্লিনটন প্রশাসন নব্বইয়ের দশকে মার্কেসের উপর থেকে এই অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।

ক্ষমতার করতলে সাধারণ মানুষ অসহায়, তাই নৈমিত্তিক প্রয়োজন ও সমস্যাগুলো তাদের মুখ ফুটে প্রকাশিত হয় না। লাতিন আমেরিকায় নিজের কষ্টের প্রসঙ্গ কিংবা জাতীয় কোনো সংকটের কথা উচ্চারণ করতে পারতো না জনগণ। এরূপ সংকটে মানুষের প্রয়োজনীয় কথা প্রকাশ না করতে পারার বিষয়টি তিনি চাক্ষুষ করেছেন। অবরুদ্ধ অবস্থার গল্প ও মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামমুখর জীবনের কাহিনী শুনেছেন। এরপর তিনি প্রকাশ বা প্রতিবাদের ধরন খুঁজে পেয়ে শেষ পর্যন্ত নিজস্ব একটি ভঙ্গি নির্মাণ করতে পেরেছিলেন।

১৯৮২ সালে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সময় সুইডিশ একাডেমি মন্তব্য করেছে যে, “তাঁর প্রতিটি নতুন গ্রন্থের প্রকাশনা বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মতো”। মার্কেসের লেখার বৈশিষ্ট্য এই ‘জাদুবাস্তবতা’ কেমন- এ সম্পর্কে বলা হয় :
“Magical realism expands the categorizes of the real so as to encompass myth, magic and other extraordinary phenomena in Nature or experience which European realism excluded.”

ম্যাজিক রিয়ালিজমধর্মী সাহিত্যের প্রচুর বিরোধিতাও রয়েছে। যখন সাহিত্যে মোড় পরিবর্তন ঘটছিল তখন নিজের নামের আগে উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশেষণসহ ম্যাজিক রিয়ালিজমের আবির্ভাব ঘটে। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের সাহিত্যে ঔপনিবেশিকতার গুরুত্ব বেশি ছিল। পশ্চিমা সংস্কৃতি অন্যান্য ভাষার সাহিত্যের বিপরীতে তাদের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে তৎপর ছিল। ফলে, ম্যাজিক রিয়ালিজম এইসময় পশ্চিমা প্রভাবের বিরূদ্ধে দাঁড়ায়। কেউ কেউ মনে করেন এই লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য এই টার্মটি আনা হয়েছে। ম্যাজিক রিয়ালিজমের কিছু উপাদানকে সমাজের সমালোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমালোচনা করতেও দেখা গেছে।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস জীবনের শেষ দুই যুগ ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচেছিলেন। এ সময় তিনি লেখালেখি কম করেন। দুরারোগ্য লিম্ফেঠিক ক্যান্সারে তিনি ভুগছিলেন। ২০১২ সালের জুলাই থেকে তিনি স্মৃতি বিনষ্টিতে আক্রান্ত হন। মার্কেস ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ এপ্রিল মেক্সিকো শহরে ৮৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বিশ্বসাহিত্যে ‘মার্কেস পর্বের’ যবনিকাপাত হয়। তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল জন্মভূমি কলম্বিয়ায়। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানু্য়েল স্যান্টোস শোকবার্তায় বলেন, তাঁর মৃত্যুতে কলম্বিয়া আজ ‘শতবর্ষ ব্যাপী নিঃসঙ্গতা এবং বিষাদে’ আক্রান্ত। তিনি মার্কেসকে ‘শত বছরের শ্রেষ্ঠ কলম্বিয়ান’ হিসেবে ঘোষনা করেন। মৃত্যুকালে মার্কেস একটি অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি রেখে গিয়েছেন।

… …

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী

বিজ্ঞাপন, চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র নির্মাণ, আবৃত্তি, অনুবাদ ও সম্পাদনার পাশাপাশি মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী একজন পরিব্রাজক; দেশের আনাচে কানাচে তার অবারিত বিচরণ। জন্ম ১৯৭৭ সালের ১১ এপ্রিল সরকারি চাকুরে পিতার কর্মস্থল মাদারিপুরের কালকিনি থানা এলাকায়।
শৈশব কৈশোর যৌবনের অনেকখানি কেটেছে মাতুলালয়, নড়াইলের কালিয়ায় এবং পিতার কর্মস্থল দেশের বিভিন্ন জায়গায়। বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর অথচ ব্যক্তিগত পাঠাভ্যাসের ক্ষেত্রে প্রাচীন ইতিহাসের অলিগলিতে তার স্বচ্ছন্দ বিচরণ। ছাত্রজীবনেই ছবি আঁকা, থিয়েটার,আবৃত্তি ও সাহিত্য চর্চা শুরু। লিটল ম্যাগ সম্পাদনা ও দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় ফিচার লিখে আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু। ভারতবর্ষে ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্লভ গ্রন্থ ‘চাচনামাহ্’-এর প্রথম ও পূর্ণাঙ্গভাবে অনুবাদ তার হাতে। শিল্প-সংস্কৃতি-প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক অসংখ্য তথ্যচিত্রের নির্মাতা। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের উপযোগী সম্প্রতি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের নির্মাণ শেষের পর্যায়ে। ভ্রমন ভালো লাগে তাই ব্যাগ ও বাহন সবসময় তৈরী। সময় পেলেই, পাহাড়, সমুদ্র, নদীর সাথে দেখা করতে বেরিয়ে পড়েন।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

One thought on “গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top
error: Content is protected!!
Share via
Copy link
Powered by Social Snap