চির জীবিতদের দলে কবি শঙ্খ ঘোষ

কবি শঙ্খ ঘোষ

শঙ্খ ঘোষের কবিতার স্বতন্ত্র ভাষারীতি, শব্দচয়ন, চিত্রকল্প, প্রতীক, ছন্দ-অলঙ্কার প্রয়োগনৈপুণ্য, লোকচেতনা, মিথ-পুরাণ-রূপকথার ব্যবহার প্রভৃতি কবির শিল্পীসত্তার সঙ্গে তাঁর নির্মাণশৈলীর সৌকর্যকে উপস্থাপন করে। পৃথিবীর নান্দনিক শিল্পভাষ্য শঙ্খ ঘোষের কবিতায় চিত্রিত হয় ভাষার সাবলীল বুননের মাধ্যমে। বাকচাতুর্য ও বাকবৈদগ্ধ্য তাঁর কবিতায় সাধারণত অনুপস্থিত থাকে। এগুলোর পরিবর্তে কবিতার ভাষায় হালকা চালের সুর তথা ছড়ারীতিসহ ঠাট্টা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ বা শ্লেষাত্মক ভঙ্গি ব্যবহার করেন। তবে তা প্রায় সর্বাবস্থায় সরল; জটিল ও আড়ম্বরপূর্ণ নয়। সহজ ভাষায় উপস্থাপনের মাধ্যমে তাঁর কবিতা অনুভূতির জটিলতায় পৌঁছায়। অর্থাৎ কবিতার ভাষা সরল হলেও ভাবটা জটিল এবং বহুমাত্রিক। কবিতার ভাষা প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন : “সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়… তখন যেটা বলতে চেয়েছিলাম তা হল নানা রকমের চমৎকৃতি থেকে বেরিয়ে আসার কথা। শব্দের ভার, ছবির জৌলুস, ছন্দের দোল এসব থেকে নিজেকে যথাসম্ভব সরিয়ে নেওয়ার কথা। দৈনন্দিন কথাবার্তার চাল, তার শ্বাসপ্রশ্বাস,যথাসম্ভব তার কাছাকাছি থেকে বলা। এসবকে বলেছিলাম সহজ। কিন্তু তার থেকে যে অনুভূতিটা পৌঁছায় তাতে হয়তো অনেক জট-জটিলতা থাকতে পারে। আসলে, ভাষার বা কথার নানা রকমের তল তৈরি হতে থাকে তখন। একদিকে সহজ সীমায় সময়টাকে ধরে রাখতে পারে যে ভাষা, সে কিন্তু অন্যদিকে আবার গড়িয়ে যেতে পারে অনেক দূরে।”

শঙ্খ ঘোষ পঞ্চাশের দশকের কবিকুলের মধ্যে অন্যতম বর্ষীয়ান কবি। তবে পঞ্চাশের কবি হলেও মানসিকতা ও জীবনদর্শনের দিক থেকে তিনি অনেকটাই স্বতন্ত্র। তাঁর কবিতার নিয়ন্ত্রক ব্যাক্তিস্বর হলেও সমাজ সেখানে প্রাণবন্ত বাস্তব। প্রতিবাদ তাঁর অনায়াস ভুবন, মনে হয় ব্যক্তিময়তা এবং সমাজচৈতন্যের বিরুদ্ধতার ধারণায় তাঁর আস্থা ছিল না। বরং তিনি মনে করেন, এদের মধ্যেও আবিষ্কার করা যায় গহন সম্পর্কের সূক্ষ্ম সুতো। নিজস্ব সৃষ্টিতে এরই সুচারু সমন্বয়ে তিনি সর্বত্র তৎপর ছিলেন।
কাব্য সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাসের উত্তরসূরী শঙ্খ ঘোষ -এর আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। তার পিতা মনীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং মাতা অমলা ঘোষ। তিনি বাংলাদেশের বর্তমান চাঁদপুর জেলায় ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। বংশানুক্রমিকভাবে পৈত্রিক বাড়ি বাংলাদেশের বরিশাল জেলার বানারিপাড়া গ্রামে। শঙ্খ ঘোষ বড় হয়েছেন পাবনায়। পিতার কর্মস্থল হওয়ায় তিনি বেশ কয়েক বছর পাবনায় অবস্থান করেন এবং সেখানকার চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৫১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলায় কলা বিভাগে স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি বঙ্গবাসী কলেজ, সিটি কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯২ সালে অবসর নেন। ১৯৬০ সালে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে আইওয়া রাইটার্স ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেন। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, শিমলাতে ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ আডভান্স স্টাডিজ এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেন।


১৯৭৭ সালে বাবরের প্রার্থনা কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার পান শঙ্খ ঘোষ। ‘ধূম লেগেছে হৃৎকমলে’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৮৯ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার পান তিনি। ১৯৯৯ সালে কন্নঢ় ভাষায় লেখা নাটক অনুবাদের জন্য দ্বিতীয়বার সাহিত্য অ্যাকাডেমি সম্মান পান তিনি। ১৯৯৯ সালে দেশিকোত্তম সম্মানে ভূষিত করা হয় তাঁকে। ২০১১ সালে পান পদ্মভূষণ সম্মান। ২০১৬ সালে পান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার।

[hfe_template id=’81’]

চির জীবিতদের দলে কবি শঙ্খ ঘোষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top
error: Content is protected!!
Share via
Copy link
Powered by Social Snap