সত্যজিৎ রায় : সেলুলয়েডের মহাকবিকে সেলাম

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী

সম্পাদক, ঝিনুক

১৯৯২ সালের মে মাসে আমার মা, আমি এবং আমার সহোদর কলকাতায় বেড়াতে যাই। তখনকার টগবগে তরুণ আমার ছোট মামা ছিলেন আমাদের গাইড। প্রচণ্ড গরমে নাভিশ্বাস ওঠার মতো তখনকার কলকাতার তাপমাত্রা। মনে আছে সে সময় দ্বিতীয় হুগলী সেতুর উদ্বোধন করার কথা ছিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কমরেড জ্যোতি বসুর। দূরদর্শনের বাংলা চ্যানেলে ওই সময়টিতে সত্যজিৎ রায় নির্মিত অনেকগুলো চলচ্চিত্র টেলিকাস্ট করা হচ্ছিল। এর কয়েকদিন আগেই হৃদযন্ত্রের জটিলতা নিয়ে অসুস্থ অবস্থায় চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণের দিনটি ছিল ২৩শে এপ্রিল। ‘সত্যজিৎ রায়’। নামটিই যেন বিরাট এক ফ্যান্টাসি তখন আমার কাছে। স্বল্প পরিচয়ের সূত্রে জনৈক সত্যজিৎ ভক্তের সঙ্গে তখন আমার আলাপ হয়। তার কাছেই জানতে পারি ‘বেলভিউ নার্সিং হোমে’ তিনি সত্যজিৎ রায়কে দেখতে গিয়েছিলেন এক সাংবাদিক বন্ধুর সাথে। ভদ্রলোকের সাংবাদিক বন্ধু গিয়েছিলেন হাসপাতালের বিছানায় থেকে সদ্য অস্কারপ্রাপ্ত সত্যজিৎ রায়ের সংবাদ সংগ্রহ করতে। আমার কাছে এসব গল্প রূপকথার মতো মনে হচ্ছিল। পরে জেনেছি মৃত্যুর কিছু সপ্তাহ আগে অত্যন্ত অসুস্থ ও শয্যাশায়ী অবস্থায় তিনি তাঁর জীবনের শেষ পুরস্কার একটি সম্মানসূচক অস্কার গ্রহণ করেছিলেন। হাসপাতালে ভর্তির পর সে অবস্থা থেকে সত্যজিৎ রায়ের স্বাস্থ্য আর ভালো হয় নি। ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল সেলুলয়েডের মহাকবি, বাংলা চলচ্চিত্রের চিরদিনের গর্ব, শক্তিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় অবশেষে মৃত্যুকেই শ্যামসম আলিঙ্গন করেন।

প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্রকার হিসেবে সত্যজিৎ রায় বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার ‘অস্কার’ জিতে নেন। পরিচালনাসহ চলচ্চিত্রের বিভিন্ন শাখায় অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯১ সালে অস্কার কমিটি তাঁকে আজীবন সম্মাননা পুরষ্কার প্রদান করে। তাঁর নির্মিত অসংখ্য চলচ্চিত্র কান চলচ্চিত্র উৎসব, ভেনাস চলচ্চিত্র উৎসব, বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব সহ বিশ্বের নামীদামি চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে প্রদর্শিত হয় ও পুরস্কার জিতে নেয়। বিখ্যাত অপু ট্রিলজি (পথের পাঁচালি, অপরাজিত, অপুর সংসার) তাঁর অমর সৃষ্টি। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সিনেমার যে কোনও তালিকায় অপু ট্রিলজিকে খুঁজে পাওয়া যায়। অপু ট্রিলজির প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালি’ ১৯৫৬ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ‘হিউম্যান ডকুমেন্ট প্রাইজ’ লাভ করে।

বিবিসি বাংলার জন্য একবার সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন কবি সৈয়দ শামসুল হক। সে প্রসঙ্গে কবি সৈয়দ হক বলেছিলেন, “বিশ্বসাহিত্যের দরবারে বাংলা সাহিত্যকে স্থাপন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, বিশ্ব চলচ্চিত্রে বাংলা চলচ্চিত্রকে সত্যজিৎ রায়। বাংলা ও বাঙালির সুর ও অস্তিত্বের অনুভবকে তারা দুজনেই বিশ্বধারায় যোগ করে দিতে পেরেছিলেন। ফলে তাদের রচনা পরে বিশ্বসাহিত্য বা চলচ্চিত্রও আর আগের মতো থাকে না, হয়ে ওঠে অধিক ধনী। রবীন্দ্রনাথের মতো সত্যজিৎও ছিলেন সব্যসাচী। সত্যজিৎ চলচ্চিত্রের মতো সমবায়ী শিল্পের প্রধান প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের হাতে কাজ করেছেন। ফলে তার চলচ্চিত্র সর্ব অর্থে তারই করোটির সন্তান। আবার চলচ্চিত্র শুধু নয়, ব্যবহারিক শিল্পের ক্ষেত্রেও বঙ্গভূমে তিনি এনেছেন বিপ্লব বইয়ের প্রচ্ছদ, অলংকরণ, বাংলা হরফের রূপ নির্মাণ ও বিন্যাস রচনায়। ইংরেজি নতুন হরফ রূপ তিনি রচনা করেছেন রে-রোমান; লিখেছেন শিশু ও কিশোরদের জন্য কালজয়ী গল্প ও উপন্যাস এবং পরিমাণে খুব সামান্য হলেও বড়দের জন্যে অসাধারণ কিছু রচনা। আর চলচ্চিত্র সমালোচক ও তাত্ত্বিক হিসেবে তো তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠদের একজন।”

সত্যজিৎ রায় বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক। কলকাতা শহরে সাহিত্য ও শিল্পের জগতে খ্যাতনামা এক বাঙালি পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটা ছিল বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া গ্রামে। তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সত্যজিতের কর্মজীবন একজন বাণিজ্যিক চিত্রকর হিসেবে শুরু হলেও প্রথমে কলকাতায় ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা জঁ রেনোয়ারের সাথে সাক্ষাৎ ও পরে লন্ডন শহরে সফররত অবস্থায় ইতালীয় নব্য বাস্তবতাবাদী চলচ্চিত্র ইতালীয় ভাষায় ‘লাদ্রি দি বিসিক্লিত্তে’ (বাইসাইকেল চোর) দেখার পর তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্বুদ্ধ হন।

[hfe_template id=’81’]

সামান্য কিছু যন্ত্রপাতি এবং সাধারণ কয়েকজন অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে পরিচালক শুরু করলেন চলচ্চিত্রটির শ্যুটিং। কিছু কাজ করার পর শেষ হয়ে গেলো সব অর্থ। বাধ্য হয়ে স্ত্রীর গহনা বন্ধক দিয়ে এবং নিজের দামি বইপত্র বিক্রি করে পুনরায় শুরু করলেন শ্যুটিং। কিন্তু তাতেও শেষ হলো না কাজ। নতুন পরিচালকের পেছনে অর্থলগ্নি করতে রাজি নন কেউ। যাই হোক, অনেক কষ্টে পুনরায় অর্থ জোগাড় করে শেষমেশ চলচ্চিত্রটি সম্পন্ন করা হল। আজ পর্যন্ত সর্বজনস্বীকৃত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্রটির তৈরির পেছনের গল্পটি ঠিক এমনই। প্রথম পর্যায়ে একেবারেই নতুন পরিচালকের এই চলচ্চিত্রটি ভালোভাবে গ্রহণ করেন নি কলকাতার দর্শকরা। কিন্তু ধীরে ধীরে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের নির্মাণশৈলী এবং পণ্ডিত রবিশংকরের অসাধারণ সংগীতের সমন্বয়ে তৈরি এই চলচ্চিত্রের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে শুরু করে ভারতবর্ষ তথা সমগ্র বিশ্ব। ১৯৫৬ সালের কান ফিল্ম ফেস্টিভালে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতে নেয় এই চলচ্চিত্র। আর এভাবেই বিশ্বচলচ্চিত্রের বিশাল জগতে দাপুটে আবির্ভাব ঘটে এক কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকারের।

সত্যজিৎ রায়ের জন্ম ১৯২১ সালে বিখ্যাত রায়চৌধুরী বংশে। তৎকালীন বাংলায় মেধা-মননে কেবল জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের সাথেই তুলনা চলে এই রায়চৌধুরী পরিবারের। পিতামহ উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, পিতা সুকুমার রায়, পিসী লীলা মজুমদার- প্রত্যেকেই ছিলেন স্বনামধন্য সাহিত্যিক। রবীন্দ্রনাথের সাথে রায় পরিবারের বিশেষ হৃদ্যতা ছিল। ফলে সত্যজিতের মা চেয়েছিলেন যে তাঁর ছেলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করুক। যদিও সত্যজিৎ কলকাতার মায়া ত্যাগ করে শান্তিনিকেতনে যেতে প্রথম দিকে অনাগ্রহ দেখিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত মায়ের উৎসাহে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতনে যান এবং সেখানকার কলাভবনে ভর্তি হন। এই সূত্রে তিনি বিখ্যাত চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসু এবং বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায়ের কাছে শিক্ষালাভের সুযোগ পান। নিয়মানুযায়ী বিশ্বভারতীতে সত্যজিতের পাঁচ বছর পড়াশোনা করার কথা থাকলেও সময়ের আগেই তিনি কলকাতায় চলে আসেন। মূলত ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় জাপানিরা বোমাবর্ষণ করে। এই সময় তিনি শান্তিনকেতন থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন। এরপর আর শিক্ষার জন্য শান্তিনিকেতন যান নি।

১৯৪৮ সালে কয়েক মাসের জন্য ইংল্যান্ডে যান সত্যজিৎ রায়, তখন তার বয়স মাত্র ২৭। সেই সময়েই তিনি তৎকালীন ইউরোপ -আমেরিকার বিখ্যাত চলচ্চিত্রকারদের নির্মিত অসংখ্য চলচ্চিত্র দেখেন একের পর এক। তখনই মনে মনে এঁকে ফেলেন বড় মাপের চলচ্চিত্রকার হওয়ার স্বপ্ন। এরই ফলে ১৯৫৫ সালে মুক্তি পায় বিভূতিভূষণের কালজয়ী উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ অবলম্বনে তৈরি বাজিমাত করা চলচ্চিত্রটি। মূল উপন্যাসের সুর এতো নিখুঁতভাবে অনুসরণ করে যে এত উঁচু মাপের চলচ্চিত্র তৈরি করা সম্ভব, তা বেশ ভালোভাবেই প্রমাণ করলেন সত্যজিৎ রায়। এই ছবিটির সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি একে পরিণত করেন অপু ট্রিলজিতে, যার সর্বশেষ দুই সংযোজন ‘অপরাজিত’ এবং ‘অপুর সংসার’। এরপর কেবল একের পর এক দিগ্বিজয়ের ইতিহাস। সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রবল আগ্রহ ছিল সত্যজিৎ রায়ের। একের পর এক তিনি চলচ্চিত্রে রূপদান করেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘দেবী’, রাজশেখর বসুর ‘পরশপাথর’, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জলসাঘর’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে বাইরে’ এবং ‘নষ্টনীড়’ (চারুলতা), সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ এবং ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, হেনরিক ইবসেনের ‘গণশত্রু’ (এন এনিমি অব দ্য পিপল), শংকরের ‘জন-অরণ্য’, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চিড়িয়াখানা’।

সত্যজিৎ রায়ের আরও দুটি অমর সৃষ্টির কথা বলা আবশ্যক -একটি হচ্ছে তাঁর পিতামহ উপেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরীর অমর সৃষ্টি গুপি গাইন-বাঘা বাইন অবলম্বনে তৈরি তৎকালীন বাংলা চলচ্চিত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার ছবি ‘গুপি-বাঘা ট্রিলজি’ (গুপি গাইন বাঘা বাইন, হীরক রাজার দেশে, গুপি বাঘা ফিরে এলো)। এর মধ্যে প্রথম দুটি চলচ্চিত্র পরিণত হয়েছিল রীতিমতো ব্লকবাস্টারে। আরেকটি অমর সৃষ্টি হচ্ছে তার নিজের তৈরি কালজয়ী চরিত্র ‘ফেলুদা’কে চলচ্চিত্রে রূপদান (সোনার কেল্লা এবং জয় বাবা ফেলুনাথ)।

চলচ্চিত্রে সংগীতের ব্যবহারে সত্যজিৎ রায় ছিলেন অনন্য। তাঁর প্রথম দিককার চলচ্চিত্রে পণ্ডিত রবিশংকরের সংগীত পরিচালনা দিয়েছিল অনন্য এক মাত্রা। পরবর্তীতে সত্যজিৎ দেখান তাঁর নিজের সঙ্গীতজ্ঞানের বিস্ময়কর প্রতিভা। নিজের চলচ্চিত্রগুলোর সঙ্গীত আয়োজনের ভারটা নিজের কাঁধেই তুলে নেন তিনি এবং সেখানেও পান যথারীতি ঈর্ষণীয় সাফল্য। সঙ্গীতে তিনি রীতিমতো এক নতুন ধারার সুর নিয়ে আসেন যা শোনামাত্রই ধরে ফেলা যায় যে এটা সত্যজিতের সুর। এ ক্ষেত্রে সম্ভবত তিনি তার শ্রেষ্ঠ কাজ দেখান গুপি-বাঘা ট্রিলজিতে।

[hfe_template id=’81’]

সত্যজিৎ রায় পরিচালিত হিন্দি চলচ্চিত্র মুন্সী প্রেমচাঁদের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’তে ন্যারেটর হিসেবে কণ্ঠদান করেন অমিতাভ বচ্চন, যা নিয়ে স্বয়ং অমিতাভ পরবর্তীতে কয়েকবার নিজেই গর্ব প্রকাশ করেছেন। ‘অশনী সংকেত’ চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ বাংলাদেশের অন্যতম নায়িকা ববিতাকে কাস্ট করেন, যার জন্য ববিতা নিজেকে আজীবন ভাগ্যবতী মনে করেন। সত্যজিতের ‘নায়ক’ এবং ‘চিড়িয়াখানা’ চলচ্চিত্র দুটি আলাদাভাবে বিশেষ গুরুত্ব পায় কারণ এই দুটি চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্র রূপায়ণ করেন মহানায়ক উত্তম কুমার। ‘নায়ক’ নিঃসন্দেহে বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে এক অনন্য সংযোজন যা ছিল অবধারিতভাবে সত্যজিৎ-উত্তম রসায়নের ফল। আরো দুই গুণী অভিনেতা-অভিনেত্রী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং শর্মিলা ঠাকুরের প্রতিভার বিকাশ এই মহান পরিচালকের হাত ধরেই।

চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সত্যজিৎ ছিলেন বহুমুখী এবং তাঁর কাজের পরিমাণ বিপুল। তিনি ৩৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তাঁর নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র পথের পাঁচালী ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে, যাদের মধ্যে অন্যতম ছিল কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাওয়া “শ্রেষ্ঠ মানব দলিল” (Best Human Documentary) পুরস্কারটি। পথের পাঁচালি, অপরাজিত ও অপুর সংসার – এই তিনটি চলচ্চিত্রকে একত্রে অপু ত্রয়ী বলা হয়, এবং এই চলচ্চিত্র-ত্রয়ী তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ বা ম্যাগনাম ওপাস হিসেবে বহুল স্বীকৃত। চলচ্চিত্র মাধ্যমে সত্যজিৎ চিত্রনাট্য রচনা, চরিত্রায়ন, সঙ্গীত স্বরলিপি রচনা, চিত্র গ্রহণ, শিল্প নির্দেশনা, সম্পাদনা, শিল্পী-কুশলীদের নামের তালিকা ও প্রচারণাপত্র নকশা করাসহ নানা কাজ করেছেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের বাইরে তিনি ছিলেন একাধারে কল্পকাহিনী লেখক, প্রকাশক, চিত্রকর, গ্রাফিক নকশাবিদ ও চলচ্চিত্র সমালোচক। বর্ণময় কর্মজীবনে তিনি বহু পুরস্কার পেয়েছেন। তবে এগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হল ১৯৯২ সালে পাওয়া একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কারটি (অস্কার), যা তিনি সমগ্র কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন।

সত্যজিৎ বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি চরিত্রের স্রষ্টা। একটি হল বিখ্যাত গোয়েন্দা ফেলুদা, অন্যটি বিজ্ঞানী প্রফেসর শঙ্কু। এছাড়া তিনি প্রচুর ছোটগল্প লিখেছেন যেগুলো বারটির সংকলনে প্রকাশ পেত এবং সংকলনগুলোর শিরোনামে ‘বার’ শব্দটি বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হত (যেমন ‘একের পিঠে দুই’, ‘এক ডজন গপ্পো’, ইত্যাদি)। ধাঁধা ও শব্দ-কৌতুকের প্রতি তাঁর আগ্রহ এ গল্পগুলোতে প্রকাশ পায়। অনেক সময় ফেলুদাকে ধাঁধার সমাধান বের করে কোন কেসের রহস্য উন্মোচন করতে হত। ফেলুদার বিভিন্ন গল্পে তাঁর সঙ্গী উপন্যাস-লেখক জটায়ু (লালমোহন গাঙ্গুলি), আর তার খুড়তুতো ভাই তপেশরঞ্জন মিত্র ওরফে তোপসে হচ্ছে গল্পের বর্ণনাকারী, যার ভূমিকা অনেকটা শার্লক হোমসের পার্শ্বচরিত্র ডক্টর ওয়াটসনের মত। প্রফেসর শঙ্কুর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীগুলো ডায়েরী আকারে লেখা, যে ডায়েরী বিজ্ঞানীটির রহস্যময় অন্তর্ধানের পর খুঁজে পাওয়া যায়। সত্যজিতের ছোটগল্পগুলোতে অনিশ্চিত উৎকণ্ঠা, ভয় ও অন্যান্য বিষয়ে সত্যজিতের আগ্রহের ছাপ পড়ে, যে ব্যাপারগুলো তিনি চলচ্চিত্রে এড়িয়ে চলতেন। সত্যজিতের অধিকাংশ রচনাই ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে এবং বর্তমানে তাঁর বইগুলোর দ্বিতীয় প্রজন্মের পাঠকসমাজ গড়ে উঠেছে।

তাঁর লেখা অধিকাংশ চিত্রনাট্য সাহিত্যপত্রে বাংলায় প্রকাশিত হয়েছে। সত্যজিৎ তাঁর ছেলেবেলার কাহিনী নিয়ে লেখেন ‘যখন ছোট ছিলাম’ (১৯৮২)। চলচ্চিত্রের ওপর লেখা তাঁর প্রবন্ধের সংকলনগুলো হল: আওয়ার ফিল্মস, দেয়ার ফিল্মস (১৯৭৬), বিষয় চলচ্চিত্র (১৯৮২), এবং একেই বলে শুটিং (১৯৭৯)। ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সত্যজিতের চলচ্চিত্র বিষয়ক নিবন্ধের একটি সংকলন পশ্চিমে প্রকাশ পায়। এই বইটির নামও Our Films, Their Films। বইটির প্রথম অংশে সত্যজিৎ ভারতীয় চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করেন, এবং দ্বিতীয় অংশে হলিউড, কিছু পছন্দের চিত্রনির্মাতা (চার্লি চ্যাপলিন, আকিরা কুরোসাওয়া) ও ইতালীয় নব্যবাস্তবতাবাদের ওপর আলোচনা করেন। ‘বিষয় চলচ্চিত্র’ বইটিতে চলচ্চিত্রের নানা বিষয়ে সত্যজিতের ব্যক্তিগত দর্শন আলোচিত হয়েছে। সম্প্রতি বইটির একটি ইংরেজি অনুবাদ Speaking of Films নামে প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়াও সত্যজিৎ ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’ নামে একটি ননসেন্স ছড়ার বই লেখেন, যেখানে লুইস ক্যারলের ‘জ্যাবারওয়কি’-র একটি অনুবাদ রয়েছে।

শেষ করার আগে একটু ফিরে তাকানো যাক। সত্যজিৎ রায় শুধু চলচ্চিত্রকার ছিলেন, তা নয়। তিনি ছিলেন শিল্প-সাহিত্যের সক্রিয় সারথি বহুমুখী এক ব্যক্তিত্ব। কালান্তরের চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালক, লেখক, সঙ্গীত স্বর লিপিকার, সম্পাদক, প্রকাশক ও প্রচ্ছদ শিল্পী। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে ‘ডি জে কেমার’ (D.J. Keymer) নামক ব্রিটিশ মালিকানাধীন বিজ্ঞাপনী সংস্থায় ‘জুনিয়র ভিস্যুয়ালাইজার’ পদে যোগদান করেন, সম্মানী পেতেন ৮০ টাকা। সত্যজিৎ তাঁর প্রথম বিজ্ঞাপনে ভারতীয় ধাঁচের ক্যালিওগ্রাফিক উপাদান ব্যবহার করেন। পাশাপাশি তিনি অক্ষরশৈলীতে বিশেষ আগ্রহী হয়ে উঠেন। তিনি ‘রে রোমান’ (Ray Roman) ও ‘রে বিজার’ (Ray Bizarre) নামের দুইটি টাইপফেস নকশা উদ্ভাবন করেন। তাঁর নকশা করা এই দুটি ফন্ট ‘Ray Roman’ এবং ‘Ray Bizarre’ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রশংসা অর্জন করে। এর মধ্যে ‘রে রোমান’ ১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জিতে নেয়। চলচ্চিত্র জগতে পদার্পণের অনেক পরেও কলকাতার কিছু মহলে তিনি একজন প্রভাবশালী গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সত্যজিৎ তাঁর নিজের লেখা সমস্ত বইয়ের প্রচ্ছদ ও ভেতরের ছবি আঁকতেন। এছাড়া তাঁর চলচ্চিত্রের সব বিজ্ঞাপনগুলো তিনি নিজেই তৈরি করতেন।

ডি জে কেমার বিজ্ঞাপনী সংস্থায় তিনি আনন্দের সাথেই চিত্রসজ্জা’র কাজ করতেন। ওই সময় বিজ্ঞাপনী সংস্থাটির ইংরেজ ও ভারতীয় কর্মচারীদের মধ্যে বেতন- ভাতা নিয়ে চাপা উত্তেজনা চলছিল। কারণ দেশী কর্মচারীদের তুলনায় ইংরেজ কর্মচারীদেরকে অনেক বেশি বেতন দেয়া হতো। এই সময় তাঁর অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মী ডি.কে, দাশগুপ্ত ‘সিগনেট প্রেস’ নামক একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। একেবারে শুরু থেকেই তিনি এই প্রতিষ্ঠানের চিত্রশিল্পী হিসাবে যুক্ত হন। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে ডি.কে. দাশগুপ্ত এই প্রতিষ্ঠান থেকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। এই গ্রন্থের চিত্রসজ্জার দায়িত্ব পড়ে সত্যজিতের ওপর। বলা ভালো, সত্যজিৎ তখন পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য ততটা গভীরভাবে পড়েন নি। তাঁর প্রায় সকল পড়াশুনার পরিধি ছিল ইংরেজি উপন্যাস ও অন্যান্য গ্রন্থকেন্দ্রিক। এমন কি তখনো রবীন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহও তিনি বিশেষভাবে পড়েন নি। এই অবস্থায় তিনি পথের পাঁচালী পড়া শেষ করলেন। রীতিমতো মুগ্ধ হলেন। ডি. কে দাশগুপ্ত এই প্রকাশনার কাজে আসার আগে একটি চলচ্চিত্র পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ইনিই প্রথম সত্যজিৎকে বলেন যে, ‘পথের পাঁচালী’ থেকে খুব ভালো একটি চলচ্চিত্র হতে পারে। এই প্রকাশনায় কাজ করার সুবাদে তিনি ব্যাপকভাবে বাংলা গদ্য সাহিত্যের সাথে পরিচিত হন। এই যুগান্তকারী ঘটনাটিই পরবর্তী সময়ে সত্যজিৎ রায়কে বাংলা উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

তথ্য সূত্র :

  • Apu and after: Revisiting Ray’s cinema- বিশ্বাস, এম, সম্পাদক (২০০৬)। সিগাল বুকস।
  • The Cinema of Satyajit Ray: Between Tradition and Modernity. – ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস।
  • Our films, their films, – সত্যজিৎ রায়, (১৯৯৩)
  • উইকিপিডিয়া এবং কলকাতা থেকে প্রকাশিত দেশ পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যা।

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী

বিজ্ঞাপন, চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র নির্মাণ, আবৃত্তি, অনুবাদ ও সম্পাদনার পাশাপাশি মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী একজন পরিব্রাজক; দেশের আনাচে কানাচে তার অবারিত বিচরণ। জন্ম ১৯৭৭ সালের ১১ এপ্রিল সরকারি চাকুরে পিতার কর্মস্থল মাদারিপুরের কালকিনি থানা এলাকায়।
শৈশব কৈশোর যৌবনের অনেকখানি কেটেছে মাতুলালয়, নড়াইলের কালিয়ায় এবং পিতার কর্মস্থল দেশের বিভিন্ন জায়গায়। বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর অথচ ব্যক্তিগত পাঠাভ্যাসের ক্ষেত্রে প্রাচীন ইতিহাসের অলিগলিতে তার স্বচ্ছন্দ বিচরণ। ছাত্রজীবনেই ছবি আঁকা, থিয়েটার,আবৃত্তি ও সাহিত্য চর্চা শুরু। লিটল ম্যাগ সম্পাদনা ও দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় ফিচার লিখে আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু। ভারতবর্ষে ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্লভ গ্রন্থ ‘চাচনামাহ্’-এর প্রথম ও পূর্ণাঙ্গভাবে অনুবাদ তার হাতে। শিল্প-সংস্কৃতি-প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক অসংখ্য তথ্যচিত্রের নির্মাতা। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের উপযোগী সম্প্রতি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের নির্মাণ শেষের পর্যায়ে। ভ্রমন ভালো লাগে তাই ব্যাগ ও বাহন সবসময় তৈরী। সময় পেলেই, পাহাড়, সমুদ্র, নদীর সাথে দেখা করতে বেরিয়ে পড়েন।

সত্যজিৎ রায় : সেলুলয়েডের মহাকবিকে সেলাম

One thought on “সত্যজিৎ রায় : সেলুলয়েডের মহাকবিকে সেলাম

  1. লেখাটি পড়ে অনেক কিছু জানলাম, আমি সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের একজন একনিষ্ঠ বক্ত।
    ধন্যবাদ মধুসূদন দাদা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top
error: Content is protected!!
Share via
Copy link
Powered by Social Snap