রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ চিন্তা

মজিদ মাহমুদ

কবি, লেখক, গবেষক

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ‘বলাই’ গল্পটি লিখেছিলেন বঙ্গাব্দ ১৩৩৫-এর অগ্রহায়ণে, আজ থেকে প্রায় শতবর্ষ আগে। কবিবন্ধু জগদীশচন্দ্র বসু (১৮৫৮-১৯৩৭) তখনো গাছের প্রাণ প্রমাণে তৎপর। বিশেষ করে লক্ষ কোটি বছরের রূপান্তর ও বিবর্তনের ফসল বর্তমান পৃথিবী, সেই খবর কেবলই চারদিকে চাউর হয়ে উঠছিল। কিন্তু তাতে বিশ্বাসীর সংখ্যা ছিল নগণ্য। সেই নগণ্য বিশ্বাসীদের অগ্রগণ্য রবীন্দ্রনাথ, যার বিজ্ঞান সাধনা ছিল উপনিষদের সাধনার মতো ভক্তির ও শ্রদ্ধার; বিশেষ করে পরিবেশ বিজ্ঞান। রবীন্দ্রনাথের কাছে পরিবেশচিন্তা ও ধর্মচিন্তার মধ্যে তফাৎ ছিল না। রবীন্দ্রনাথের কাব্যসত্তা বাদ দিলেও, প্রকৃতি পরিবেশ বিষয়ক তাঁর চিন্তাচেতনা তাঁকে একজন পরিবেশ বিজ্ঞানীর মর্যাদা এনে দিতে পারে।

বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গে অন্তর্লীন হয়ে রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগত অস্তিত্বের তুচ্ছতা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন। তাঁর গল্পের নায়ক বলাইকে ভাইপোর আদলে আগামী দিনের মানুষের আত্মার প্রতিভূ হিসাবে দেখাবার চেষ্টা করেছেন। ‘সেই কোটি বৎসর আগেকার দিনে যেদিন সমুদ্রগর্ভ থেকে নতুন জাগা পঙ্কস্তরের মধ্যে পৃথিবীর ভাবী অরণ্য আপনার জন্মের প্রথম ক্রন্দন উঠিয়েছে – সেদিন পশু নেই, পাখি নেই, জীবনের কলরব নেই, চারদিকে পাথর আর পাঁক আর জল। কালের পথে সমস্ত জীবের অগ্রগামী গাছ, সূর্যের দিকে জোড় হাত তুলে বলেছে, ‘আমি থাকব আমি বাঁচব, আমি চির পথিক, মৃত্যুর পর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অন্তহীন প্রাণের বিকাশ তীর্থে যাত্রা করব রৌদ্রে বাদলে-দিনে রাত্রে। গাছের সেই রব আজো উঠছে বনে বনে, পর্বতে প্রান্তরে; তাদেরই শাখায় পত্রে ধরণীর প্রাণ বলে উঠছে, ‘আমি থাকব আমি থাকব। বিশ্বপ্রাণের মূক ধাত্রী এই গাছ নিরবচ্ছিন্ন কাল ধরে দ্যুলোককে দোহন করে পৃথিবীর অমৃত-ভাণ্ডারের জন্যে প্রাণের তেজ, প্রাণের রস, প্রাণের লাবণ্য সঞ্চয় করে; আর উৎকণ্ঠিত প্রাণের বাণীকে অহর্নিশ আকাশে উচ্ছ্বসিত করে তোলে, ‘আমি থাকব। সেই বিশ্ব প্রাণের বাণী কেমন এক রকম করে আপনার রক্তের মধ্যে শুনতে পেয়েছিল ঐ বলাই।’

রবীন্দ্রনাথের চিন্তার অগ্রগম্যতা বোঝাতে শতাধিক বছর আগে প্রকাশিত তাঁর ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থের কথা উল্লেখ করতে হয়। তখনকার বাংলাদেশে এখনকার মতো বৃক্ষের দুর্দিন শুরু হয়নি। বরং স্থলভাগের অনেকখানিই বাহুল্য রকম অরণ্য জঙলায় আচ্ছাদিত ছিল। গ্রামগঞ্জে শহরের প্রবেশ পথে করাতকলের ধারালো দাঁত তখনও সেভাবে তীক্ষ্ণ কামড় বসায়নি। রবীন্দ্রনাথের জমিদারির অন্তর্যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল পালকি কিংবা জলযোগাযোগ। শিলাইদহে পালকির প্রচলন এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। সুতরাং ‘সভ্যতার প্রতি’ কবিতাটি তখনকার জন্য বাড়াবাড়ি মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। মানুষের কঠোর পরিশ্রমের ফসল যে নগর সভ্যতা তার বিধ্বংসী ও অপকারী রূপটি তখনও প্রকট হয়ে দেখা দেয়নি। তবু রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-
দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর,
লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর
হে নবসভ্যতা। হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী,
দাও সেই তপোবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি,
শতাধিক বছর আগে রবীন্দ্রনাথের এই সতর্কবাণী আমাদের জাগাতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথ যা একশ বছর আগে দেখতে পেয়েছিলেন, আমরা তা একশ বছর পরেও দেখতে পাচ্ছি না। অথচ বৃক্ষ নিধনযজ্ঞের ছাইভস্মের ওপরে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। রবীন্দ্রনাথ নগর সভ্যতাকে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী বলে উল্লেখ করেছেন। সর্বগ্রাসী বিশ্বগ্রাসী এই পৌরাণিক ম্যামথ আমাদের জীবনের সব পশ্চাৎভূমি গ্রাস করতে করতে আমাদের আহারে পরিণত করার জন্য এগিয়ে আসছে। এখনই এই আগ্রাসী অগ্রযাত্রার সমন্বয় করতে না পারলে আমরা এর মন্দ উপসর্গের করাল গ্রাসে নিপতিত হবো।

রবীন্দ্রনাথের মতো আমরা কি তা দেখতে পাচ্ছি? এই সভ্যতা তার সম্মোহনী শক্তি দিয়ে আমাদের শুভ চেতনার স্তরগুলো বিকল করে রেখেছে। তা না হলে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এখনো বৃক্ষ হত্যার হুকুম কীভাবে আসে। পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল এই ঢাকা নগরী, অপরিকল্পিত যার বিকাশ, যার বাতাস সীসায় টুইটম্বুর, কার্বণ আর অক্সিজেনের নির্গমনের বৈষম্য যেখানে কাউকে বুঝিয়ে দিতে হয় না, বায়ু দূষণের ফলে যে নগরের শিশুদের ফুসফুস ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে, যে নগর তার অগ্নাশয়ে তার বাসিন্দাদের ইতোমধ্যেই খাদ্য হিসাবে তালিকাভুক্ত করেছে। অথচ অবশিষ্ট আদিবাসী গাছগুলোকে উচ্ছেদ করতে কারো হাত কাঁপছে না। আমরা প্রকৃতির মধ্যে বসবাস করি বলেই, জীব ও জড় প্রকৃতির আদলে নিজেদের চেতনার রূপকে ফুটিয়ে তুলে এত আনন্দ লাভ করি। কিন্তু প্রকৃতি যতই মানবময় হয়ে উঠছে এবং বৃক্ষ অরণ্য নিধনের নানা পথ ও উপায় আবিষ্কার করছে মানুষ ততই অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে ভালনারেবল হয়ে পড়ছে। সে ক্ষেত্রে মানুষের কাছে একদিন তার নিজের হাতে গড়া শিল্পের গুরুত্ব কমে যাবে। এ কথা রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন, লক্ষ বছর ধরে প্রকৃতি যে সুষম শিল্প গড়ে তুলেছে তার তুলনায় মানুষের গড়া শিল্প অনেক মেকি।

[hfe_template id=’81’]

রবীন্দ্রনাথ কাব্যচর্চা গদ্য ও সঙ্গীত রচনা চিত্রকর্ম ও জমিদারি দর্শনে যে সময় ব্যয় করেছেন শান্তিনিকেতনের আশ্রম তরুরোপণ ও লালনে তার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ঠেকাটা কোথায় ছিল? বৃক্ষের দেশে বৃক্ষের যুগে বৃক্ষরোপণের মতো বিলাসী সময় কি রবীন্দ্রনাথের হাতে ছিল? না এর মাধ্যমে এমন কোনো বাণী উত্তর প্রজন্মের কাছে রেখে যেতে চেয়েছিলেন? যে বাণীর মর্মার্থ আমাদের বোধগম্য হলে আমাদের দেশ বৃক্ষশূন্য হতো না। এই প্রকৃতির অজীব ও জীব বৈচিত্র্য রক্ষার জন্য একটি জীবন্তবৃক্ষ ইট পাথরে গড়া যে কোনো শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মের চেয়ে নান্দনিক এ কথা রবীন্দ্রনাথ সাম্যকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই কলকাতার পাষাণস্তূপ থেকে বেরিয়ে এসে বীরভূমের জনশূন্য রাঢ় মৃত্তিকার বুকে আশ্রমতরুনির্মণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছিলেন।

বৃক্ষের প্রতি রবীন্দ্রনাথের ভালোবাসা অবশ্য আমাদের আজকের দিনের অনুশীলন ও আচার-নিষ্ঠতার চেয়ে কিছুটা আলাদা। বৃক্ষ রোপণের জন্য আজ সরকার কিছুটা হলেও উদার, এনজিওগুলো গাছ লাগাবে বলে বাইরের কোনো কোনো দেশ থেকে টাকা পাচ্ছে, মানুষের মধ্যে, তার টিকে থাকার তাগিদে, পরিবেশ সচেতনতাও বেড়েছে কিছুটা। তাছাড়া বৃক্ষ অপরাপর কৃষিকর্মের চেয়ে লাভজনক, এটিও সবাই জেনে গেছে। গরু মোটাতাজাকরণ আর বয়লার পালনের মতো বৃক্ষও লাভজনকভাবে চাষ করা যায়। এমনকি পরিবেশবিদ এবং পরিবেশবাদীরা বৃক্ষকে দেখেন পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে, যেখানে লাভক্ষতির একটি তুলনামূলক পরিসংখ্যান সন্বিবেশিত থাকে; রবীন্দ্রনাথ তার থেকে একটু আলাদাভাবে দেখেছিলেন এই তরুসমাজকে। রবীন্দ্রনাথ আসলে বিশ্বপ্রকৃতির মর্মবাণীটি শুনতে পেয়েছিলেন। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের, জীবের সঙ্গে জড়ের যে সম্মিলন এই পৃথিবী নামক গ্রহে সংঘটিত হয়েছে; যে সংঘটনের ফলে এই গ্রহটি একটি সপ্রাণ জীবন সংগঠনে রূপ নিয়েছে। যার একটি থেকে অন্যটি আলাদা করলে কিংবা কোনোটার প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখালে এই সপ্রাণ পৃথিবীর শরীরের মধ্যে বেদনার উদ্গম ঘটে। সুতরাং পৃথিবীর প্রাণশক্তি বিপদাপন্ন এবং পরিশেষে বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই গ্রহের প্রাণী এবং উদ্ভিদ বায়ু এবং শূন্যতা, মৃত্তিকা এবং জলরাশি খণ্ড খণ্ড অংগে বিভক্ত হয়ে পৃথিবীর সম্পূর্ণ জীবন গড়ে তুলেছে। একটি থেকে আরেকটিকে কিছুতেই আলাদা করে দেখা যায় না। এর প্রাণ কিংবা অপ্রাণ যে কোনো অংশের কোনো কারণে স্বাভাবিকতা ব্যাহত হলে এই সম্পূর্ণ প্রাণ সংস্থার অন্য অংশটিও ধসে পড়বে। পৃথিবীর অপ্রাণ যে বায়ুমণ্ডল জলরাশি কিংবা তাপমাত্রা যার কোথাও কোনো পরিবর্তন ঘটলে তা পুরো সংস্থানকে ওলট-পালট করে দেবে। পৃথিবীর সেই অবিভাজ্য খণ্ডাংশের কোথাও কোথাও আজ কিছুটা বিপত্তি ঘটছে বলে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন। যেমন বাতাসের ওজন স্তরে ফাটল ধরেছে। যার ফলে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি কোনো বাধা ছাড়া সরাসরি পৃথিবীতে এসে পৌঁছবে, যা প্রাণির ত্বকে বিশেষ করে মানুষের শরীরে ক্যান্সার তৈরিতে সহযোগিতা করবে। তারা বলছেন পৃথিবীর তাপমাত্রাও নাকি আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। বাতাসের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে মেরু অঞ্চলে সঞ্চিত বরফের পুরুস্তরে গলন শুরু হবে, ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাবে, পৃথিবীতে দেখা দেবে বন্যা, স্থলে বসবাসকারীদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। আর এসবই হচ্ছে নাকি নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের জন্য, নগরসভ্য মানুষের অতিকায় লোভের জন্য, যারা সবকিছুতেই বেশি মুনাফা খোঁজে। আধুনিক নগর সভ্যমানুষ নিজের মানব অস্তিত্ব তথা বিশ্বযজ্ঞশালায় তার নিমন্ত্রণের কথা ভুলে গিয়ে কেবলই তার জৈব অস্তিত্বের কথা ভাবতে থাকে।

রবীন্দ্রনাথ এসবকেই হয়তো বলেছিলেন, ‘সভ্যের বর্বর লোভ।’ এই লোভের উপনিবেশবাদী হাতে আমরা আজ বন্দী। রবীন্দ্রনাথ এই মুনাফালোভীদের কাছ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করার কথা ভেবেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘মানুষের লোকালয় যদি কেবল একান্ত মানবময় হয়ে ওঠে, এর ফাঁকে ফাঁকে যদি প্রকৃতি কোনোমতে প্রবেশাধিকার না পায়, তা হলে আমাদের চিন্তা ও কর্ম ক্রমশ কলুষিত ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে নিজের অতলস্পর্শে আবর্জনার মধ্যে আত্মহত্যা করে মরে।’ মানুষের চিন্তা থেকে প্রকৃতি কি সত্যিই আজ উধাও হতে চলেছে? মানুষের চিন্তা এবং কর্ম কি সত্যিই কলুষিত ও ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে? মানুষ আজ এই ব্যাধিগ্রস্ত এবং কলুষিত চিন্তার আবর্তে নিপতিত হচ্ছে। এই নগর সভ্যতা একটি বৃহদাকার আজদহের মতো বিশাল হাঁ বিস্তার করে আছে, আর মানুষ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে কেবলই তার প্রকাণ্ড পেটের মধ্যে ছুটে আসছে। আলোকবিহারী পতঙ্গের মতো সমগ্র মানব সমাজকে এই আত্মহত্যার পথ থেকে কে সরিয়ে আনবে? রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস এই দুর্দিনে আমাদের মরুবিজয়ের সাহস যোগাতে পারে বলে মনে হয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাসের সঙ্গে তপোবনের যে ধারণাটি জড়িয়ে আছে অনেকেই তা মানতে চাইবেন না।

রবীন্দ্রনাথ বিদ্যা এবং বিদ্যালয়ের ধারণাটি নিতে চেয়েছিলেন তপোবনের আদলে। তিনি এখান থেকেই যাত্রা শুরু করার কথা ভেবেছেন। আসলে রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষকে দেখেছেন ইতিহাসের ভারতবর্ষ হিসাবে; সময় ও কালচেতনার মধ্যে যার উদ্ভব। যেখানে ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী প্রধান নয়। ভারতবর্ষ নিজেই তার আপন মহিমায় এবং ব্যক্তিত্বে উদ্ভাসিত এবং মহিমান্বিত। হাজার বছর ধরে নানা ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী একই মঞ্চে ভারতবর্ষের পটভূমিকায় স্ব স্ব চরিত্রে অভিনয় করে গেছে। ‘ছেঁড়া ছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে এক বৈকুণ্ঠের দিকে।’ প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথ অরণ্যপ্রকৃতির সঙ্গে বসবাস নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। যার ধারণা ইতিপূর্বের আদি ভারতের তপোবনের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। আর রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস ছিল ভারতের সকল মানুষই সেই মিলনের সন্তান। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন ‘প্রকৃতির সঙ্গে সম্মিলন। আর রবীন্দ্রনাথ আজন্ম প্রকৃতির প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। গাছপালা বৃক্ষরাজি বাদ দিলে সত্যিকারের রবীন্দ্রনাথকে আর চেনা সম্ভব নয়। রবীন্দ্র-সৃষ্টির পরতে পরতে অরণ্য প্রকৃতির শুশ্রূষা লেগে আছে। রবীন্দ্রনাথের এই গভীর শুশ্রূষার মূলে ছিল নির্মল প্রকৃতির প্রতি অসম্ভব ভালোবাসা। আর এই ভালোবাসা তো স্বপ্রাণ পৃথিবীর অখণ্ডরূপকে অম্লান রাখা। আজ একুশ শতকে এসে আমরা যে টেকসই উন্নয়ন এবং পরিবেশের প্রতি দায়িত্বের কথা বলছি, একশ’ বছর আগেও রবীন্দ্রনাথের সেই কাজ ছিল সম্পূর্ণ এবং স্থিতিশীল। আমরা একশ’ বছর পিছনে যেয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেও যদি কাজটি শুরু করতে পারি তাহলে এখনও বড় বাঁচাটি বেঁচে যাওয়া সম্ভব।

আজ মানবঅস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে সমগ্র জাতিকে আত্মহননের পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে, সভ্যের বর্বর লোভ থেকে মুক্ত করতে, রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি ও পরিবেশ চিন্তা সম্যকভাবে উপলব্ধি করা একান্তপ্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বৃক্ষ এবং অরণ্যের লালন ও রক্ষণ তাদের আনন্দ সম্মিলনে বেঁচে থাকার নবতর সাধনাই কেবল আজকের পৃথিবীর গভীর অসুখ সারিয়ে তুলতে পারে।


মজিদ মাহমুদ

জন্ম ১৬ এপ্রিল ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে পাবনা জেলায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা সাহিত্যে প্রথম শ্রেণীতে স্নাতকোত্তর। সাংবাদিকতা তাঁর মূল পেশা, নজরুল ইনসটিটিউট, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অধীনে তিনি কাজ করেছেন; কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। কবিতা তাঁর নিজস্ব ভুবন হলেও মননশীল গবেষণাকর্মে খ্যাতি রয়েছে। প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে।

উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : মাহফুজামঙ্গল, বল উপাখ্যান, আপেল কাহিনী, সিংহ ও গর্দভের কবিতা, দেওয়ান-ই-মজিদ। উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ : নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র, কেন কবি কেন কবি নয়, ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ প্রবন্ধ, উত্তর-উপনিবেশ সাহিত্য ও অন্যান্য, রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণসাহিত্য।

রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ চিন্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top
error: Content is protected!!
Share via
Copy link
Powered by Social Snap