মানিক দর্শন: কেন লেখেন?

জন্মদিনের স্মরণাঞ্জলি

আবদুল্লাহ আল মোহন

সহকারী অধ্যাপক, গবেষক

আমার সংশয়ী মন মানিক দর্শন ভাবনার শুরুতেই উত্তর দেয় এভাবে- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের মনের অন্ধকার চিনিয়েছিলেন। একের পর এক উপন্যাস আর ছোটগল্পে তথাকথিত ভদ্র জীবনের বিকার ও ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন জীবন অন্বেষণের শিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কবিতা লিখেছেন, নাটক লিখেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন; কিন্তু আসলে তিনি কথাশিল্পী, ঔপন্যাসিক ও ছোট গল্পকার। যা তাঁর প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছে। সেই জীবনশিল্পের বাতিঘরের আজ জন্মদিন। বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি মানুষের এই জীবনশিল্পীকে, অমর স্রষ্টাকে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বস্তুবাদী ও জীবনঘনিষ্ঠ কথাশিল্পী। গভীর সংবেদনশীলতা, সমাজ-রাজনীতিমনস্কতা, মনোবিশ্লেষণধর্মিতা, দর্শন ও বিজ্ঞাননিষ্ঠতা এবং সর্বোপরি নর-নারীর সম্পর্কের সহুমাত্রিক জটিলতার রূপায়ণ তাঁর শিল্পীসত্তাকে বিশিষ্টতা দান করেছে। তাঁর শিল্পীমানস মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং সাধারণ নর-নারী ও তাঁদের পারিপার্শ্বিকতার দিকে যেমন ঝুঁকেছে তেমনি ঝুঁকেছে ফ্রয়েড ও মার্কসীয় দর্শনের দিকে। তিনি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির আলোকে জীবনের ছবি এঁকেছেন, জীবনজটিলতার গ্রন্থিমোচন করেছেন। মানুষের আদিম প্রবৃত্তি, বিকারগ্রস্ততা, বোহেমিয়ান স্বভাব, কামনা-বাসনা ইত্যাকার বিষয় শৈল্পিক রসমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করেছে তাঁর সাহিত্যে। দৃঢ় মনোবল, প্রচণ্ড প্রাণশক্তি, ডানপিঠে স্বভাব তাঁর শিল্পীমানসকে বলিষ্ঠতা দান করেছে। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে তিনি ‘আট ফর লাইফ সেক’ আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন না। উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ প্রভৃতিতে তাঁর শিল্পীসত্তার যে বিচরণ, তাতে তিনি জীবনের বাস্তব ও জটিল রূপকেই মূর্ত করে তুলেছেন। তবে এ কথাও সত্য যে, শেষজীবনে তিনি অপার সম্ভাবনার শিল্পীপ্রতিভাকে নিজ হাতেই ‘শেষকৃত্য’ করেছেন: এত বড়ো শক্তিমান স্রষ্টা এলোমেলো ঝড়োহাওয়ার দ্বারা দিগভ্রান্ত হয়ে কখনও মানুষের জৈবসত্তাকে সম্মুখে স্থাপন করে তার জয়গান করলেন, কখনও বামাচারী শোভাযাত্রার পুরোভাগে ঝাণ্ডা হাতে অবতীর্ণ হলেন, প্রগতির নামে উৎকট রাজনীতি ও উদ্ভট সমাজনীতির কচকচির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন- এইভাবে তার শিল্পিজীবনের অপমৃত্যু হল। এতদ্সত্ত্বেও মানিকপ্রতিভা বাংলা সাহিত্যে অদ্বিতীয়। বঙ্কিমচন্দ্রের অতীতচারী রোমান্সধর্মিতা, রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক ভাবালুতা কিংবা শরৎচন্দ্রের সমাজ-সংস্কার শাসিত জীবন-সংবেদ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আবির্ভূত হলেন তিনি। কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকদের মতো অতি উগ্র জীবনবোধ ও নিরীক্ষাধর্মী ভাবনা তাঁর লক্ষ্য ছিল না, বরং বাস্তবদৃষ্টিতে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত এবং সমাজের নীচুতলার মানুষের আবেগ-অনুভূতি, জীবনসংগ্রাম, কামনা-বাসনা ও নানামাত্রিক জটিলতাকে তিনি শিল্পরূপ দান করেছেন। জীবনকে যেভাবে দেখেছেন, কোনোরকম রং না চড়িয়ে অকৃত্রিমভাবে এনেছেন বলেই বলতে পেরেছেন : ‘জীবনকে আমি যেভাবে ও যতভাবে উপলব্ধি করেছি অন্যকে তার ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ ভাগ দেওয়ার জন্য আমি লিখি।’ সাহিত্যের সঙ্গে লেখকের জীবন, সমাজ এবং পারিপার্শ্বিকতার নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান বলেই চারপাশের দেখা জীবন ও সমাজকে লেখক কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারেন না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শৈশব থেকে গ্রাম-বাংলার আনাচে-কানাচে এবং শহরের গলি-ঘিঞ্জিতে ঘুরেছেন; জীবনের বাস্তব, নগ্ন ও নির্মম রূপকে প্রত্যক্ষভাবে অবলোকন করেছেন। সে-জীবনকে সাহিত্যে রূপদানের জন্য অনলসভাবে লেখনী সঞ্চালন করেছেন। তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছে : শৈশব থেকে সারা বাংলার গ্রামে শহরে ঘুরে যে জীবন দেখেছি, নিজের জীবনের বিরোধ ও সংঘাতের কঠোর নগ্ন বাস্তব রূপ দেখেছি- সাহিত্যে কি তা আসবে না? বৈজ্ঞানিক সত্যকে সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাঁর প্রলেতারিয়েতের বিরাটত্ব ও ব্যক্তি মানবতার পরিচয় তুলে ধরার জন্যই মানিক কলম হাতে তুলে নেন। মধ্যবিত্ত সমাজে জন্ম নিয়ে নিজের শ্রেণীকে অস্বীকার করে নিম্নশ্রেণীর মানুষের চরিত্রকে গৌরবান্বিত করেছেন তিনি। মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে বলতেন মেকি।

[hfe_template id=’81’]

সুন্দর সমাজ সচেতন জীবন ঘনিষ্ঠ সাহিত্যকর্মে নিবেদিতপ্রাণ লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় [১৯ মে, ১৯০৮-৩ ডিসেম্বর, ১৯৫৬]। আসল নাম সুবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হিসাবেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতার নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায়। পিতার চাকরি সূত্রে সাঁওতাল পরগনার দুমকায় তাঁর পরিবার চলে আসেন। এইখানেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। কিন্তু পূর্ববঙ্গের নদীনালা, খালবিল, তেলে-জলেই তিনি বড় হয়ে ওঠেন। তাই সেই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কথা, জীবন, পারিপার্শ্বিক চিত্রগুলো নিপুণ দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হন। অসংখ্য অভিজ্ঞতার ভারে নুইয়ে পড়া মানিক পাঠককে তার অভিজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ রাখতেই লেখা শুরু করেন। সামাজিক শ্রেণি বৈষম্য, শোষণ, নিপীড়ন, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সোচ্চার তার লেখনি মার্কসবাদে দীক্ষা নেয়। জীবনের একটা পাঠান্তর হিসেবে ধরে নেয়া যায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৩৫ সাল থেকেই লেখালেখি শুরু করেন। তিনি যখন সাহিত্য জগতে প্রবেশ করেন, তখন ফ্রয়েডীয় মনোবিকারতত্ত্ব সাহিত্যিক মহলে খুব জনপ্রিয়তা পান এবং এবং পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মূলত তার লেখনীতে বিশাল বিস্তীর্ণ নদ-নদীর পটভূমিকায় সাধারণ মানুষের কথা যেমন বস্তুনিষ্ঠ জীবনচিত্র অঙ্কন করেছেন, তেমনি মানুষের কর্মে পিপাসায় জীবনচিত্র তুলে ধরতে গিয়ে আদিমতার অন্ধকারে ফিরে গেছেন বার বার। অদ্ভুত নিরাসক্তভাবে তিনি মানুষের জীবন ও সমস্যাকে দেখেছেন, সমাধানের চেষ্টাও করেছেন বুদ্ধি ও লেখনীতে। নর-নারীর জৈবসত্তা বিকাশের নানাদিক তাকে আকৃষ্ট করেছিল। তার লেখায় জৈবসত্তা ও দৈহিক বর্ণনায় ছিলেন কিছুটা বেপরোয়া প্রকৃতির।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনবাদী লেখক। বাংলা কথাসাহিত্যে বস্তুনিষ্ঠ জীবনের রূপায়ণে তাঁর সমকক্ষতা কেউ অর্জন করতে পারেন নি। অতীতের জীবনাচরণ বা ইতিহাসের মায়াবী হাতছানি তাঁকে টানেনি; টানেনি বৈদেশিক কোনো পরিমণ্ডলও। চোখের সামনে যে জীবন ও পরিবেশ প্রত্যক্ষ করেছেন, তাকে রূপায়িত করেছেন সাহিত্যে। তাঁর শিল্পীসত্তা পরিভ্রমণ করেছে মানবমনের আদিমতার বক্র-কুটিল প্রদেশে। বঞ্চিত, শোষিত তথা সবহারাদের জীবন-ভাষ্যকার রূপেই মানিক স্বকীয়তা লাভ করেছেন। এ প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসু মন্তব্য করেছেন : বর্তমান, প্রত্যক্ষ ও সমসাময়িকের মধ্যেই তিনি (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়) আজীবন শিল্পের উপাদান খুঁজেছেন এবং তার যে অংশটিকে শিল্পরূপ দিয়ে গেছেন তা স্বাক্ষর ও বিত্তহীন সর্বসাধারণের সর্বাধিক পরিচিত। এইখানেই তাঁর বৈশিষ্ট্য ও সার্থকতা।’ ভদ্রসমাজের বিকার ও কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত চাষি-মজুর-মাঝি-মাল্লা-হাড়ি-বাগদিদের বিচিত্র অবহেলিত জীবন নিয়ে তিনি লিখতে শুরু করেন; এই ‘বিরাট মানবতা’কে তুলে আনেন সাহিত্যে। বারবার নিজের লেখায় কাটাকুটি করতে ভালবাসতেন। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখেছেন, ‘প্রখর একটা ক্ষিপ্রতা তাঁর মুখে, যেন বুদ্ধির সন্দীপ্তি।’ প্রথম উপন্যাস লেখার আগেই তাঁর ফ্রয়েড এবং হ্যাভলক এলিস পড়া। ১৯৫৪ সালে ‘কেন লিখি’ নামে একটি সংকলন বেরিয়েছিল ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের পক্ষে। সংকলনটির সম্পাদক ছিলেন হিরণকুমার সান্যাল ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ‘বাংলাদেশের বিশিষ্ট কথাশিল্পীদের জবানবন্দি’- এই ঘোষণা থাকলেও সংকলনটিতে কথাশিল্পীদের সঙ্গে কবিরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ওই সংকলনটিতে অন্যদের সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও একটি লেখা লিখেছিলেন। নিতান্তই ফরমাশি রচনা। কিন্তু বাস্তবিকই সেটি ছিল তাঁর অসাধারণ রচনা। তার মধ্যে প্রতিভাসিত হয়েছে শিল্পীমাত্রেই, কিন্তু বিশেষভাবে প্রতিবিম্বিত হয়েছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে। ‘লেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায়েই যে সব কথা জানানো যায় না সেই কথাগুলো জানাবার জন্যই আমি লিখি।’ -এই কথাটিই উক্ত রচনাটির প্রথম চরণ। ‘আড়াই বছর বয়স থেকে আমার দৃষ্টিভঙ্গির ইতিহাস আমি মোটামুটি জেনেছি।’-এই উক্তিটির মধ্যেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমস্ত শিল্পকর্মের যে সচেতন বুদ্ধির প্রকাশ পায় তাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘কেন লিখি’র তিন বছর পরে ১৯৪৭ সালে, শারদীয় ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘প্রতিভা’ নামে আরেকটি প্রবন্ধ লিখেন। ওই প্রবন্ধে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝাতে চেয়েছেন প্রতিভা কোনো ‘ঈশ্বরপ্রদত্ত রহস্যময় জিনিস’ নয়। বুঝালেন, ‘প্রতিভা আসলে এক। বৈজ্ঞানিক আর কবির প্রতিভায় মৌলিক পার্থক্য কিছু নেই- পার্থক্য শুধু বিকাশ আর প্রকাশে।’ এখানে ‘কবি’ বলতে লেখক শিল্পী মাত্রকেই বুঝিয়েছেন মানিক। আর প্রতিভা জিনিসটা কী?- না, ‘দক্ষতা অর্জনের বিশেষ ক্ষমতা।’ এছাড়া আর কিছুই নয়।

দৈহিকভাবে অসুস্থ হলেও মানসিকভাবে যথেষ্ট বলিষ্ঠ ছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বলিষ্ঠতা রক্তের উষ্ণ-স্রোত উত্তাপ টের পাওয়া যায় তার গল্প-উপন্যাসের চরিত্রের বর্ণনায়, পেশায়, কাজে-কর্মে। মানিকের সাহিত্যাঙ্গনে প্রবেশটা একটা চমক এবং চমক ‘অতসী মামী’ রচনার ইতিহাস, চমক ‘দিবারাত্রির কাব্য (১৯৩৫), ‘জননী’ (১৯৩৫), ‘পদ্মানদীর মাঝি’ (১৯৩৬), ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ (১৯৩৬), ‘অহিংসা’ (১৯৪৮) ও চতুষ্কোণ (১৯৪৩) প্রভৃতি। পাঠকের চেতনাকে নাড়া দিতে পেরেছেন বলেই এগুলো পাঠকের কাছে আদরণীয়। ভারতবর্ষের মার্কসবাদী রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সমাজ, বিজ্ঞান ও ইতিহাস সম্পর্কিত বিভিন্ন বিতর্কের প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা সাব অল্টার্ণ স্টাডিজ তত্ত্ব তার গল্পগুলো সমর্থন করে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট দ্বিধাদ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হলেও ব্যক্তিজীবনে তিনি সমাজতন্ত্র আন্দোলনে যোগ দিয়ে তৎকালিন ভারতীয় সংস্কৃতিতে জাতিভেদপ্রথা, প্রাচীন ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রাধান্য, সাম্প্রদায়িক মনোভাব, কৃষি-অর্থনীতি এবং সর্বোপরি নিম্নবর্গের মানুষের যে সত্য পরিচয় নেই সে কথাটি বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে একদিকে তার গল্পের পটভূমে মধ্যবিত্তের জীবন সংকট, হতাশা, ক্লান্তিসহ ফ্রয়েডীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে যৌন-যাপন মানসিকতা যেমন সুস্পষ্ট হয়েছে। আবার অন্যদিকে ক্ষতবিক্ষত সমাজ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, পুরোনো মূল্যবোধের অবক্ষয়, অন্তর্মুখী থেকে বহির্মুখী সমষ্টিজীবনের প্রতিবাদের নানাদিক নির্দেশক হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। সুতরাং পর্বানুক্রমিক ধারাবাহিকতায় তার ‘অতসী মামী ও অন্যান্য গল্প’ (১৯৩৫), ‘প্রাগৈতিহাসিক’ (১৯৩৭), ‘মিহি ও মোটা কাহিনী’ (১৯৩৮), ‘সরীসৃপ’ (১৯৩৯), ‘বৌ’ (১৯৪০), ‘সমুদ্রের স্বাদ’ (১৯৪৩), ‘ভেজাল’ (১৯৪৪), ‘হলুদপোড়া’ (১৯৪৫) এবং দ্বিতীয় পর্বের ‘সহরবাসের ইতিকথা’ (১৯৪৬), ‘আজ কাল পরশুর গল্প’ (১৯৪৬), ‘চিন্তামনি’ (১৯৪৬), ‘পরিস্থিতি’ (১৯৪৬) দিয়ে। এরপর ‘চিহ্ন’ (১৯৪৭), ‘আদায়ের ইতিহাস’ (১৯৪৭), ‘খতিয়ান’ (১৯৪৭), ‘মাটির মাশুল’ (১৯৪৮), ‘ছোটবড়’ (১৯৪৮), ‘ ছোটবকুলপুরের যাত্রী’ (১৯৪৯) ইত্যাদি গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলোর নিবিড় পাঠে লেখকের চেতনার ধারাবাহিক বিবর্তন পাঠকের সামনে প্রোজ্জ্বল হয়। লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও ভাববাদী নিয়তিবাদ থেকে ব্যবচ্ছেদী নিয়তিবাদে উঠে আসেন।

পদ্মানদীর মাঝি লেখার সময়ে পদ্মানদীর মাঝিদের সঙ্গে বহুদিন একত্রে সময় কাটিয়েছেন। তাদের সঙ্গে রাত কাটিয়েছেন, খাবার খেয়েছেন। শিল্পের জন্য শিল্প এ নীতিতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিশ্বাসী ছিলেন না। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানিক ভারতীয় কমুনিস্ট আন্দোলনের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন। মার্কসবাদ লেলিনবাদের সাথে এভাবে তাঁর সৃষ্টির নাড়ীর যোগ। নিম্নস্তরের মানুষের জীবন কাহিনীর সংবেদনশীল রূপকার হলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা কথা সাহিত্যে তিনিই প্রথম সচেতনভাবে মার্কসবাদের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তাঁর এই প্রয়োগ সম্পর্কে নিজেই বলেছেন, ‘মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচয় হবার পর আরও ব্যাপক ও গভীরভাবে সে পরিবর্তন ঘটবার প্রয়োজন উপলব্ধি করি। আমার লেখায় যে অনেক ভুল-ভ্রান্তি, মিথ্যা আর অসম্পূর্ণতার ফাঁকি আগেও ছিল আমি তা জানতাম। কিন্তু মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচয় হবার আগে এতটা স্পষ্ট ও আন্তরিকভাবে জানবার সাধ্য হয়নি।’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসগুলিতে মার্কসীয় দর্শন ফ্রয়েডীয় যৌনচেতনা এ দুটো দিক সার্থকতভাবে বিকাশ লাভ করেছে। মার্কসের রাজনৈতিক শ্রেণী চেতনা ও অর্থনৈতিক চিন্তাধারা এতে সবচেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল। তাঁর লেখায় এসেছে নিম্ন শ্রেণীর মানুষ অর্থাৎ চাষী, জেলে, মজুরের বলিষ্ঠ জীবনের প্রবল আকর্ষণ। যা তাঁকে মুগ্ধ করেছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণ মানিককে স্বাভাবিকভাবেই মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। ব্যক্তিগত জীবনে মধ্যবিত্তের দোদুল্যমান জীবনের কৃত্রিমতা তাঁর মনে বিতৃষ্ণা এনে দিয়েছিল। শোষণ, নিপীড়িত শ্রেণী দ্বন্দ্বের অসঙ্গতিতে বিভক্ত সমাজের বিবেকবান সাহিত্যিকের কাছে মার্কসবাদ একটি আদর্শ। এই আদর্শই মানিককে মুগ্ধ করেছে। এদিক থেকে তিনি অন্য লেখকদের থেকে ভিন্ন। বাংলা সাহিত্যে এমন অনেক লেখক আছেন যাঁরা সারাজীবন চিলাসব্যসনে মত্ত থেকে বা সমাজের উঁচু স্তরে অবস্থান করেও নিম্ন শ্রেণীর মানুষদের নিয়ে লিখেছেন। লেখায় সর্বহারাদের জন্য কুম্ভিরাশ্রু বিসর্জন করেছেন মানিক তাদের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র।

মার্কসবাদ দর্শনের কারণেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পগুলোর বিষয়বস্তুতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। তবে এ প্রতিবাদ-প্রতিরোধ কখনো গল্পের রসহানি ঘটায়নি। বরং তা ছোটগল্পের বৃহত্তর ব্যঞ্জনায় তাকে অনিবার্য করে তুলেছেন। গল্পগুলোতে তিনি বঞ্চিত নিম্নবর্গের মানুষের যাপিত জীবনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছেন। তাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, অগ্রসর-অনগ্রসর বাদ-প্রতিবাদের দ্বান্দ্বিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রতিরোধের শক্তি অর্জন ও সামর্থের নিপুণ কাহিনী রচনা করেছেন। যা মানুষের প্রতি লেখকের দায়বদ্ধ মানসিকতার পরিচয় বহন করে। আর এখানেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পের নিজস্বতা। তার প্রথম পর্বের গল্পগুলোতে মানব-মানবীর গভীর প্রেম এবং গল্পের নারীরা সনাতনী ধারায় পুরুষদের মুখাপেক্ষী, সেবিকা হিসাবে দেখিয়েছেন। যা বাঙালি মধ্যবিত্তের বিশ্বাসের ভিত্তিভূমি, বাস্তব চিত্র। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি নারীসমাজের প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত করেছেন। অনেক সমালোচক মনে করেন এটি সম্ভব হয়েছে মানিকের মার্কসবাদী বিশ্বাসের কারণে গভীর জীবনবোধ জন্ম নেয়ার কারণে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসতে পারে, সমাজতন্ত্রী হলেই কি সৎ ও গণমুখী সাহিত্য রচনা সম্ভব? মানিক নিজে ‘লেখকের কথা’য় বলেছেন, ‘মার্কসবাদ না জানায় কিছুই করতে পারিনি, এই গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় দেয়া মার্কসবাদকে অস্বীকার করারই সমান অপরাধ।’ আবার এ প্রসঙ্গে এডওয়ার্ড আপওয়ার্ড মনে করেন, সৎ সাহিত্য রচনা করতে হলে ব্যবহারিক জীবনে সাহিত্যিককে সমাজতন্ত্রী হয়ে শ্রেণী সংঘর্ষের প্রগতিশীল পক্ষে যোগ দিতে হবে; কিন্তু সমাজতন্ত্রী হলেই সৎ সাহিত্য রচনা করা যায় না। রচনার গুরুত্ব নির্ভর করে লেখকের ব্যক্তিগত প্রতিভা ও বাস্তবজগতের জটিল অবস্থাসমূহের পর্যবেক্ষণ শক্তির ওপর। অনস্বীকার্য যে, দায়বদ্ধতা ব্যতিরেকে লেখকের অস্তিত্ব সোনার পাথরবাটির মতোই অবাস্তব। সাধারণ মানুষের ভেতর থেকে উঠে আসা গল্প দৃষ্টিভঙ্গি ও উপস্থাপন দক্ষতার কারণেই প্রাণতা পায়। যা করেছেন গল্পকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গত কারণেই তার গল্পগুলো সমকালে সমালোচিত হলেও সমকালিন বাস্তবতার প্রয়োগে গল্পগুলো হয়ে উঠেছে বাস্তব সমাজের প্রতিচ্ছবি। সুতরাং একথা বলা অসংগত হয় না যে, উত্তরকালে এসেও তার গল্পের নিবিড় পাঠে এটাই প্রমাণিত হয় তিনি সমপদক্ষেপে বাংলা সাহিত্যের এক নতুন যুগের স্রষ্টা এবং দ্রষ্টা।

[hfe_template id=’81’]

সারা জীবন ধরে একের পর এক রূপক লিখে গেছেন মানিক। ‘দিবারাত্রির কাব্য’র মতো প্রেমকাহিনির কেন্দ্রে শেক্‌সপিয়র-শেলি-কিটস পড়া এক সৃষ্টিছাড়া পুরুষ, হেরম্ব। যে নারী তাকে ভালবাসে, তাকেই সইতে হয় অসহ্য যন্ত্রণা। সুপ্রিয়ার অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়, যদিও স্বামী অশোককে সে কোনও দিনই ভালবাসতে পারে না। উমা তাকে বিয়ে করেছিল, কিন্তু আত্মহত্যায় বাধ্য হয় শেষে। দু’বছরের মা-মরা মেয়ের প্রতিও হেরম্ব সম্পূর্ণ নিরাসক্ত, সে প্রেমে পড়ে বছর আঠারোর আনন্দের। আনন্দ কিন্তু জানে, প্রেম ক্ষণস্থায়ী। হেরম্বকে যে দিন পাবে, সে দিনই তার প্রেমকে সে হারাতে শুরু করবে। মা-বাবার প্রেমের ট্র্যাজেডিকে চোখের সামনে দেখেছে আনন্দ, দেখেছে সুপ্রিয়ার জীবনের করুণ পরিণতিকেও। যে জীবনে প্রেম নেই, সেই জীবন সইতে পারবে না সে, তাই নাচতে নাচতে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে আগুনে ঝাঁপ দেয়। হেরম্বের মধ্যে রেখে যায় প্রেম ও কামনা তৃপ্ত না হওয়ার জ্বালা। আর তাই বুঝি ‘মানুষের মধ্যে যতখানি মানুষের নাগালের বাইরে, প্রেম তারই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট,’ লিখেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। মানুষের সুস্থতা ও অপ্রকৃতিস্থতার যে সীমারেখাটি বারবার গুলিয়ে যায়, নিজেকে সুস্থ ভেবে মানুষ অপ্রকৃতিস্থের মতো আচরণ শুরু করে আর তার ভেতরেও আশ্চর্য ভাবে সুস্থতার লক্ষণগুলিকে প্রকাশ করে চলে, মানিক সেই সীমারেখাটিকেই স্পর্শ করেছেন বারবার। স্মৃতিচারণে প্রেমেন্দ্র মিত্র যেমনটি লিখেছিলেন, ‘তাঁর রচনায় যেটুকু অসুস্থতার ছায়া তা আমাদেরই রুগ্নতার প্রতিবিম্ব। কোনো দিকেই মাঝারি হবার সৌভাগ্য নিয়ে তিনি আসেননি। চূড়াও যেমন তাঁর মেঘ-লোক ছাড়ানো, খাদও তেমনই অতল গভীর। তাই মানিয়ে নেবার মানুষ তিনি নন।’

১৯৩৬-এ প্রকাশিত হয় ‘পদ্মানদীর মাঝি’ আর ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’। পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছেদের ফলে এ সময়ে তাঁর খুবই অর্থাভাব ছিল। শুধু মুড়ি খেয়েও কখনও কাটাতে হয়েছে। লেখার আলাদা ঘর, চেয়ার-টেবিল ছিল না। তবু লেখালিখি চালিয়ে গেছেন কঠোর সাধনার মতো। গভীর পড়াশোনা করেছিলেন মনস্তত্ত্ব ও যৌনবিজ্ঞান নিয়ে। ১৯৩৫ সালে মৃগীরোগে আক্রান্ত হন। অত্যধিক শারীরিক-মানসিক পরিশ্রম, অতিরিক্ত উত্তেজনাই ছিল এর কারণ। তবু তাঁকে লিখে যেতে হয়েছে, কারণ, ‘আজ এখন ওষুধ খেয়ে ঘুমোলে কাল হাঁড়ি চড়বে না।’‘পদ্মানদীর মাঝি’র গোড়াতেই কুবের খবর পায় তার একটি পুত্রসন্তান হয়েছে, কিন্তু সে ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে, ‘পোলা দিয়া করুম কী, নিজগোর খাওন জোটে না, পোলা!’ পঙ্গু স্ত্রী মালা, বৃদ্ধা পিসি আর তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে গড়া সংসারের প্রতি কুবের আসক্তি বোধ করে না, সে আকৃষ্ট হয় মালার ছোট বোন কপিলার প্রতি। বিবাহিত দুই নারী-পুরুষের পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ নানান ছলনার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। তারা খুঁজে নিতে চায় বিকল্প পথ, যে পথে গেলে তাদের প্রেম ও যৌনতার স্বাধীনতা চরিতার্থ হবে। এই বিকল্প পথেরই সন্ধান নিয়ে আসে হোসেন মিয়া, ‘ময়নাদ্বীপি যাবা কুবির?’ কুবেরদের নিয়ে সে গড়ে তুলতে চায় ‘ময়নাদ্বীপ’ নামের নতুন এক উপনিবেশ। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’-য় শশী নিজেই যেন ঔপনিবেশিক নিষ্ক্রিয়তার প্রতীক। একটি মৃতদেহ নিয়ে সে গ্রামে ঢোকে, ক্রমে সেই মৃতদেহের জড়তাই যেন গ্রাস করতে থাকে তার অস্তিত্ব। তার বিলেত যাওয়ার ও কলকাতায় চিকিৎসক হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভের স্বপ্ন, সর্বোপরি বিবাহিত কুসুমের প্রতি অবদমিত প্রেম ও যৌনতা, কিছুই সফল হয় না। শশী চিরকালের মতো গ্রামেই থেকে যায়, আর অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায় কুসুম। অদ্ভুত সব ‘এনিগমা’ তৈরি হয় এই আখ্যানে। যাদব চেয়েছিল লোকের চোখে মহাপুরুষ হয়ে উঠতে, তাই স্বেচ্ছামৃত্যুর কিংবদন্তি ছড়িয়ে দেয়, আত্মহত্যা করে মিথ হয়ে যায় সে। মৃত্যুর বিনিময়ে একটি মানুষ অর্জন করতে চায় মহৎ হওয়ার গৌরব।

১০

মানিক প্রলেতারিয়েতের গভীর সমুদ্র থেকে স্নাত। তিনি নিষ্ঠাবান মানব প্রেমিক। মানিকের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ নিম্ন শ্রেণীর শোষিত বঞ্চিত মানব জীবনের আলেখ্য। যে জীবনে পদ্মা পারের দুঃখপীড়িত মাঝিরা সারাদিন পরিশ্রম করেও দুবেলা আহার জোগাতে পারে না। পদ্মা নদীর মাঝিদের সংগ্রামমুখর জীবনের বর্ণনা মানিক দিয়েছেন এভাবে- “আসে রোগ, আসে শোক।… জন্মের অভ্যর্থনা এখানে গম্ভীর নিরুৎসব বিষন্ন। জীবনের স্বাদ এখানে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসায়, কাম ও মমতায় স্বার্থ ও সংকীর্ণতায় আর দেশী মদে।” মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করতে গেলে আমরা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’তে দেখি অসাম্প্রদায়িক শ্রেণী চেতনার উক্তি। ‘মধ্যাহ্নে নৌকা ভিড়াইয়া রাঁন্নার আয়োজন করা হইল। নিজেদের জন্য ভাত রাধিবার ভারটা কুবেরের উপরই পড়িয়াছিল। অদূরে রন্ধনরতা রসুলের বোন নছিরনকে দেখিতে দেখিতে কুবের মনে মনে একটু আপসোস করিল। ভাবিল, কি ক্ষতি মুসলমানের হাতে রাঁন্না খাইলে? ডাঙ্গার গ্রামে যাহারা মাটি ছানিয়া জীবিকা অর্জন করে তাহাদের মধ্যে ধর্মের পার্থক্য থাক, পদ্মা নদীর মাঝিরা সকলে এক ধর্মী। গণেশ, শম্ভু ওরা সঙ্গে না থাকিলে কুবের তো নিজের জন্য রাঁধিতে বসিত না।’ এখানে হোসেন মিয়া চরিত্রটি অঙ্কন করেছেন লেখক মনের মাধুরী মিশিয়ে। এ জাতীয় চরিত্র বাংলা সাহিত্যে দুটি বোধ হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না।
মার্কসীয় তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শহরতলী’ উপন্যাসটি। এ উপন্যাসের প্রধান স্তম্ভ যশোদার মতো চরিত্র বাংলা সাহিত্যে আর নেই। সর্বহারার আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন এতে প্রকাশ পেয়েছে। যশোদার মনোভাব থেকে দেখি : “রাঁন্না করিতে করিতে যশোদা ভাবে ‘না তার কুলী মজুররাই ভাল। এদের যদি আপন না করিবে আপন হইবে কারা? সত্য প্রিয়ের মতো যারা বড়লোক অথবা জ্যোতির্ময়ের মতো যারা ভদ্রলোক?…. সুবীরের মত একজন করিয়া প্রত্যেকদিন তার সঙ্গে বেয়াদবি করুক তবু যশোদা চিরদিন এদেরই ভালবাসিবে।” যশোদার এই জন্মগত স্বভাবই শ্রেণী চেতনা। শ্রেণী হিসেবে সর্বহারাদের প্রতি মানিকের মমত্ববোধ এত তীব্র।

১১

মানিকের মার্কসীয় দর্শনের উত্তরণ ঘটেছে ‘দর্পন’ উপন্যাসে। জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের বৃহত্তর পটভূমিতে ধারা বদলের লক্ষণ রয়েছে এতে। ‘দর্পন’ উপন্যাস দেখিয়ে দেয় যে, মার্কসীয় দর্শনেই অদম্য মুক্তি সংগ্রামের ভবিষ্যতবাদী আশাবাদী পরিপ্রেক্ষিতরূপে গ্রহণ করেছেন। দর্পনে শিল্পপতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে তাঁর ছেলেই। এই উপন্যাসেই মানিক শ্রেণী সংগ্রামের দলিল রচনা করেছেন। ‘দিবারাত্রির কাব্যের’ চরিত্র সম্পর্কে বলা হয়েছে : চরিত্রগুলি কেউ মানুষ নয়, মানুষের এক এক টুকরো মানসিক অংশ। ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসে শশী চরিত্রের মধ্য দিয়ে রেমান্টিক ও বাস্তব এ দুটো দিক উদ্ঘাটন করেছেন লেখক। জনৈক সমালোচক শশী চরিত্রের সঙ্গে আলবেয়ার ক্যামুর তুলনা করেছেন। অবশ্য ‘প্লেগের’ বহু পূর্বে মানিকের পুতুল নাচের ইতিকথা প্রকাশ পায়। অহিংসা উপন্যাসে আশ্রমের ভণ্ডামি, ধর্মান্ধতা ও যৌন লালসার উদ্ভট কাহিনী মার্কসীয় বস্তুনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে বর্ণনা করা হয়েছে। দেশ ও পৃথিবীতে যে অগণিত মেহনতি সর্বহারা মানুষ রয়েছে যারা সমাজে ধিক্কৃত, লাঞ্ছিত, অপমানিত সেই সর্বহারাদের স্বার্থক জীবন রূপকার হলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

১২

বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘকাল রূপায়িত হয়েছে অভিজাত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির নর-নারীর জীবনালেখ্য। বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-শরৎ সাহিত্যের পুরোভাগে রয়েছে সামন্ত-জমিদার এবং অভিজাত নর-নারীর জীবনের চালচিত্র। এসব নার-নারীর জীবন ফাঁপা, বাস্তবতাবর্জিত এবং কৃত্রিম। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কাছে থেকে দেখেছেন ভদ্রজীবনে কৃত্রিমতার আড়ালে ঢাকা থাকে জীবনের বাস্তবরূপ, অপূর্ণ থেকে যায় মানুষের নানা আশা-আকাক্সক্ষা। নিঃস্ব, খেটে খাওয়া ও অভাবতাড়িত মানুষের সংস্পর্শে এসে মানিক মধ্যবিত্ত জীবনের অসঙ্গতিসমূহ উপলব্ধি করলেন এবং লিখেলেন : ভদ্রজীবনে অনেক বাস্তবতা কৃত্রিমতার আড়ালে ঢাকা থাকে, গরীব অশিক্ষিত খাটুয়ে মানুষের সংস্পর্শে এসে এই বাস্তবতা উলঙ্গরূপে দেখতে পেতাম, কৃত্রিমতার আবরণটা আমার কাছে ধরা পড়ে যেতো। মধ্যবিত্ত সুখী পরিবারের শত শত আশা-আকাক্সক্ষা অতৃপ্ত থাকায়, শত শত প্রয়োজন না মেটার চরম রূপ দেখতে পেতাম নিচের তলার মানুষের দারিদ্র্য-পীড়িত জীবনে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উপলব্ধিজাত চেতনা; অর্থাৎ নিম্নবিত্তের দারিদ্র্য-লাঞ্ছিত জীবন, জীবনের নেতিবাচক দিক এবং অস্পৃশ্য-অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ সাহিত্যে স্থান পেতে থাকলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে। এ সময় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত এবং দর্শন-বিজ্ঞান-শিল্পকলার নানা তত্ত্ব এবং বাদ-মতবাদের প্রভাবে প্রচলিত মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও সংস্কারে ফাটল ধরলো।

১৩

নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং সমাজের নীচুতলার মানুষকে সাহিত্যে স্থান দিয়ে সমসাময়িক অন্যান্য লেখকের মতোই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বাংলা সাহিত্যের বাস্তবতার অভাব খানিকটা’ মিটিয়েছেন। তাঁর ছিল বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টি। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে এ বিষয়ে পঠন-পাঠন ও আগ্রহ যেমন তাঁর ছিল, তেমনি দর্শন-মনস্তত্ত্বের নানা বিষয় এবং বিশ্বসাহিত্যের অধ্যয়নলব্ধ জ্ঞান মানিকের শিল্পীসত্তাকে ঋদ্ধ করেছে। তিনি নিজেই বলেছেন : ‘আমি ছিলাম বিজ্ঞানের ছাত্র এবং যেমন আগ্রহ নিয়ে বিজ্ঞান পড়তাম তেমনি আগ্রহ নিয়েই আরম্ভ করেছিলাম যৌনবিজ্ঞান, মনস্তত্ব আর বিশ্বসাহিত্য পড়া।’ মানিক উপলব্ধি করেছিলেন বিজ্ঞানের যুগে বাস করে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকাটা সাহিত্যিকের জন্য যথার্থ নয়। অধ্যাত্মবাদী ভাবুকের দৃষ্টি নিয়ে সাহিত্যচর্চা করাকে তিনি যথাযথ মনে করেন নি। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিজ্ঞান প্রভাবিত মন উপন্যাস লেখার জন্য অপরিহার্যরূপে প্রয়োজন।’ এজন্যই লিখেছিলেন, সাহিত্যিকেরও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন, বিশেষ করে বর্তমান যুগে, কারণ তাতে অধ্যাত্মবাদ ও ভাববাদের অনেক চোরা মোহের স্বরূপ চিনে সেগুলি কাটিয়ে ওঠা সহজ হয়। মানিক তাই বিবরণধর্মী কথাকারদের বিপরীতে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছেন। জীবনকে যে সরল মুকুর ছাড়াও দেখা যায়, অসংখ্য অবতল-উত্তল দৃক ছাড়াও অবচেতনের আরেক দুনিয়ার মাধ্যমে চরিত্রেরা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে, মানিকের মতো এত স্পষ্ট করে আর কেউ অঙ্কন করেননি। ক্রমাগত ভার্চুয়াল সার্ফিংয়ের জগতে পাঠকেরা যখন সাহিত্যের অসংখ্য বিকল্পের মধ্যে হাতড়ে বেড়ান জীবনের প্রতীতি, তখনই ক্যালেন্ডারের পাতা বদলানোর অজুহাতে হলেও ঠিকই স্মরণ করতে হয় মানিক-নক্ষত্রকে। এই নক্ষত্র আমাদের আলোকিত করে যাচ্ছে শতাব্দী পেরিয়ে।

১৪

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন অভিজ্ঞতা ছিল ব্যাপক ও গভীর। ফলে তিনি জীবনের দিকটি দেখতেন তার সমগ্রতায়, খণ্ড খণ্ড করে নয়, অখণ্ডতায়। এটি তাঁর প্রধান গুণ এবং লেখক মাত্রেরই শ্রেষ্ঠ গুণ। তিনি যেমন ফ্রয়েডীয় মতবাদে প্রভাবিত হয়েছিলেন, ঠিক তেমনি জীবনের, মনুষ্য জীবনের মুক্তি দেখেছিলেন মার্কসবাদে। মার্কসবাদই তাঁকে দীক্ষা দেয়। এই মতবাদেই তিনি জীবন ও জগৎ সম্পর্কে যে বিশ্বাস পোষণ করেন, তাই তাঁর সাহিত্য জীবনের পাথেয়। মনে রাখতে হয়, ব্যক্তিগতভাবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মধ্যবিত্ত মানসিকতারই উত্তরাধিকারী। তাঁর প্রথম গল্পগুচ্ছ ‘অতসী মামী ও অন্যান্য’ সংকলনে সব কয়টি গল্প এবং প্রথম উপন্যাস ‘দিবারাত্রির কাব্য’ মধ্যবিত্ত জীবনভিত্তিক কাহিনী নিয়ে গড়া। মানিক বন্দোপাধ্যায় যখন কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের মুখে এসেছিলেন, তখন থেকেই বাঙালির মধ্যবিত্ত জীবনে সার্বিক অবক্ষয়ের চেতনা চারপাশ হতে ঘিরে চেপে বসতে চাইছিল। বিশ্বজোড়া মধ্যবিত্ত বৈমানসিকতা বোধের তাড়নায় বাংলা সাহিত্য তখন পীড়িত। পাঠকের অভিজ্ঞতাতেও এ নিয়ে তারতম্য ছিল না। তবু তাঁর অন্তরের আকাঙ্ক্ষা ছিল অন্ধকারের নিরবচ্ছিন্নতাকে উতরিয়ে উত্তরণের পথ খোঁজার। সে জন্যই তিনি চিরস্মরণীয় ও বরণীয়।

তথ্যসূত্র : বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট

১৯ মে ২০২১


আবদুল্লাহ আল মোহন

পাবনা জেলার যমুনাতীরের নগরবাড়ী ঘাটের সন্তান আবদুল্লাহ আল মোহন। বর্তমানে ভাসানটেক সরকারী কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ বিষয়ে গবেষণায় দেশ-বিদেশের আগ্রহী পাঠকদের মাঝে তাঁর রচনা যেমন মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, তেমনি মনস্বী শিক্ষাবিদদের কাছেও পেয়েছেন উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। ভাসানটেক সরকারী কলেজের মুজিববর্ষ পালন কমিটির আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মোহনের ইতিমধ্যে মুজিববর্ষেই প্রকাশিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সংক্রান্ত গবেষণামূলক গ্রন্থ এবং ভ্রমণগদ্য- ‘খোকা থেকে মুজিব : বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা’, ‘সম্পর্কের সেতুবন্ধনে : বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা’, ‘বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ’, ‘হাসু থেকে শেখ হাসিনা : জননেত্রী থেকে বিশ্বনেত্রী’ এবং ভ্রমণকাহিনি ‘দৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টির ভারত ভ্রমণ’। প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে আরো কয়েকটি গ্রন্থ। শিক্ষাকে শিক্ষার্থীর জন্য সৃজনশীল ও আনন্দময় করে তুলতে মোহনের অভিনব প্রচেষ্টা আনন্দময় সহশিক্ষার সৃজনশীল আয়োজন ‘মঙ্গল আসর’ এবং ‘গড়ি ঘরে ঘরে পাঠাগার’ কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য। সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগেও তৈরি করা হয়েছে তথ্যচিত্র ‘মোহনের মঙ্গল আসর।
পাবনা জেলার যমুনাতীরের নগরবাড়ী ঘাটের সন্তান আবদুল্লাহ আল মোহন। বর্তমানে ভাসানটেক সরকারী কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ বিষয়ে গবেষণায় দেশ-বিদেশের আগ্রহী পাঠকদের মাঝে তাঁর রচনা যেমন মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, তেমনি মনস্বী শিক্ষাবিদদের কাছেও পেয়েছেন উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। ভাসানটেক সরকারী কলেজের মুজিববর্ষ পালন কমিটির আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মোহনের ইতিমধ্যে মুজিববর্ষেই প্রকাশিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সংক্রান্ত গবেষণামূলক গ্রন্থ এবং ভ্রমণগদ্য- ‘খোকা থেকে মুজিব : বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা’, ‘সম্পর্কের সেতুবন্ধনে : বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা’, ‘বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ’, ‘হাসু থেকে শেখ হাসিনা : জননেত্রী থেকে বিশ্বনেত্রী’ এবং ভ্রমণকাহিনি ‘দৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টির ভারত ভ্রমণ’। প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে আরো কয়েকটি গ্রন্থ। শিক্ষাকে শিক্ষার্থীর জন্য সৃজনশীল ও আনন্দময় করে তুলতে মোহনের অভিনব প্রচেষ্টা আনন্দময় সহশিক্ষার সৃজনশীল আয়োজন ‘মঙ্গল আসর’ এবং ‘গড়ি ঘরে ঘরে পাঠাগার’ কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য। সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগেও তৈরি করা হয়েছে তথ্যচিত্র ‘মোহনের মঙ্গল আসর।


মানিক দর্শন: কেন লেখেন?

One thought on “মানিক দর্শন: কেন লেখেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top
error: Content is protected!!
Share via
Copy link
Powered by Social Snap