ভিক্টর হুগো

উনিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী রোমান্টিক লেখক ভিক্টর হুগো ১৮০২ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সের বেসানকনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও মানবাধিকারকর্মী। তার পুরো নাম ভিক্টর মারি হুগো। তার বাবা ছিলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা। কবিতা, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের অনেক দিকেই ছিল ভিক্টর হুগোর অবাধ বিচরণ। পাশাপাশি তিনি ৪ হাজারেরও বেশি চিত্রকর্ম এঁকেছিলেন। ‘লা মিজারেবল’ ও ‘হাঞ্চব্যাক অব নটরডেম’ তার অমর সৃষ্টি।

ভিক্টর হুগোর শৈশব কেটেছে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে। তার জন্মের দুই বছর পর নেপোলিয়ন ফ্রান্সের সম্রাট হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। যেহেতু তার বাবা নেপোলিয়নের শাসনকালে একজন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন, তাই পরিবার নিয়ে প্রায়ই তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যেতে পারতেন। এইসব ভ্রমণ থেকে হুগো অনেক কিছু শিখেছিলেন। এই শেখাগুলো পরবর্তীতে তার সাহিত্যে ফুটে ওঠেছে।

রোমান্টিসিজম সাহিত্যিক ধারার অগ্রপথিক চ্যাটুব্রায়েন্ডের বিশেষ প্রভাব পড়েছিল ভিক্টর হুগোর লেখনীতে। ক্যারিয়ারের শুরুতেই তার প্রতিজ্ঞা ছিল চ্যাটুব্রায়েন্ডের মতো লেখালেখির দক্ষতা অর্জন করার।

সাহিত্যে ফ্রান্সের প্রচলিত ধারা ভেঙে নতুন ধারার সূচনা করেন হুগো। একারণে তাঁকে ফ্রান্সের রোমান্টিক কাব্য আন্দোলনের পথিকৃৎ বলা হয়ে থাকে। গীতি কবিতায় ছন্দের সুষম প্রয়োগ ঘটিয়ে তিনি ফরাসি কাব্য জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর রচনার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ছিল মানুষের মুক্তি। ফ্রান্সের জনগণকে অন্ধকার আর গ্লানি থেকে মুক্তির আলোয় আলোকিত করে সমাজ রূপান্তরের স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি। এজন্যে হুগোকে সমাজ সংস্কারকও বলা হয়ে থাকে। সম্রাটের স্বেচ্ছাচারিতা তাঁকে ভীষণভাবে পীড়া দিত। ভিক্টর হুগো রাজা লুইস নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে তীব্র শ্লেষ জানান তাঁর লেখনির মাধ্যমে। এরপর স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়ে চলে যান। গারনসি দ্বীপে দীর্ঘ ঊনিশ বছর নির্বাসিত জীবনযাপনকালেই তিনি রচনা করেন বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লা মিজারেবল’, ‘দ্য ম্যান হু লাভস’, এবং ‘টয়লার্স অব দ্য সি’।

ভিক্টর হুগো সংসদ সদস্য হয়েছেন একাধিকবার। অন্যদিকে ধর্মবিশ্বাস নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত ছিলেন সারা জীবন। শেষদিকে নিজেকে পরিচয় দিতেন মুক্ত চিন্তাশীল হিসেবে। সঙ্গীতের বিভিন্ন শাখায় ছিল তার অপূর্ব দক্ষতা। সঙ্গীত নিয়ে তার বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ রচনা রয়েছে। চিত্রকরতো তিনি ছিলেনই, চিত্র সমালোচক হিসেবেও ছিলেন সমান পারদর্শী।

‘ওডেস এট পয়েসিস ডাইভারসেস’ নামে তার প্রথম কবিতা সঙ্কলন প্রকাশিত হয় ১৮২২ সালে। এ গ্রন্থের জন্য রাজা অষ্টাদশ লুইয়ের ভাতা পেতেন তিনি। ১৮২৩ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস ‘দ্য হ্যান্ড আইল্যান্ড’। ১৮২৯ থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যেই তার পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ‘লা অরিয়েন্টালিস’ ও ‘লা ভক্স ইন্টেরিয়রস’ তৎকালীন ইউরোপের কাব্য জগতে আলোড়ন তোলে। ১৮২৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘ওড টু ব্যালাডস’ নামের কাব্যগ্রন্থ। ১৮২৯ সালে রচনা করেন উপন্যাস ‘দি লাস্ট ডে অব এ কন্ডেমড ম্যান’। ১৮৩০ সালে লিখেন সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘হাঞ্চব্যাক অব নটরডেম’। এরপর লিখেন বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম ক্ল্যাসিক উপন্যাস ‘লা মিজারেবল’। ১৮৬২ সালে প্রকাশিত হয় বইটি। তখন এটি নিয়ে হইচই পড়ে যায়। এ প্রসঙ্গে নানা সমালোচনা এবং নানা খবর পত্রপত্রিকায় আসে। কিন্তু সেখান থেকে ভিক্টর হুগো বুঝতে পারলেন না বইটি বিক্রি হচ্ছে কেমন। অবশেষে তিনি এর উত্তর জানার জন্য প্রকাশককে খুব সংক্ষেপে একটা চিঠি পাঠালেন শুধু ‘?’ লিখে। প্রকাশক ‘?’ এর মানে বুঝতে পারলেন এবং জবাব দিলেন ‘!’। এটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট চিঠি আর তার উত্তর। উপন্যাসের নায়ক জা ভালজাকে কেন্দ্র করে বেড়ে ওঠে গল্পটি, যা ছিল এক বিবর্তনধর্মী চরিত্র এবং বিশ্বসাহিত্যে বিরল। এটা কোনো সাধারণ উপন্যাস নয়। জীবনের জয়-পরাজয়, উত্থান-পতন, সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, অভিলাষ সংবলিত এক মহা অধ্যায়।

ভিক্টর হুগোর ‘হাঞ্চব্যাক অব নটরডেম’ উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্বকে লেখক উপস্থাপন করেছেন দারুণ দক্ষতায়। লেখক এই উপন্যাসেও আর্চডিকন ক্লদ ফ্রোলোর মনের ভেতরে ভালো ও মন্দের প্রবল দ্বন্দ্ব দেখিয়েছেন, দেখিয়েছেন কবি-দার্শনিকের দোদুল্যমানতা। দেখিয়েছেন বাহ্যিকভাবে যাকে দানব মনে হয়, সেই কিয়েসিমোদোর ভেতরকার অপূর্ব মানবিক সত্ত্বা। সেইসঙ্গে মধ্যযুগের ইউরোপে রাষ্ট্র ও ধর্ম কীভাবে একত্রিত হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করত, তার বর্ণনা উঠে এসেছে। সে যুগের কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ, গরিবদের প্রতি উচ্চবিত্তদের মনোভাব, শাসকদের শোষণ-নিপীড়নসহ অনেক বাস্তবতাই তুলে এনেছেন ঔপন্যাসিক। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠে এসেছে এক মানবিক প্রেমের গল্প।

ব্যক্তিজীবনে খুব অল্প বয়সেই ভিক্টর হুগো প্রেমে পড়েন এডেলি ফাউচারের। ভিক্টরের মায়ের এ সম্পর্ক নিয়ে মন খারাপ থাকলেও তারা পিছপা হন নি। এমনকি তারা গোপনেই ঘর বাঁধেন। ১৮২৩ সালে তাদের প্রথম সন্তান লিওপল্ডের জন্ম হয় এবং পরপরই মারা যায়। এরপর তারা আরও ৪ সন্তানের বাবা-মা হন।

হুগোর জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা তার মেয়ে ও মেয়ের স্বামীর মৃত্যু। ১৮৪৩ সালে বিয়ের পরপরই হানিমুনে বেরিয়েছিল লিওপল্ডাইন ও তার বর। স্কার্টে পা জড়িয়ে নৌকা থেকে লিওপল্ডাইন পড়ে গেলে তার স্বামী তাকে বাঁচানোর জন্য পানিতে লাফিয়ে পড়েন। দুজনই সেখানে মারা যান। এসময় হুগো তার স্ত্রীকে নিয়ে ভ্রমণে ছিলেন দক্ষিণ ফ্রান্সে। সেখানে একটি ক্যাফেতে পত্রিকা পড়ে এ খবর জানতে পারেন।

১৮৮৫ সালের ২২ মে ভিক্টর হুগো প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেন।

ভিক্টর হুগো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top
error: Content is protected!!
Share via
Copy link
Powered by Social Snap