শান্তিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম নারী: বের্টা ফন জুটনার [Bertha von Suttner]

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী

সম্পাদক, ঝিনুক

অস্ট্রীয় ঔপন্যাসিক বের্টা ফন জুটনার শান্তিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম নারী। পুরো নাম বের্টা ফেলিৎসিটাস জোফিয়ে ফ্রাইফ্রাউ ফন জুটনার।

৯ জুন ১৮৪৩ সালে তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়ার (বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্র) রাজধানী প্রাগ শহরের এক অভিজাত পরিবারে বের্টা জন্মগ্রহণ করেন। মায়ের নাম জোফি ফন কোরনার এবং পিতা জোসেফ কাউন্ট কিনস্কি। বের্টার জন্মের আগেই তার বাবা মারা যান।

বের্টার মা অস্ট্রিয় আভিজাত্যপূর্ণ উচ্চশিক্ষায় তাকে বড় করে তোলেন। মাতৃভাষা জার্মান ছাড়াও তিনি অন্য কয়েকটি বিদেশি ভাষা শিক্ষা করেন। বের্টা ফরাসি, ইংরেজি ও ইতালিয় ভাষায় অনর্গল কথা বলতে সক্ষম ছিলেন। তিনি প্রচুর পড়াশোনা এবং ভ্রমণে আগ্রহী ছিলেন এবং সঙ্গীতেও দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। বের্টার মায়ের জুয়াখেলার অভ্যাস ছিল। ক্রমশ তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা দূর্বলতর হয়ে পড়ছিল। এমনই এক সময়ে অর্থাৎ বের্টার বয়স যখন ত্রিশ বছর, তখনই তিনি ভিয়েনা শহরের নিকটের এক গ্রামে অভিজাত এক ব্যারন পরিবারে গৃহশিক্ষিকার চাকুরি গ্রহণ করেন। ধনকুবের ফন জুটনার পরিবারে আর্ল পদমর্যাদার নারী বের্টা শিক্ষকতা করতে করতেই তার চাইতে সাত বছরের ছোট আর্থার ফন জুটনারের প্রেমে পড়েন। আর্থার ছিলেন জুটনার পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান। বের্টা এবং আর্থার বিয়ে করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। ফন জুটনার পরিবারের কর্তাগণ এই বিয়ের বিরোধিতা করেন। বের্টা এরপর প্যারিসে চলে যান। সেখানে তিনি ওই সময়ের ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম আলফ্রেড নোবেলের হয়ে কাজ শুরু করেন। আলফ্রেড বের্নহার্ড নোবেল ছিলেন একজন সুয়েডীয় রসায়নবিদ, প্রকৌশলী, উদ্ভাবক এবং অস্ত্র নির্মাতা। তিনি ডায়নামাইট আবিষ্কার করেন। ১৮৭৩ সালে ৪০ বছর বয়সে আলফ্রেড নোবেল প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী হন। তখন থেকে নোবেল প্যারিস গিয়ে মালাকফ এভিনিউ এ থিতু হন। একই বছর আর্ডিয়ারের কারখানায় নাইট্রোগ্লিসারিন ও ডায়নামাইট উৎপাদন শুরু হয়। বের্টা ১৮৭৬ সালে আলফ্রেড নোবেলের একটি বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে প্যারিসে নোবেলের বাড়িতে সচিবের দায়িত্ব গ্রহন করেন। কিন্তু প্রণয়-পীড়িত বের্টা বেশিদিন প্যারিসে থাকতে পারেন নি। কিছুদিন পরই তিনি ভিয়েনায় ফিরে আসেন এবং গোপনে আর্থারকে বিয়ে করেন। এরপর তারা উভয়েই তৎক্ষণাত ককেশাসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। অল্প সময়ের জন্য প্যারিসে অবস্থান করলেও, তিনি আলফ্রেড নোবেলকে ভুলে যান নি। নোবেলের সাথে বের্টা অবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। আলফ্রেড নোবেল ১৮৯৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। নোবেল আমৃত্যু বের্টা ফন জুটনারকে ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও প্রিয়পাত্র হিসেবে বিবেচনা করতেন। আর্থার এবং বের্টা দম্পতি ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত নয় বছরের জন্য জর্জিয়ায় অবস্থান করেন। তারপর তারা দুজনেই ভিয়েনায় ফিরে আসেন।

জর্জিয়ায় কাটানো বছরগুলো বের্টা- আর্থার দম্পতির জন্য সুখকর ছিল না। প্রথমদিকে ভাষা এবং সংগীত শিক্ষাদানের মাধ্যমে তারা রোজগার শুরু করেন। পরের দিনগুলোতে সংবাদপত্রের নিবন্ধ এবং বই লিখে এই দম্পতি কোনোরকমে জীবিকা নির্বাহ করতে সফল হয়েছিলেন।

অস্ট্রিয়ায় ফিরে আসার পর বের্টা আন্তর্জাতিক শান্তি কার্যক্রম সম্পর্কে জ্ঞাত হন এবং এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৮৮৯ সালে ‘জনৈক’ ছদ্মনামে প্রকাশিত তার ‘দ্য মেশিন এজ’ গ্রন্থে তিনি তার বিশ্বাস সম্পর্কে লিখেছিলেন যে প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিই যুদ্ধের অবসান ঘটাবে। কারণ যুদ্ধ কেবল মানবজীবনই ধ্বংস করে না, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতেও বাধা সৃষ্টি করে। একই বছর অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সিংহাসনের উত্তরাধিকারী এবং সম্রাটের একমাত্র পুত্র, ক্রাউন প্রিন্স রুডলফ ও তার প্রেমিকা আত্মহত্যা করেছিলেন।

‘দ্য মেশিন এজ’ গ্রন্থটি সফল হলেও, একই বছরের শেষের দিকে প্রকাশিত তার পরবর্তী উপন্যাস ‘ডাই ওয়াফেন নিডার’ (ইংরেজি অনুবাদ ‘লো ডাউন ইয়োর আর্মস’) তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এবং স্বীকৃতি এনে দিয়েছিল। লেখক ও শান্তিকর্মী বের্টার সর্বাধিক পরিচিত উপন্যাস ‘ডাই ওয়াফেন নিডার’। ১৮৮৯ সালে ড্রেসডেনের প্রকাশক এডগার পিয়ারসন জার্মান ভাষায় উপন্যাসটি প্রকাশ করেছিলেন। যুদ্ধ ও শান্তির প্রতি দৃষ্টিপাতের কারণে এবং সমাজের নারীজীবনের সমস্যার প্রতি আলোকপাত করার কারণে খুব দ্রুত উপন্যাসটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। উপন্যাসটির পাঠকপ্রিয়তা ও প্রভাবকে কখনও কখনও হ্যারিয়েট বিচার স্টো -এর লেখা উনিশ শতকের সেরা বেষ্ট-সেলিং উপন্যাস ‘আংকেল টমস কেবিন’ -এর সাথে তুলনা করা হয়েছিল। প্রথম প্রকাশের তিন বছর পরে এটি ইংরেজিতে ‘লো ডাউন ইয়োর আর্মস’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। তারপরে ১৮৯৭ সালে ইতালিয় এবং স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল উপন্যাসটি। ১৯০৫ সালের আগেই উপন্যাসটির মোট ৩৭টি জার্মান সংস্করণ ছাপা হয়েছিল। এটি ফিনিশ, ডেনিশ, নরওয়েজিয়ান, সুইডিশ এবং চেক সহ মোট ষোলটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯২৯ সালে ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ প্রকাশের আগ পর্যন্ত ‘ডাই ওয়াফেন নিডার’ ছিল যুদ্ধ সম্পর্কিত জার্মান ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যের গ্রন্থ। বের্টা ফন জুটনার একটি নন-ফিকশন বইয়ের পরিবর্তে উপন্যাস লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে উপন্যাসের রূপটি ব্যাপকহারে পাঠকের কাছে পৌঁছে যাবে। বের্টা একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন যার নাম ডাই ওয়াফেন নিডার। ডাই ওয়াফেন নিডার উপন্যাস অবলম্বনে ১৯১৪ সালে এবং ১৯৫২ সালে মোট দুটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছিল।

বের্টা ফন জুটনার ১৮৯১ সালে একটি শান্তিকামী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত ‘লো ডাউন ইয়োর আর্মস’ উপন্যাস প্রকাশের পর বের্টা ফন জুটনার ধীরে ধীরে শান্তি আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ১৮৯২ থেকে ১৮৯৯ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক শান্তিকামী সাময়িকীর সম্পাদক থাকাকালে বের্টা আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। হেনরি থমাস বাকল, হার্বার্ট স্পেন্সার এবং চার্লস ডারউইনের রচনা তার শান্তিকামী চেতনাকে প্রভাবিত করেছিল। আলফ্রেড নোবেলের সাথে তার সাক্ষাৎ অল্প কিছুদিনের জন্যে হলেও ১৮৯৬ সালে নোবেলের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার সাথে বের্টার চিঠি আদান-প্রদান হয়েছে। ধারণা করা হয় যে, আলফ্রেড নোবেল তার সকল অর্থ যে সকল পুরস্কারের জন্য উইল করে দিয়েছিলেন তার মধ্যে ‘শান্তি পুরস্কার’ সংযুক্ত করার পিছনে বের্টার এক বিশাল প্রভাব রয়েছে। বের্টা ফন জুটনার নিজে ১৯০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারটি অর্জন করেছিলেন।

১৯০৪ সালে, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে জনবহুল শহর বোস্টনে ইউনিভার্সাল পিস কংগ্রেসে অংশ নেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিনি সর্বদা প্রশংসিত ছিলেন। সেবার ভ্রমণের সময় তিনি বিশাল দেশটির অনেক স্থানে শান্তির স্বপক্ষে বক্তৃতা করেছিলেন। এর অনেক আগেই ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত তার ‘হাই ল্যান্ড’ উপন্যাসে তিনি লিখেছিলেন, “ওহ, আমার তারকাখচিত পতাকার দেশ, আমার দুর্দান্ত, প্রবল, বুদ্ধিমান, স্বাধীনতা-প্রেমী দেশ!”

১৯০৪ সালের ১৭ অক্টোবরে বের্টাকে হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রপতি থিওডোর রুজভেল্টের পক্ষ থেকেও স্বাগত জানানো হয়েছিল। সেখানে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “বিশ্ব শান্তি আসছে, নিশ্চয়ই আসছে, তবে অবশ্যই ধাপেধাপে”। রাশিয়া-জাপান যুদ্ধ অবসানে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার জন্য থিওডোর রুজভেল্টকে ১৯০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরষ্কার দেওয়া হয়। ১৯১২ সালে, প্রায় ৭০ বছর বয়সে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত ম্যারিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বৃহত্তম শহর বাল্টিমোরের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় দফায় আন্তসংযোগে বক্তৃতা সফরে গিয়েছিলেন। সেই সময়, মার্কিন যুক্তরাস্ট্র সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছিল। আলফ্রেড ফ্রাইডকে লেখা একটি চিঠিতে মার্কিন প্রশান্তিবাদ সম্বন্ধে বের্টাকে কিছুটা সন্দেহ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। আলফ্রেড ফ্রাইড ছিলেন বের্টার শান্তি আন্দোলনের সহযোদ্ধা অস্ট্রিয় নাগরিক যিনি পরবর্তীতে ১৯১১ সালে ডাচ আইনজ্ঞ টোবিয়াস আসার এর সঙ্গে যুগ্মভাবে নোবেল শান্তি পুরষ্কার পেয়েছিলেন। যদিও তখন মার্কিন জনসাধারণ বের্টাকে কে ‘শান্তির দেবদূত’ হিসাবেই প্রশংসা করেছিল।

১৯১৪ সালে বের্টা ফন জুটনারের বিখ্যাত উপন্যাস ‘ ডাই ওয়াফেন নিডার’ চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়। নরডিস্ক ফিল্মস কোম্পানির বিখ্যাত চলচ্চিত্র প্রযোজক হোলগার মাডসেন এবং কার্ল থিওডর চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেন। ২০০৫ সালে জার্মানিতে বের্টা ফন জুটনারের স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করা হয়। অস্ট্রিয়ার ২ ইউরো মুদ্রায় জুটনারের ছবি চিত্রিত করা হয় এবং এর পূর্বে অস্ট্রীয় ১০০০ শিলিং ব্যাংকনোটেও তার ছবি চিত্রায়ণ করা হয়েছিল।

ইতিমধ্যে বের্টার শরীরে ক্যান্সারের মতো দূরারোগ্য ব্যাধি বাসা বাঁধতে শুরু করে। তা সত্বেও তিনি ১৯১৩ সালে হেগ আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। ১৯১৪ সালের আগস্টে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিতব্য ২১তম পিস কংগ্রেসের প্রস্তুতির সাথেও জড়িত হন। ভিয়েনার শান্তি সম্মেলনটি বাস্তবে আর হয়ে ওঠে নি। ইউরোপকে ধ্বংসস্তূপ ও ছাইয়ের গাদায় রুপান্তরিত করার কারণ বলে চিহ্নিত দু দুটো বিশ্বযুদ্ধের ফলে উনিশ শতকের মহান শান্তিবাদী আন্দোলনের তৎপরতা ও প্রত্যাশাসমূহের বিনাশ ঘটে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই। ৬ কোটি ইউরোপীয়সহ আরো ৭ কোটি সামরিক বাহিনীর সদস্য ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এই যুদ্ধে সামিল হয়। অস্ট্রিয়ার যুবরাজ, অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের হবু সম্রাট আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড সিংহাসনে আরোহণের কিছুদিন আগে ১৯১৪ সালের ১৮ জুন বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো শহরে স্ত্রীসহ সার্বিয়ান বিচ্ছিন্নতাবাদী আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। অস্ট্রো-হাঙ্গেরি এই হত্যাকাণ্ডের জন্য সার্বিয়াকে দায়ী করে এবং ওই বছরের ২৮ জুলাই সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এ যুদ্ধে দু’দেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে। এতে যোগ দিয়েছিল সে সময়ের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী সকল দেশ। এভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) সূচনা হয়। তবে অস্ট্রিয়ার যুবরাজের হত্যাকাণ্ডই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একমাত্র কারণ ছিল না। উনিশ শতকে শিল্পে বিপ্লবের কারণে সহজে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য উপনিবেশ স্থাপনে প্রতিযোগিতা এবং আগের দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইত্যাদিও প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একপক্ষে ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্য, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, জার্মানি ও বুলগেরিয়া। যাদের বলা হতো কেন্দ্রীয় শক্তি। আর অপরপক্ষে ছিল সার্বিয়া, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জাপান, ইতালি, রুমানিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগেই ১৯১৪ সালের ২১ জুন অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরে ৭১ বছর বয়সে বের্টা ফন জুটনার মৃত্যুবরণ করেন। বের্টা তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘লো ডাউন ইয়োর আর্মস’ এর জন্যই ১৯০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। তিনি কেবল শান্তির কর্মীই ছিলেন না, তিনি উদার ধারণার চেতনা, উপযোগী দৃষ্টিভঙ্গি এবং নারী অধিকারের বিষয়েও সোচ্চার ছিলেন। তিনি এবং তার স্বামী আর্থার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে সংগ্রাম করেছিলেন যার ফলে কেউ কেউ তাকে ‘ইহুদি বের্টা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি নারীর অধিকারের জন্যও লড়াই করেছিলেন এবং ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সংস্থা ‘অস্ট্রিয়ান উইমেনস অ্যাসোসিয়েশনস লীগ’-এ সক্রিয় ছিলেন, যেখানে তিনি শান্তি কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক শান্তি-আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব বের্টাকে দেখে যেতে হয় নি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা। দশ মিলিয়ন সৈন্যের মৃত্যু এবং অজস্র মানুষের আজীবন পঙ্গুত্বও তাকে দেখতে হয় নি। শান্তির জন্য তার দীর্ঘদিনের অবিরাম লড়াই এই যুদ্ধের ফলে যেন অর্থহীন ও ব্যর্থতায় পর্যবর্সিত হয়ে পড়েছিল। তবুও বিশ্ব মানবের শান্তি কামনায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে নেয়া শান্তির শপথে বের্টা ছিলেন অবিচল। তার মতো পরিশ্রমী ও অনন্য ব্যক্তিত্বসম্পন্না নারী হয়তো আর কখনোই পৃথিবীতে আসবে না। কিন্তু যে সুন্দর সমাজ ভাবনা ও শান্তিতে সহাবস্থানের স্বপ্নশিখা তিনি তুলে ধরেছিলেন বিশ্ববাসীর কাছে, সেই শিখা প্রকাণ্ড আলোর মশাল হয়ে জ্বলতে থাকবে; যতদিন পৃথিবীর মানুষ তা দীপ্যমান রাখতে পারবে। এভাবেই বের্টা ফন জুটনারের চিন্তাধারা পৃথিবীতে অমর হয়ে থাকবে।

শান্তিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম নারী: বের্টা ফন জুটনার [Bertha von Suttner]

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Scroll to top
error: Content is protected!!
Share via
Copy link
Powered by Social Snap