ইতিহাস কথা বলা অনন্য ভ্রমণ

অধ্যাপক মাহমুদা খাতুন

অধ্যক্ষ, ভাসানটেক সরকারি কলেজ, ঢাকা
আবদুল্লাহ আল মোহনের ‘দৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টির ভারতভ্রমণ‘

বই আলোচনা: আবদুল্লাহ আল মোহনের ‘দৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টির ভারতভ্রমণ‘

“থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎটাকে”- শুধু নজরুল কেন, জগৎটাকে দেখার আকুতি কমবেশি সবারই থাকে। তবে সাধ আর সাধ্যের সমন্বয় করে সবার পক্ষেই সে সাধ চরিতার্থ করা সম্ভবপর হয়ে উঠে না। সেক্ষেত্রে কিন্তু দুধের স্বাদ ঘোলে আস্বাদন করা যেতেই পারে! অর্থাৎ ভালো মানের একটি ভ্রমণ কাহিনী পাঠ করে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা অসম্ভব কিছু নয়। অতি সম্প্রতি পাঠ করা সে রকম একটি ভ্রমণ বিষয়ক বইয়ের গল্প বলার জন্যই এত কথার অবতারণা!

কিছুদিন আগে ব্যক্তিগত বইয়ের তালিকায় যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু নতুন বই। এগুলোর মধ্য থেকে আহমদ ছফার ‘অর্ধেক মানবী অর্ধেক ঈশ্বরী’,’গাভী বিত্তান্ত’ শেষ করে শুরু করেছিলাম ‘বাঙালি মুসলমানের মন’। কিন্তু শেষ করার আগেই শারীরবৃত্তীয় প্রয়োজনে শল্যচিকিৎসা নিতে জুনের ৭ তারিখ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত চিকিৎসালয়ে কাটাতে হলো। ও হ্যাঁ বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম ৫ জুন হাতে পেয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজ এবং বর্তমান কর্মস্থলের স্নেহভাজন প্রিয় সহকর্মী রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক, আনন্দময় সহশিক্ষার সৃজনশীল আয়োজন ‘মঙ্গল আসর’খ্যাত আবদুল্লাহ আল মোহনের লেখা ‘দৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টির ভারতভ্রমণ’বইটি।
চিকিৎসাজনিত নানা পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে বইটি খুলে দেখারও সময় হয়নি। ১০ জুন বাড়ি ফিরে শরীর কিছুটা ধাতস্থ হলে শিয়রের কাছে রক্ষিত অন্য আরো বইয়ের সঙ্গে থাকা মোহনের লেখা আনকোরা বইটাই প্রথম হাতে তুলে নিলাম। উদ্দেশ্য ছিল একটু নেড়েচেড়ে পাতা উল্টে দেখা আর কি! কারণ পড়তে পারবো এমন শারীরিক বা মানসিক শক্তি তখনো পর্যন্ত অর্জন করতে পারিনি। অথচ অবাক ব্যাপার হলো দু-এক পাতা উল্টাতে উল্টাতে কখন যেন বইটির তেইশটি অধ্যায়ের মধ্যে দু-তিনটি অধ্যায় শেষ করে ফেললাম ! ভ্রমণ সাহিত্যের প্রতি দুর্ণিবার আকর্ষণ ছোটবেলা থেকেই আর ব্যক্তিগতভাবে নিজেরও পায়ের তলায় সর্ষে আছে। সুযোগ পেলে আর হাতে কিছু অর্থ সঞ্চিত হলেই বেরিয়ে পড়ি ঘুরতে। ভারতের গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল হিসেবে পরিচিত দিল্লি, আগ্রা আর রাজস্থান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বইটির মূল উপজীব্য। ১৯৯৮ সালে ঐ এলাকাগুলোতে নিজেরও ভ্রমণের সুযোগ ঘটেছিল। বইটি পড়তে গিয়ে সেই স্মৃতিগুলোও ঝালিয়ে নিচ্ছিলাম। শারীরিক অসুস্থতাকে পাশ কাটিয়ে তিনদিনেই শেষ করে ফেললাম পুরো বইটা। মনে আফসোসও হলো- আমার ভ্রমণের আগে এমন বইটি হাতের কাছে থাকলে আমাদের ভ্রমণটা আরো কতই না আনন্দময় এবং জ্ঞানানুসন্ধানী হতে পারতো!

[hfe_template id=’81’]

‘দৃষ্টি আর অন্তর্দৃষ্টির ভারতভ্রমণ’ নামকরণের মধ্যেই রয়েছে বইটির তথা লেখকের মূল কারিশমা। দর্শনীয় স্থানগুলোর সৌন্দর্য দৃষ্টিসীমায় যতটা ধরা পড়েছে তার থেকেও বেশি অনুভূত হয়েছে অন্তর্লোকে। বইটির আসল আকর্ষণ এখানেই। নামের সাথে রচনার সম্ভারের সৌন্দর্যে আমি অভিভূত। ভ্রমণস্থানের সাথে মিল রেখে ছবিগুলোর সংযোজনও অনবদ্য।

সুদূর শৈশব থেকেই বাবার মুখে একটা কথা প্রায়ই শুনতাম-‘যা আছে ভূ-তে, তা আছে ভারতে’ অর্থাৎ ভারত এমন একটি দেশ, সমগ্র পৃথিবীতে যা আছে তার সবকিছুই রয়েছে এই দেশটিতে। তাই সারা ভারত ভ্রমণ করার সুযোগ পেলে পৃথিবীর অন্য দেশ ঘুরতে না পারলেও আফসোস করার কিছু নেই। দিল্লি, আগ্রা আর রাজস্থানের ঐতিহাসিক এবং উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানসমূহ ভ্রমণের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সৌন্দর্য বর্ণনাই নয় লেখক ইতিহাস-ঐতিহ্য-ভূগোল এবং ইতিহাসের পেছনের ইতিহাসকেও তুলে ধরেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে- যা রীতিমতো সাহিত্য হয়ে উঠেছে। অন্য অনেক ভ্রমণসাহিত্য থেকে বইটির স্বাতন্ত্র্যধর্মীতা এখানেই। নামে ভ্রমণগ্রন্থ হলেও ইতিহাসের চরিত্রগুলোর পাশাপাশি লেখক ভারতের মরমী- আধ্যাত্মিক- ধর্মীয় গুরু, কবি-সাহিত্যিকদের জীবনীও বর্ণনা করেছেন যার জন্য বইটিতে স্থান-কাল-পাত্রের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। মির্জা গালিব, খাজা মঈন উদ্দীন চিশতী (র:), হযরত নিজাম উদ্দীন আউলিয়া (র:) তো আছেনই, বাদ পড়েননি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশও। অবিভক্ত ভারতবর্ষের কোঁচবিহার রাজবংশের রাজকন্যা জয়পুরের তৎকালীন রাজা দ্বিতীয় সোয়াই মানসিংহের প্রভাবশালী, বিদূষী বাঙালি রাজমহিষী গায়ত্রী দেবীর সঙ্গেও লেখক পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন সুমধুর ভাষা-ছন্দে, কুশলী ইতিহাসের উপস্থাপনায়। যাদের শ্রমে-ঘামে নান্দনিক, শিল্পসমৃদ্ধ স্থাপনাগুলো তৈরি হয়েছিল, পেছনের সেই মানুষগুলোকেও লেখক স্মরণ করেছেন শ্রদ্ধাভরে।

‘পিংক সিটির আরও গল্প’ অধ্যায়টি বর্ণনার ঠাঁসবুননে রোমাঞ্চ আর রহস্যের জগতে পৌঁছে যায় যেন পাঠক। রাজা প্রতাপ সিং তাঁর প্রিয়তমা মহিষী রাঠোরজীকে ঘোড়ার পেছনে বসিয়ে প্রথম বারের মতো হাওয়া মহলে যখন নিয়ে যাচ্ছিলেন সেই যাত্রাপথের অনুপম বর্ণনা পড়ে মনে হচ্ছিল ভ্রমণকাহিনী নয়, ইতিহাস আশ্রিত কোন উপন্যাসই যেন পাঠ করছি। বইটি নিছকই ভৌগলিক স্থানের বর্ণনাসংবলিত ভ্রমণকাহিনী নয়, তথ্যবহুলও বটে! তবে তথ্যভারে ভারাক্রান্ত নয়, সাবলীল এবং সরস ভাষাগুণে। রেলগাড়ি সম্পর্কে আগ্রহী পাঠকগণ রেলগাড়ির পুরো ইতিহাসটাই পেয়ে যাবেন বইটিতে সংযোজিত রেলগাড়ি বিষয়ক দুটো অধ্যায়ে। বাড়তি পাবেন ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের ঝংকারও। জাদুঘর যে বিশ্ববিদ্যালয়সম শিক্ষাক্ষেত্র হয়ে ওঠে, তার প্রমাণ মেলে দিল্লির রেল জাদুঘর নিয়ে সবিস্তারে রচনায়। প্রতিটি জনপদের সাহিত্য-সংস্কৃতি-কৃষ্টি-রসনা বিলাস-জীবনাচরণ সবটাই উঠে এসেছে বইটিতে। বাদ যায়নি পুরনো এবং সমসাময়িক বিখ্যাত চলচ্চিত্রপ্রসঙ্গও।

[hfe_template id=’81’]

নতুন দর্শনার্থী হিসেবে দর্শনীয় স্থানগুলোতে একজন দর্শনার্থী কী কী সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন লেখক তার ফিরিস্তিও তুলে ধরেছেন। ভারতের গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল ভ্রমণে আগ্রহী দর্শনার্থীদের, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য বইটি অনন্য প্রয়োজনীয় গাইড হিসেবে সহায়তা করবে বলে আমার গভীর বিশ্বাস। প্রাঞ্জল এবং সাবলীল ভাষা ও বর্ণনাগুণে বইটি সকল শ্রেণির পাঠকের কাছেই সুখপাঠ্য হবে বলে আশা করি। দর্শনীয় স্থানের বেশ কিছু ছবি বইটিতে সংযোজিত হয়েছে, তবে ছবির নিচে স্থানের নামটি অনুল্লিখিত রয়েছে। নাম উল্লেখ থাকলে পাঠকের পক্ষে জায়গাটি সহজেই চিনে নেয়া সম্ভব হতো। অর্থাৎ ছবিগুলোর নিচে ক্যাপশন বা বর্ণনা দেওয়া হলে পাঠকের জন্য আরো বেশি সহায়ক হতো। পরিমাণে স্বল্প হলেও দু-একটি ভুল বানানও পরিলক্ষিত হয়েছে। পরের সংস্করণে ভুলত্রুটিগুলো সংশোধিত হবে আশা করি। বইটি প্রকাশের জন্য প্রকাশনাডটকম প্রকাশনীর কাজল ঘোষ এবং মনকাড়া প্রচ্ছদের জন্য শিল্পী ধ্রুব এষকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। তরুণ লেখক, গবেষক ও শিক্ষক আবদুল্লাহ আল মোহন জীবনীকার, প্রাবন্ধিক হিসেবে ইতোমধ্যেই সাহিত্যক্ষেত্রে যথেষ্ট সুপরিচিত হয়ে উঠেছেন। প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বেশ কয়েকটি জীবনী ও প্রবন্ধগ্রন্থ। আগ্রহী পাঠকদের সুবিধার্থে তার গ্রন্থগুলোর কয়েকটির নাম উল্লেখ করা যেতেই পারে। আমার পঠিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে; খোকা থেকে মুজিব : বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা, হাসু থেকে শেখ হাসিনা : জননেত্রী থেকে বিশ্বনেত্রী, সম্পর্কের সেতুবন্ধনে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ, খুঁজে ফেরা: বঙ্গবন্ধু ও ‘বাংলাদেশের হৃদয় হতে’, মানবাধিকার চর্চা।

আবদুল্লাহ আল মোহন রচিত প্রবন্ধের বইগুলো পাঠকমহলে যেভাবে সাড়া জাগিয়েছে, সদ্য প্রকাশিত ভ্রমণকাহিনীটিও পাঠকদের নিরাশ করবে না বলে দৃঢ় বিশ্বাস আমার। সেই সাথে অতিমারী করোনাকালের সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে ও নিজেকে সমৃদ্ধ করতে আমরা বই পড়ার প্রতি আরো বেশি মনোনিবেশ করবো- এই প্রত্যাশাও করছি।


অধ্যাপক মাহমুদা খাতুন

টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার গোয়ারিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী অধ্যাপক মাহমুদা খাতুন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি ১৪শ বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে যোগদান করেন। প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক হিসেবে বিভিন্ন সময়ে যথাক্রমে শেরপুর সরকারি কলেজ, ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, কুমুদিনী সরকারি কলেজ, টঙ্গী সরকারি কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা ও হরগঙ্গা সরকারি কলেজ, মুন্সীগঞ্জে সুনামের সাথে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকার ভাসানটেক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানের পূর্বে তিনি জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম)-এ প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৭ সালের ২ মার্চ ভাসানটেক সরকারি কলেজ, ঢাকায় অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করে অদ্যাবধি এ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর প্রিয় ও আদর্শ শিক্ষক হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন। সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক, বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত লেখালেখি করে থাকেন

ইতিহাস কথা বলা অনন্য ভ্রমণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top
error: Content is protected!!
Share via
Copy link
Powered by Social Snap